Bartaman Logo
২৯ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিদ্রোহীরা এতদিন নীরব ছিলেন কেন?

দল ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরই তৃণমূলের নেতা, এমপি, বিধায়ক, প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি কিংবা মুখপাত্রদের একাংশের মধ্যে বিদ্রোহের আঁচ দেখা যাচ্ছে। নিত্যদিন তাঁদের তীব্র নৈতিকতার প্রদর্শন প্রকাশিত হচ্ছে।

বিদ্রোহীরা এতদিন নীরব ছিলেন কেন?
  • ২৯ মে, ২০২৬ ০৪:০০

সমৃদ্ধ দত্ত: দল ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরই তৃণমূলের নেতা, এমপি, বিধায়ক, প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি কিংবা মুখপাত্রদের একাংশের মধ্যে বিদ্রোহের আঁচ দেখা যাচ্ছে। নিত্যদিন তাঁদের তীব্র নৈতিকতার প্রদর্শন প্রকাশিত হচ্ছে। ফলপ্রকাশের পর থেকে এই অংশটি লাগাতার তৃণমূল দল এবং সরকারের দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি, দাদাগিরি, ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত, অগণতান্ত্রিক দল পরিচালনার বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, পোর্টাল, অডিও ভিস্যুয়াল অথবা প্রিন্ট মিডিয়ায় এঁরা প্রতিদিন ক্ষোভ এবং নৈতিকতার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছেন। তৃণমূল যে কতটা খারাপ ছিল, সেটির তালিকা প্রকাশ করে তাঁরা সকলেই বোঝাতে চাইছেন যে, কেন এই পরাজয় ঘটল। একইসঙ্গে তৃণমূলের কোনো কালো দাগ যেন নিজেদের শরীরে না লাগে, সেই প্রয়াসেও মরিয়া তাঁরা। সকলের বক্তব্যের সারমর্ম হল—আমি ভালো, দল খারাপ। 

