শান্তনু দত্তগুপ্ত: বহু আগের একটি বিজ্ঞাপন। ব্যস্ত শহরে প্রবল বৃষ্টি। গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। থমকে ট্রাফিক। গাড়ি, বাস, জনজীবন। বিরক্তি আর উদ্বেগ সবার চোখেমুখে। কারও জন্য আবার শুধুই টাইম পাস। বাসে বসেই। কেউ আড্ডা দিচ্ছে। কেউ চায়ে চুমুক। শুধু একটি শিশু ছাড়া। স্কুলফেরত সে দাঁড়িয়ে পড়েছে গাছের সামনে। দেখছে। ভাবছে। তারপর স্কুলের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে এগিয়ে যায় সে পড়ে থাকা গাছটার দিকে। বিরাট গুঁড়ি। এই দুনিয়া বলছে, সম্ভব নয় তার পক্ষে। সে মানছে না। এগিয়ে গিয়েছে সাহসে ভর করে। বুকের মধ্যে বিশ্বাস, আমি পারব। উৎসুক চোখগুলো দেখছে... দোকান থেকে, গাড়ি থেকে, বাস থেকে। হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এল আরও কয়েকটি ছেলেমেয়ে। তারাও ঠেলছে গুঁড়িটা। দাঁড়িয়ে থাকা বাইকওলার হাত থেকে হেলমেটটা পড়ে গেল। সে এগিয়ে আসছে। বাস থেকে নামছে যাত্রীরা। গাড়ি থেকে অফিসবাবু। পাহাড়প্রমাণ ভাবনাকে রূপ দিতে নামা ওই একটি শিশু আর একা নয়। সে ‘অনেক’ হয়ে গিয়েছে। সরছে গাছের গুঁড়ি। থমকে থাকা পথ মসৃণ হচ্ছে। মেঘ চিরে রোদ উঠছে। বদল আসছে। সমাজে। মানসিকতায়। ভাবনায়। ঠিক এই হাওয়াটাই তো তুলে দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি! বদলাতে হবে। মানসিকতায় বদল চাই। ভাবনায় বদল চাই। শাসক যা বোঝাবে, তা আমরা বুঝব না। তিলে তিলে যে যন্ত্রণা আমরা সহ্য করছি, যে বাধা পেরিয়ে সাফল্যের শিখর ছুঁতে মরিয়া লাফ দিচ্ছি, তার সবটা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব। শাসক আমাদের কলেজে ভরতির জন্য বা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ে কোনো দাক্ষিণ্য করছে না! এটা আমাদের অধিকার। আমাদের বাবা-মা প্রতিদিন তার জন্য লড়াই করছে। তা সে সংগঠিত ক্ষেত্র হোক, বা অসংগঠিত। সে হয়তো রাস্তা তৈরিতে মাটি ফেলছে। দেশের পরিকাঠামোর জন্য। কারখানায় লোহা তুলছে। দেশের উৎপাদন ক্ষেত্রের জন্য। কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে প্রোগ্রামিং বানাচ্ছে। দেশের প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা প্রত্যেকে লড়ছে, ভারতের স্বার্থে। শুধু নেতা-মন্ত্রী দেশের কথা ভাবে না... দেশের জন্য প্রাণপাত করে না। আমাদের বাবা-মায়েরাও করে। আমরাও করি। আমরা যৌবনের দূত। অদ্ভুত।
তাই তো রাষ্ট্র আমাদের ‘আরশোলা’ বলেছে। আমরা মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকি, তর্কে শামিল হই, প্রথা ভাঙতে চাই এবং প্রশ্ন করি। লাগাতার। শাসকের যা না-পসন্দ। আমরা আইনসভা, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে আলাদাভাবে দেখি না। প্রত্যেকেই আমাদের কাছে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। শাসকের প্রতিনিধি। তাই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি। প্রতিবাদে। শাসকের তাচ্ছিল্যের জবাব