Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালি বিদ্বেষীদের কেন ভোট দেবেন?

‘মিত্রোঁ’ আর কত সর্বনাশ করবে? বাংলা বলে নাকি কোনও ভাষাই নেই।

বাঙালি বিদ্বেষীদের কেন ভোট দেবেন?
  • ১০ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: ‘মিত্রোঁ’ আর কত সর্বনাশ করবে? বাংলা বলে নাকি কোনও ভাষাই নেই। ছিলও না কস্মিনকালে! এই কথা যে রাজনৈতিক দল বলে, অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করে, তাদের বাংলায় ভোট লড়ার কোনও নৈতিক অধিকার আছে? বাংলা ভাষা, বাঙালির অস্তিত্ব, প্রত্যেক বঙ্গবাসীর অস্মিতা নিয়ে যারা নোংরা খেলা করে, উত্তর ভারতের সংস্কৃতিতে মানুষকে জারিত করে যে দল নতুন নতুন রাজ্যে গেরুয়া চিন্তার প্রবেশ ও প্রসারে মরিয়া, তাদের বাংলার মানুষ কেন ভোট দেবেন? একটা কথা সেই একুশ সাল থেকেই জলের মতো পরিষ্কার, বিজেপিকে এ রাজ্যে ক্ষমতায় আনা মানে বাঙালিয়ানার অপমৃত্যু। আমাদের গর্বের উত্তরাধিকারের সর্বনাশ। আমাদের স্বতন্ত্রতার বিনাশ। বেওসায়ি, ট্রেডার সর্বস্ব দল ও সংগঠনের কাছে দশ কোটি বঙ্গবাসীর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আত্মসমর্পণ। 

Advertisement

আমাদের চিরকালীন অহঙ্কার নেতাজি, চিত্তরঞ্জন, বাঘাযতীন সহ শত শত স্বাধীনতা সংগ্রামীর দেশপ্রেম। তাঁদের আত্মত্যাগের বীরগাথাকে মুছে দিয়ে ইংরেজের পদলেহনকারী সাভারকরদের পুজো করা আম বাঙালির ধর্মে সইবে? কিংবা সঙ্ঘের চিন্তাধারা? স্বাধীনতার লড়াইয়ে আরএসএস কী করেছে? বাংলা ভাষা না থাকার অর্থ রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, এই মহামানবরা কেউ কোনওদিন ছিলেন না। তাঁদের সোনাঝরা সাহিত্যের কিছুই লেখা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী ৫ হাজার গান, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা উপন্যাস, গল্প সব মিথ্যা। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরাণী, আনন্দমঠ, স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমিতে শরৎচন্দ্রের ঝড় তোলা পথের দাবি— সবই মূল্যহীন! তাহলে আর রইল কী, বাঙালি জাতিটাই তো ভ্যানিশ! কোন মহামান্য বীরপুঙ্গব এই কথা বলল তা আরও রোমাঞ্চকর! দুঃখের বিষয়, যাঁর মুখ থেকে ওই অমৃতবাণী নিঃসৃত হয়েছে তিনি কোনও শক-হূন-পাঠান-মোগল-বর্গি নন, কেন্দ্রে এক যুগেরও বেশি শাসন করা বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র ‘রাজাধিরাজ’ অমিত মালব্য সাহেব। বাংলা দখলের নেশার ঘোরে কিংবা এবারও ব্যর্থ হওয়ার আগাম হতাশায় এতটাই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য তিনি! তাঁর ওই বক্তব্যের কয়েকশো ঘণ্টা পরও দলের পক্ষ থেকে খণ্ডন করে পাল্টা একটা বিবৃতি দেওয়া গেল না! রাজ্যে রাজ্যে বাঙালি নিপীড়নও বন্ধ হল না। উল্টে শুধু সাফাই আর সাফাই। বাংলায় সদ্য দায়িত্ব পাওয়া সভাপতি কথায় কথায় কবিতা আওড়ান। দার্শনিক তত্ত্ব মুখস্থ বলেন। কিন্তু পাছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিরূপ হন, পাকা ঘুঁটি কেঁচে যায় তাই তিনিও এ ব্যাপারে বিরুদ্ধে কিছু বলতে রাজি নন। এটাই আজকের বাংলার দুর্ভাগ্য, সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