Advertisement

হয়তো তাঁদের উল্লেখ করা প্রতিটি অভিযোগ সত্য। অথবা সিংহভাগ সত্য। কিন্তু আম জনতা, ভোটার, সাধারণ সমর্থক, বঙ্গবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, আপনারা এতদিন কেন এসব বলেননি? দল ক্ষমতায় ছিল ব঩লেই তো? ৩ মে পর্যন্ত বলেননি কেউ। কারণ, ৪ মে যদি দেখা যেত তৃণমূল আবার ক্ষমতাসীন হয়ে গিয়েছে, তখন এঁদের অনেকেই আবার দলের সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে তৎপর হয়ে উঠতেন। এই নীতিহীনতা, সুবিধাবাদী মনোভাব এবং স্রেফ ঝোপ বুঝে কোপ মারার মানসিকতাকে কিন্তু সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা করে না। আম জনতা অবশ্যই আমোদ পাচ্ছে। তৃণমূলের বিরোধীরাও খুশি হচ্ছে। এমনকি হয়তো তৃণমূলের এই দুর্দশায় তৃণমূল নিজেই দায়ী। 
এসবই সত্যি। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, এখন কেন? এই বিলম্বিত বোধোদয়ের কারণ কী? এখন আর তৃণমূল থেকে কিছু পাওয়ার নেই এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত তথা অন্ধকার, সেই কারণেই তো! সুতরাং এই অংশটির একাংশ হয়তো বিজেপিতে যোগ দেবে। অথবা বিজেপি হয়তো অনেককেই গ্রহণ করবে না। কিন্তু এঁদের এই অবস্থানে প্রকট হয়ে পড়ল যে, এরা হল সুখের পায়রা এবং পরজীবী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নিজেদের একক ক্ষমতা নেই। যখন যে দল ক্ষমতায়, সেই ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার জন্যই এঁরা রাজনীতি করেন। শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু তৃণমূল ক্ষমতার তুঙ্গে থাকার সময় দলবদল করেছিলেন। অপেক্ষা করেননি। 
এই অংশটির সব অভিযোগ সত্য হিসেবে মেনে নিলেও প্রশ্ন হল, তাঁরা এসব আগে কেন বললেন না? দল যখন ক্ষমতাসীন ছিল, তখন তো তাবৎ সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। বঙ্গবাসী অত্যন্ত সশ্রদ্ধভাবে গ্রহণ করত তাঁদের মতবাদ, যদি দেখা যেত যে, তৃণমূল ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীনই এই আজকের বিদ্রোহী নেতা-নেত্রীরা পদত্যাগ, দলত্যাগ করেছেন, তাহলে প্রমাণিত হত তাঁরা ক্ষমতার ভিখারি নন। কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ অবাধে ভোগ করার পর, যখনই দল খাদে পড়েছে, ঠিক তখনই মূল্যবোধ, নৈতিকতার উদ্ভব হল অন্তরে এবং বিদ্রোহ করতে মন চাইল, এটাকে নিছক সুবিধাবাদী রাজনীতি আখ্যা দেওয়া হয়। 
ততধিক রাজনৈতিক ক্ষতি হল, বঙ্গবাসীর কাছে ক্রমেই রাজনীতি একটি সুবিধাবাদী পেশা হিসেবে গণ্য হবে। তৃণমূল দলটির কী হবে ভবিষ্যতে সেটি তাদের ভাবনা। কিন্তু সামগ্রিকভাবে যতই রাজনীতিতে দ্বিচারিতা, সুবিধাবাদ, আর্থিক লেনদেন, যখন তখন দলবদল ইত্যাদি চলবে, ততই মানুষ রাজনীতিকে হেয় চোখে দেখবে। মনে করা হবে, রাজনীতি মানেই নীতিহীন। এমনিতেই রাজনৈতিক আবহে ক্রমেই সুশিক্ষা, সুবক্তব্য, সুযুক্তি, সুশাসন অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে। যে ধরনের রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক, ভাষা, আক্রমণ প্রতি আক্রমণের চালচলন এখন দেখা যায়, সেটি রাজনীতিকে কালিমালিপ্ত করছে। 
বাংলায় সবথেকে বড়ো যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি হল একক আত্মশক্তিতে বলীয়ান রাজনীতিবিদের আবির্ভাব ঘটছে না। শেষবার একটি জাতীয় স্তরের দল ছেড়ে নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় আরোহণ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তারপর থেকে বিগত ১৮ বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বাংলায় শুধুই দলবদলের উৎসব। এই দল থেকে ওই দলে যাওয়া অর্থাৎ এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়া। 
বিগত ১৮ বছরে বঙ্গের কাউকে দেখা গেল না যে, নিজের একটি দল গঠন করেছেন। এবং সফল হয়েছেন। একটি দল থেকে অন্য দলে গিয়ে সেই দলের প্রভাব, প্রতিপত্তি, পরিকাঠামোর সাহায্য নিয়ে সফলতা পাওয়া একক শক্তির প্রকাশ নয়। একটি জনপ্রিয় দল থেকে অন্য জনপ্রিয় দলে যায় সকলে। নিজের দল শূন্য থেকে তৈরি করে বিকল্প রাজনীতি নির্মাণের শক্তি এখন আর দেখা যায় না বাংলায়।  