চাই আমরা। প্রতিবাদের ঢেউ স্তব্ধ করে দেয় রাজধানীর রাজপথ। নাম আমার যা খুশি হতে পারে... অভিজিৎ দীপকে, ঐশী ঘোষ, শ্রদ্ধানন্দ, সোনাম ওয়াংচুক, কিংবা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। আমাদের বয়স যা খুশি হতে পারে... আঠারো, আঠাশ বা আশি। আমরা সবাই আরশোলা। যাকে শাসক বারবার পায়ের তলায় পিষে দেয়। কিন্তু আবার তারা জন্ম নেয়। অপ্রত্যাশিত বঞ্চনার মধ্যে থেকে। তাদের শেষ নেই। তাদের ভয় নেই। তাদের কিছু হারানোর নেই। আছে শুধু পাওয়ার। এই আবেগ, এই ভরসাই ‘আরশোলা’রা ছড়িয়ে দিয়েছে ভারত দরবারের আনাচে কানাচে। প্রশ্ন তুলছে শাসক, কোথা থেকে আসছে ফান্ডিং? কে অর্গানইজ করছে? কোন পার্টি? কোন কর্পোরেট? তারা হাসছে। ২০০ টাকায় ফ্লেক্স ছাপিয়ে, অটোরিকশ চেপে চলে আসছে বিক্ষোভে যোগ দিতে। পাড়ার কোনো দাদা, কাকা, বা ঝান্ডাধারী তাদের ডাকেনি। ম্যাটাডোর বা বাসের ব্যবস্থা করে দেয়নি। ট্রেনের টিকিটও কেটে দেয়নি। তাও তারা এসেছে। সংখ্যায় কত তারা? কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ! কয়েকশো হলেও পরোয়া নেই। সংখ্যায় এক হলেও না। কারণ, এক থেকেই এক কোটি হয়। ১৪০ কোটিও। শুরুটা হয়েছে। তারা বলছে, আমাদের আর টুপি পরিয়ে রাখা যাবে না। আমরা প্রশ্ন করবই। বছরের পর বছর রাত জেগে যে পরীক্ষার জন্য নিজেদের তৈরি করছি, তার প্রশ্ন ফাঁস হবে না। হতে দেব না। আর যদি হয়, তার দায় নিতে হবে শাসককে। ঠিক যেমন আগের জমানায় রেল দুর্ঘটনার দায় মাথায় নিয়ে সরে যেতেন রেলমন্ত্রী। তেমনভাবে। কেন দেখা যায় এই জমানায়? প্রশ্ন তোলে তারা। ‘স্পেস টেকনোলজি’র রাস্তা কয়েক মাসে খাটালে পরিণত হয়। তারপরও কেন পূর্ত বা সড়ক পরিবহণমন্ত্রী পদত্যাগ করেন না? বছরের পর বছর প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে, কোটি কোটি টাকার কারবার চলে, তারপরও কেন শিক্ষামন্ত্রী পদ আঁকড়ে থাকেন? এগুলো দুর্নীতি নয়? প্রশ্ন করছে তারা। করবে তারা। সেই সূচনা হয়ে গিয়েছে। লোকে বলছে, ভবিষ্যতে এ নিশ্চয়ই আম আদমি পার্টি হয়ে যাবে। কিন্তু লোকে ভুলে যাচ্ছে, সংগঠন বা দল আজ নামমাত্র। একটা ছাতার তলা। যেখানে সবাই ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে। ছাতা সরে গেলেও তারা থাকবে। কারণ, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দূরের গ্রহ তাদের লক্ষ্য নয়। এই প্রতিবাদের নিশানায় অধিকার রক্ষা। মূল্যবৃদ্ধি। চাকরির দাবি। বেঁচে থাকার জন্য প্রাপ্য সম্মান। এবং অবশ্যই স্বচ্ছতা। এই প্রশ্ন তোলার জন্য কোনো পার্টির ব্যানার দরকার হয় না। ফান্ডিং লাগে না। স্রেফ দম লাগে। বড়ো একটা বুকের খাঁচা দরকার হয়। সেটা তাদের আছে। তারা বলছে, হোক না লড়াই। আছি আমরা রাস্তায়। লড়ে নেব। বুঝে নেব। তাঁবেদার মিডিয়াকুলের সামনে দাঁড়িয়ে তারা দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বাধ্য করে ফিরে যেতে। কারণ তারা বেকারত্বের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ, বিভেদের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ। ওই লড়াইয়ে হিন্দু আছে। মুসলিমও। কেউ কারও ধর্ম জানে না। নাম জানে না। ৪৩ শতাংশের খানিক বেশি। ভাবনার বিষয় বটে। উদ্বেগেরও।