স্পষ্টতই যে দল বাংলাভাষী আর বাংলাদেশির পার্থক্য বোঝে না, দেশভাগের ক্ষত যাঁদের রক্তে সঞ্চারিত হয়ে ঢেউ তোলে না, যাঁরা হাড়ে মজ্জায় বাংলা বিদ্বেষী, হিন্দু ধর্ম মানে শুধু বিভাজন বোঝে, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দের সবাইকে একসূত্রে গাঁথার সাধনাকে অস্বীকার করেন, তাঁদের ভোট দেবেন? থাকুক হাজারো সমস্যা। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। আর্থ সামাজিক বিচ্যুতির সাতকাহন। তার থেকে তৈরি হওয়া ক্ষোভ, অসন্তোষ। কাজ করলে ভুল হবেই, ত্রুটি কোনও ভিন গ্রহের শব্দবন্ধ নয়। লোভ থেকে দুর্নীতি, তা থেকে একাংশের বঞ্চনা শুধু একটা দল কিংবা সংগঠন নয়, গোটা সমাজের কাছেই আজ বিরাট যন্ত্রণার। একইসঙ্গে চলতি আর্থসামাজিক কাঠামোয় অনিবার্যও বটে। কিন্তু তা বলে স্বতন্ত্র আভিজাত্যের পরম্পরা বয়ে চলা বাঙালিয়ানার গলা টিপে মারার অর্থ তো দশ কোটি রাজ্যবাসীর সর্বনাশ। আমাদের জাত্যভিমান শেষ হয়ে গেলে তো তিলে তিলে তৈরি হওয়া নিজস্বতাটাই ধ্বংস। এখনও বিদেশে গেলে গড়পড়তা বাঙালিকে প্রথম প্রশ্ন শুনতে হয়, ‘ও ইউ আর ফ্রম দ্য কান্ট্রি অব টেগোর।’ ওটাই আমাদের অলঙ্কার এবং অহঙ্কার। গর্বের বাংলা ভাষা এবং উচ্চমানের সাহিত্য গুণই এই গর্বের উত্তরাধিকার ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। যাদের কাছে তা নেই, বাংলার অস্তিত্বই যে দল স্বীকার করে না, তারা বঙ্গবাসীর সোনালি অতীত আর ঐতিহ্যের কী বুঝবে? জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার এই গড্ডালিকায় তাই গেরুয়াদের টার্গেট বাংলা ভাষা ও মনন।
ধারাবাহিকভাবে বঙ্গ দখলের চেষ্টাও সেই কারণেই। উন্নয়ন মানে দু’টো সেতু, তিনটে বন্দে ভারত ট্রেন, দু’টি মেট্রো প্রকল্পের সম্প্রসারণ নয়। বাঙালিকে ভিতর থেকে চেনা, তাকে উপলব্ধি করা। তার মননকে অনুভব করা। যে দলের সরকারের কাছে বাংলার সওয়া দু’লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া, গরিব ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত, তার কাছে কী আশা করতে পারেন? অথচ অপেক্ষাকৃত পাশের দুই ছোট রাজ্য অসম ও ত্রিপুরার জন্য সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের অর্থ কী? শুধুই বঞ্চনা নয়, শুধুই অবহেলা নয়, তাকে পিছন থেকে টেনে ধরা। বাংলার বেশি উন্নয়ন মানে আরও একশো বছর পূর্বভারতের এগিয়ে চলার ধ্বজাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখার অঙ্গীকার। যে দল হিন্দি বলয়ে তৈরি হয়ে সেই অক্সিজেনে ক্রমাগত জারিত হয়েছে তাদের কোনও প্রভাবীর বাঙালিয়ানাকে রক্ষা করার দায় কিংবা দায়িত্ব থাকতে পারে? অঙ্গ, কলিঙ্গ দখলের পর বাকি বঙ্গে সাম্রাজ্য বিস্তার শুধুই দখলের নেশায়, সার জল দিয়ে বাঙালি অস্মিতাকে বাঁচানো নয়। তাই এই অপচেষ্টা রুখে দিন। সর্বনাশকে দূরে সরিয়ে দিন। মোদিজির ৭৫ তম জন্মদিন আর পাঁচ সপ্তাহ দূরে। তাঁরই তৈরি করা নিয়ম ভেঙে তিনি থাকবেন কি থাকবেন না, আমরা জানি না। কিন্তু এটা জানি বাঙালি তাঁর দখলের এজেন্ডায় এবারও সাড়া দেবে না। পঞ্চাশবার ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেও তিনি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন না। 
মোদিজি জানেন, বিহার ও বাংলায় একশোবার ঘুরে গেলেও বিজেপির জেতা দূর অস্ত। তাঁকে প্রতিযোগিতায় ফেরাতে পারে একমাত্র ভোটার তালিকা। তাই বশংবদ নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে নতুন তালিকা তৈরির এমন মহাযজ্ঞ। বিহারে খসড়া তালিকায় ৬৫ লক্ষ নাম নেই। বাংলায় এক নেতা বলছেন ৯০ লক্ষ, অন্যজন বলছেন ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাম বাদ দিতে হবে। মাত্র দু’মাসে একাজ করে তারপর আসরে নামবে গেরুয়া নেতৃত্ব। উদ্দেশ্য স্পষ্ট। চার বছরে যা হয় না, মাত্র দু’মাসে তা করার অর্থ ভোটার তালিকা তৈরি হবে