স্বাধীনতার পর প্রথম ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ক্ষমতার তুঙ্গে থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ, জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি খানের মধ্যে যে উদ্বাস্তু সংক্রান্ত চুক্তি হয়, সেটি  শ্যামাপ্রসাদ সমর্থন করতে পারেননি। তাই ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি যে কংগ্রেসের নীতি আদর্শের সমর্থক ছিলেন এমন নয়। বরং যে দলের তিনি সদস্য সেই হিন্দু মহাসভার সঙ্গে কংগ্রেস তথা নেহরু-গান্ধীর নীতির অকাশপাতাল ফারাক। কিন্তু সেই সময়টা ছিল এক অন্যরকম উদার রাজনীতির পরিবেশ তাই জওহরলাল নেহরু প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনের সময় একবারও দেখেননি যে, কোন ব্যক্তি কোন দলের, কারা কংগ্রেসের চরম বিরোধী ইত্যাদি। তিনি সব দল থেকেই যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনীত করে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। ওই নেতারাও সানন্দে যোগ দিয়েছিলেন নেহরু মন্ত্রিসভায়। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের সামনে একটি লক্ষ্য ছিল, স্বাধীন ভারত নির্মাণ। কিন্তু যেহেতু মতান্তর ঘটেছে, তৎক্ষণাৎ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পদত্যাগ করতে দ্বিধা করেননি। এবং তিনি নিজেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। ভারতীয় জনসংঘ। সেই দল ১৯৫১-৫২ সালের নির্বাচনে সফল হয়। 
রামমনোহর লোহিয়া অথবা চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী জওহরলাল নেহরুর তুমুল জনপ্রিয়তার কংগ্রেস দলকে চ্যালেঞ্জ করে কেউ তৈরি করেছিলেন প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টি, কেউ স্বতন্ত্র পার্টি। সত্যিই সেইসব দল কংগ্রেসকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। সফলতা পেয়েছিল। ভারতীয় লোকদল কিংবা ভারতীয় জনতা পার্টিও তৈরি হয় এই প্রবণতার ইতিহাসক্রম হিসেবে। 
এরপর মুলায়ম সিং যাদব, লালুপ্রসাদ যাদব, জর্জ ফার্নান্ডেজ, নীতীশকুমাররা পূর্বতন জনতা দলের ছাতা থেকে বেরিয়ে নানাবিধ দল তৈরি করেছিলেন। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শারদ পাওয়ার, জগনমোহন রেড্ডিরা  কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেননি। তাঁরা প্রত্যেকেই একক দল গঠন করেছিলেন। এবং সফল হয়েছেন। কিন্তু এই প্রবণতা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পরবর্তীকালেও বজায় রইল। বাংলা একমাত্র ব্যতিক্রম। এখনও পর্যন্ত অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া আর কোনো দল এককভাবে পৃথক অস্তিত্বের আত্মপ্রকাশ করে নির্বাচনি সাফল্য পেল না বাংলায়। প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিরা কংগ্রেস পরিত্যাগ করে পৃথক দল নির্মাণ করলেও ব্যর্থ হন। আবার তাঁরা কংগ্রেসেই প্রত্যাবর্তন করেন। প্রশান্ত কিশোর, অরবিন্দ কেজরিওয়ালরা সাহস দেখাতে পারলেন। বঙ্গরাজনীতিতে সেই সাহস দেখা গেল না। নওশাদ সিদ্দিকী অথবা হুমায়ুন কবীররা নিজের দলে নিজেরাই শুধু জয়ী হচ্ছেন। দলের অন্য প্রার্থীদের জেতাতে পারছেন না। তবু তাঁরা নিজেদের একটি দল অন্তত করেছেন। কিন্তু তৃণমূলের যে নেতা-নেত্রীরা বিদ্রোহ করছেন, তাঁদের কি নতুন দল গঠন করার শক্তি ও সাহস আছে?
তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহীরা আজ নয় কাল বিজেপিতে যোগ দিতেই পারেন। সেটা রাজনীতির অঙ্গ হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থাকা তৃণমূলে বিদ্রোহ করা নেতা-নেত্রী এবং ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর বিরুদ্ধাচারণ করা নেতা-নেত্রীর মধ্যে অনেক পার্থক্য। শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় দলবদল করেছিলেন। এবং ক্রমেই একক সাংগঠনিক শক্তির জোরে বঙ্গবিজেপির সবথেকে জোরালো মুখ হিসাবে উঠে এসেছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। যদিও তাঁকেও যে কোনো সিদ্ধান্তগ্রহণে দিল্লির মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হয় ও হবে। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ বিজেপি সর্বভারতীয় জাতীয় স্তরের দল। তাদের রিমোট কন্ট্রোল দিল্লি। 
বঙ্গবাসী এখন গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখতে চাইছে, বঙ্গে ক্ষমতাসীন হওয়া বিপুল শক্তিশালী বিজেপি কি তৃণমূলের বিদ্রোহী দলত্যাগীদের অবাধে গ্রহণ করে নেবে? নাকি অন্য কোনো কড়া সিদ্ধান্ত ও নীতি গ্রহণ করা হবে? যদি দলে দলে তৃণমূল বিজেপির দিকে চলে আসে, তাহলে সেটি ক্রমেই হয়ে উঠবে আদি-বিজেপি, সিপিএম এবং তৃণমূল মিশিয়ে আবার এক নতুন বিজেপি! 

সম্পর্কিত সংবাদ