বেনিটো মুসোলিনি তাঁর ‘দ্য ডকট্রিন অব ফ্যাসিজম’-এ লিখেছিলেন, ‘ফ্যাসিবাদ শুধুই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদাতা বা আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা নয়। বরং শিক্ষা এবং এক অন্য আধ্যাত্মবাদের মাধ্যম। এর লক্ষ্য স্রেফ বেঁচে থাকা নয়, বরং জীবনের প্রত্যেকটা অঙ্গ—মানুষ, চরিত্র এবং বিশ্বাসের অন্দরমহল পর্যন্ত পৌঁছানো। এই উদ্দেশ্য সাধনে ফ্যাসিবাদ প্রয়োগ করে শৃঙ্খলা। জাহির করে কর্তৃত্ব। হানা দেয় সে আত্মার গভীরে। নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়। শাসন করে।’ মিল খুঁজছে তারা। আরশোলারা। জেন-জি। কিংবা মিলেনিয়াল। এই আদর্শের মায়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায় তারা। তাই বিক্ষোভ। তাই আরশোলার মুখোশ পরে পথেঘাটে সবাই নেমে পড়ে। সবারই পরিচয় এক—ভারতবাসী। বঞ্চিত। বিরক্ত। অস্থির। মুক্তি চায় তারা। প্রোপাগান্ডা থেকে। রেহাই চায় মূল্যবৃদ্ধির যন্ত্রণা থেকে। নিশ্চিত হতে চায়, শিক্ষা-চাকরি-সামাজিক প্রকল্পে দুর্নীতি হবে না। কাল সরকার বদলালে কাজটা চলে যাবে না। প্রতিশ্রুতি মতো রান্নার গ্যাস মিলবে ৪৫০ টাকায়। রক্তজল করা কপর্দকটুকু এলআইসিতে রাখার পর শুনতে হবে না, ওই টাকা খেটেছে কোনো গোদি ব্যবসায়ীর আড়তে। ১৫ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির বোঝা তাদের বহন করতে হবে না। ঘুমোতে যাওয়ার আগে প্রার্থনা করতে হবে না... হে ঈশ্বর এই রাতে বুলডোজার যেন আমার দোকানটা গুঁড়িয়ে না দেয়। ঘুম থেকে উঠে দেখতে হবে না, পেট্রলের দাম আরও ৪ টাকা বেড়ে গিয়েছে। কোনো রাজ্যকে ২০০২ সালের গুজরাত হতে দিতে চায় না তারা। মনেপ্রাণে চায়, কোনো রাজ্য যেন মণিপুর না হয়ে যায়। যাকে ভারত ভুলতে বসেছে। রাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে রয়েছে। সেই লড়াইও যেন হয় তাদের লড়াই। ভারতের লড়াই। মানবিকতার লড়াই।
খুব বেশি কি চেয়ে ফেলছে তারা? এমন কোনো চাহিদা কি তাদের আছে, যা সংবিধানে লেখা লাইনের বাইরে ‘অধিষ্ঠিত’? রাষ্ট্র হবে মানুষের জন্য। মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নয়। এটাই তো গণতন্ত্রের ভিত। গণতন্ত্র জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে। মাথা উঁচু করে থাকার জন্য। অথচ, তারাই কুর্সিতে বসে হয়ে যায় শাসক। জনগণের প্রতিনিধি নয়। জনগণের থেকে আলোকবর্ষ দূরে। ক্ষমতার আঙিনায় তাদের বিচরণ। ধাপ্পাবাজি তাদের মুখোশ। এমন শাসক চায় না ভারত। এমন সমাজ চায় না নতুন প্রজন্ম। তারা ইতিহাস বদলাতে চায় না। ইতিহাস গড়তে চায়। কখনো ছাত্রছাত্রী হিসাবে, কখনো চাকরিপ্রার্থী, কখনো স্রেফ আরশোলা। এটাই কি বসন্তের সূচনা?