বিজেপির নির্দেশে, গেরুয়া কার্যালয়ে। এভাবে বলপূর্বক কোনও রাজ্যের মানুষের সমর্থন জেতা যায়? না, সবটাই বাংলাকে অশান্ত করার ষড়যন্ত্র। সাংবিধানিক শাসন যাতে ভেঙে পড়ে। সমাজে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এবং সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তারা ঘোলা জলে মাছ ধরতে পারে। কারণ, সাধারণ মানুষের বন্ধু সেজে ভোট জেতা বিজেপির পক্ষে বাংলায় অসম্ভব। এমনকী উত্তরবঙ্গেও গেরুয়া সংগঠন দ্রুত ভাঙছে। দক্ষিণবঙ্গের জেলায় জেলায় দল ছাড়ার হিড়িক। 
কেন ভোট পাবে বিজেপি? হিন্দু-মুসলিম কট্টর মেরুকরণ ছাড়া গেরুয়া শাসনে কোন প্রতিশ্রুতিটা রক্ষা হয়েছে গত এক দশকে। মূল্যবৃদ্ধির জালে ফেঁসে হিমশিম গোটা দেশ। আর রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বলছে, দাম বাড়েনি তো, সব নিয়ন্ত্রণে! বাজারে চাকরি নেই। অর্থমন্ত্রক বলছে, কেন স্টার্ট আপ রেকর্ড করেছে তো! রোজ কৃষক আত্মহত্যা করছে, আর সরকার শোনাচ্ছে রেকর্ড ফলন, দ্বিগুণ আয়ের ছেঁদো গল্প। দশ লক্ষ সরকারি পদ ফাঁকা, তার কোনও উচ্চবাচ্য সরকারের কেষ্টবিষ্টুদের গলায় নেই। নোট বাতিলকে দুয়ো দিয়ে রাজ করছে কালো টাকা। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আমেরিকা ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোয় কৃষকরা আরও মার খাবেন। গরিব কাজ হারাবে। অর্থনীতি অন্ধকার দেখবে। রাষ্ট্রনেতার ‘কচি প্রেম’ পরিণতি পাওয়ার আগে ভেঙে গেলে যা হয় আর কী! কিন্তু ভারতের বিদেশনীতির এত বড় বিপর্যয় আর কবে দেখেছে দেশ। এক দশক আমেরিকার সঙ্গে দৃষ্টিকটূ নৈকট্য তৈরির পর আচমকাই ভেঙে গেল মৌতাত! পাশের বাড়িকে পাত্তা না দিয়ে দূরের বন্ধুকে আপন করা যে নির্বুদ্ধিতারই নামান্তর, এই পঁচিশ সালের শেষ শ্রাবণে তা আরও একবার প্রমাণ হল। এখন যা অবস্থা তাতে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রথম কয়েক মাস প্রতিহিংসায় দু’পক্ষই যা খুশি করে বসে। বিশেষ করে যিনি শক্তিধর, তিনি তো হাত পা ছুড়বেনই। ভারত-মার্কিন মধুচন্দ্রিমা শেষ হওয়ার পরও সেই অবস্থা।  পহেলগাঁও হামলা এবং অপারেশন সিন্দুরের পর ভারত যখন গোটা পৃথিবীতে পাকিস্তানের জঙ্গিবাদকে তুলে ধরতে চাইছে, সেই উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছে বহু দেশে, ঠিক সেই সময় পাক সেনাপ্রধানকে আমেরিকার ‘জামাই আদর’ই বুঝিয়ে দিচ্ছে ট্রাম্প বদলা নেওয়ার মুডে। দু’মাসে দ্বিতীয়বার আমেরিকা সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির! মোদির চেয়ে মুনির হোয়াইট হাউসের বেশি কাছের মানুষ! অগত্যা আবার নেহরু আমলের পদধ্বনি, রাশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন, তাহলে অযথা এত দেরি কেন? ট্রাম্প সাহেব নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলে তিনি অভিনন্দন জানাতে হোয়াইট হাউস যাবেন তো! 
ঘরে বাইরে চাপে মোদিজি ও তাঁর সরকার। তাই এবার ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিরোধীদের জব্দ করার ষড়যন্ত্র। সঙ্গে ডিভাইড অ্যান্ড রুল, যাতে বিরোধীরা একজোট হতে না পারে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির চমক ধমকের রাজনীতির পুঁজি শেষ হয়ে আসছে। দেশের ভবিষ্যৎ কিন্তু মোটেই সুবিধার নয়। ধর্ম ও জিরাফে না থাকা আম জনতার জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন সময়। সেই কারণেই যে কোনও মূল্যে বাঙালি বিদ্বেষীদের চক্রান্ত ব্যর্থ করুন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