Bartaman Logo
২৩ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দল ভাঙিয়ে সমর্থন কেনা যায় না

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে একুশে জুলাইয়ের সভা উপচে পড়ল। দলের বিশ্বাস ভাঙানো সম্ভব নয়। বিস্তারিত পড়ুন।

দল ভাঙিয়ে সমর্থন কেনা যায় না
  • ২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ এবার শুধু শহিদ স্মরণের ছিল না। ছিল রাজনৈতিক শক্তি যাচাইয়েরও। ক্ষমতা হারানোর মাত্র দু’মাসের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ‘শেষ’ বলে ধরে নিয়েছিল অনেকেই। বিজেপির অন্দরে তো বটেই, বিরোধী শিবিরের একাংশও ধরে নিয়েছিল— তৃণমূল এখন অতীত। সেই লক্ষ্যেই শুরু হয়েছিল দল ভাঙানোর অভিযান। স্বয়ং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়িতে বৈঠক করে তৃণমূল সাংসদদের একাংশকে এক ভুঁইফোড় দলে (পড়ুন এনসিপিআই) যোগ দেওয়ানো হল। বিধায়কদের একাংশকে সামনে রেখে গড়ে তোলা হল তথাকথিত ‘আসল তৃণমূল’। সবই যে পরোক্ষে বিজেপির ছল-বল-কৌশল, তা বাংলার মানুষের কাছে একেবারে জলের মতো পরিষ্কার। মমতার জন্য পড়ে ছিল কেবল প্রশাসনিক বাধা। এবার ধর্মতলায় চিরাচরিত জায়গায় সভার অনুমতি মেলেনি। হাইকোর্টের নির্দেশে ছোটো জায়গায় সভা করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। জেলায় জেলায় বাস আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সমর্থকদের ভয় দেখানোর অভিযোগও কম শোনা যায়নি। কিন্তু শেষপর্যন্ত সব হিসেব ওলটপালট করে দিল জনতাই। সভাস্থল উপচে পড়ল। খোলা আকাশের নীচে মানুষের ঢল নামল। ভিড়ের কাছে ছোটো হয়ে গেল সব বাধা। মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে সভা শুনলেন। বুঝিয়ে দিলেন, ভোটে হার মানেই জনসমর্থন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষের ভোট একদিনে উবে যায় না। ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়। সরকারি বাংলো কেড়ে নেওয়া যায়। নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া যায়। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস কেড়ে নেওয়া এত সহজ নয়। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নতুন লড়াইয়ের ডাক দিতে পারলেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। মানুষের চোখে এখনও তিনিই তৃণমূলের মুখ। তিনিই দলের প্রতীক। দল ভাঙানো যায়। সংগঠন দুর্বল করা যায়। নেতা কেনা যায়। কিন্তু জনতার আবেগ কিনে নেওয়া যায় না। যারা ভেবেছিল কয়েকজন নেতা ভাঙালেই তৃণমূলের ভিত ধসে পড়বে, তাদের জন্য একুশে জুলাই ছিল নির্মম বাস্তবের পাঠ।

Advertisement

আরও বড়ো ধাক্কা খেল নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করা ঋতব্রত শিবির। তারা মঞ্চ বানিয়েছিল বড়ো। শামিয়ানাও ছিল বিশাল। কিন্তু মঞ্চের নীচে ছিল সারি সারি ফাঁকা চেয়ার। দৃশ্যটাই যেন সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক বার্তা। বড়ো মঞ্চ করলেই বড়ো দল হওয়া যায় না। বিশাল শামিয়ানা খাটালেই জনসমর্থন তৈরি হয় না। রাজনীতিতে নামের গুরুত্ব আছে। প্রতীকেরও মূল্য আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো হল বিশ্বাস। মানুষ কোনো দলের নামের পাশে ‘আসল’ বা ‘আর’ চিহ্ন লেখা দেখে তাকে গ্রহণ করে না। মানুষ দেখে ইতিহাস। দেখে সংগ্রাম। দেখে আত্মত্যাগ। দেখে কে বিপদের দিনে পাশে ছিল। রক্ত, ঘাম, লাঠির আঘাত, জেলের অন্ধকার— সেই ইতিহাসের শরিক না হয়েও কেউ যদি দাবি করেন তিনিই আসল উত্তরাধিকারী, তাহলে মানুষ সেই দাবি মেনে নেয় না। এই সত্য নতুন নয়। ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে। রাজনীতিতে শর্টকাটের বাজার যতই জমজমাট হোক, শেষ কথা বলে মানুষই। একুশে জুলাই আবার সেই কথাই মনে করিয়ে দিল।
তবে এই ঘটনার আর একটি দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস কখনো একমুখী নয়। যে মমতা একদিন দল ভাঙিয়ে বাংলায় হাত শিবিরকে কার্যত সাইনবোর্ডে পরিণত করেছিলেন, আজ তাঁর ক্ষমতা হারানোর মাত্র দু’মাসের মধ্যেই নতুন উদ্দীপনায় ফুটছে কংগ্রেস। বহু বছর নিষ্প্রভ থাকা শহিদ দিবস এবার শহিদ মিনার চত্বরে নতুন জনসমাগমের সাক্ষী। বিধান ভবনে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। আগামী বছরের গোড়াতেই ব্রিগেড সমাবেশের ডাক দিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। অর্থাৎ রাজনৈতিক শূন্যতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ বিকল্প খোঁজে। সংগঠনও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ায়। সেই কারণেই আজ দিল্লিতেও একই ছবি। বিরোধী শিবিরকে দুর্বল করতে নানা কৌশল চলছে। দল ভাঙছে। নেতা রং বদলাচ্ছেন। তদন্তের চাপ বাড়ছে। তবু রাহুল গান্ধীকে ঘিরে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হচ্ছে। কারণ মানুষ শেষপর্যন্ত ব্যক্তি নয়, ধারাবাহিকতা বিচার করে। সংগ্রাম বিচার করে। বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার করে। তাই ক্ষমতা দিয়ে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও মানুষের মনের ভোট নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