Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

পাথরে ডিসিআরের নামে হাজার কোটির দুর্নীতিতে জড়িত কারা? সরকার বদলাতেই দৈনিক আয় বেড়ে ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা

পাথরে ডিসিআরের নামে হাজার কোটির দুর্নীতিতে জড়িত কারা?  সরকার বদলাতেই দৈনিক আয় বেড়ে ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা
  • ২০ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: অবৈধ খাদানকে রাতারাতি বৈধ করার এক অদ্ভুত জাদুদণ্ড রয়েছে বীরভূমে। যার পোশাকি নাম ‘ডিসিআর’ বা ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট। কাগজে কলমে এটি জরিমানা আদায়ের সরকারি প্রক্রিয়া হলেও, আদতে তা ছিল রাজকোষ ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটের এক ‘নিরাপদ লাইসেন্স’। তৃণমূলের আমলে যা শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু জমানা বদলাতেই সেই ‘পাথর চাপা’ সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, ডিসিআর বাবদ প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে জেলা থেকে। গত দেড় দশকে বীরভূম থেকে উবে গিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। প্রশ্ন উঠছে, কার পকেটে ঢুকেছে সেই লুটের টাকা? কার অঙ্গুলি হেলনে চলত এই সমান্তরাল অর্থনীতি? পাথর সাম্রাজ্যের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের ‘রিপোর্ট’ তৈরি করছে খোদ প্রশাসন।

Advertisement

বীরভূমের পাথর সাম্রাজ্যে কান পাতলেই একটা নাম বাতাসে ভেসে বেড়ায়। তিনিই এই পাথর সাম্রাজ্যের ‘বেতাজ বাদশা’। জেলার কয়েকশো অবৈধ খাদানের অঘোষিত মালিক। ডিসিআর টোল গেটগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার’ মতো তাঁকেই ডিসিআর আদায়ের অলিখিত দায়িত্ব সঁপে দিয়েছিল সরকার। ইডি সিবিআইয়ের জুজু কিংবা কেন্দ্রীয় তদন্তকারীর জেরা যাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি, তাঁর তৈরি করা চক্রেই এতদিন বন্দি ছিল বীরভূমের রাজস্ব। পাথর শিল্পাঞ্চল সূত্রের খবর, বীরভূমের পাথর বলয়ে দৈনিক অন্তত ৫ থেকে ৬ হাজার গাড়ি পাথর বোঝাই হয়। অংকের হিসেবে দৈনিক ডিসিআর থেকে আয় হওয়ার কথা কয়েক কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটত?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের ঘরে দৈনিক জমা পড়েছে মাত্র ১৯ লক্ষ টাকা! বিরোধীদের চেঁচামেচিতে কিছুটা নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে মার্চ ২০২৬-পর্যন্ত দৈনিক মধ্যে দৈনিক ৭০ লক্ষ টাকা জমা পড়তে থাকে কোষাগারে। গত ৪ মে রাজ্যে পটপরিবর্তনের পর ১৬ মে বিজেপি বিধায়করা জেলাশাসকের সঙ্গে বৈঠক করেন। স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, লুটের এই কারবার বন্ধ করতে হবে। সরকার নিজে থেকেই রাজস্ব আদায় করবে। পরের দিন, থেকেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। পুলিশ, ভূমি ও পরিবহণ, এই তিন দপ্তরকে যৌথভাবে নামানো হয় ময়দানে। পাথর বলয়ের ৯টি চেক গেটে সরকারিভাবে কড়া নজরদারিতে শুরু হয় ডিসিআর সংগ্রহ। আর তাতেই ম্যাজিক! মাত্র দু’ দিনেই রাজস্বের অঙ্ক দেখে প্রশাসনের আধিকারিকদের চোখ চড়কগাছ। ১৭ মে প্রথম দিনেই আদায় হয় প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। দ্বিতীয় দিনে সেই অঙ্ক একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা। আর মঙ্গলবার, অর্থাৎ আজ সেই আদায়ের পরিমাণ আড়াই কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভূমি দপ্তরের কর্তাদের অনুমান, কড়াকড়ি বজায় থাকলে আগামী দিনে দৈনিক আয় ৩ কোটি টাকা ছুঁয়ে ফেলবে। প্রশ্ন উঠছে, এতদিন তাহলে বাকি টাকা কোথায় যেত? 
গোটা ঘটনার তদন্ত চেয়ে সিউড়ির বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘অন্তত ১০ হাজার কোটির দুর্নীতি হয়েছে। এটি রেশন কেলেঙ্কারির থেকেও বড় দুর্নীতি। এর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে আর্জি জানাব।’ প্রশাসনের সূত্রের খবর, এই কেলেঙ্কারি নিয়ে বিশদ রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে। আগামী ২১ মে রাঢ়বঙ্গের জেলাগুলিকে নিয়ে বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বীরভূমের জেলাশাসক সেখানে এই দুর্নীতির খতিয়ান সহ একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে চলেছেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