Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতকে অপমান করার সাহস ট্রাম্পকে কে দিল?

যুদ্ধক্ষেত্রে জয়পরাজয় হতেই পারে। সম্পর্কের ওঠাপড়া, চড়াই উতরাই, তাও বিশ্ব রাজনীতিতে মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তা বলে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এমন অসম্মান ও অবমাননা কোনওমতেই মানা যায় না।

ভারতকে অপমান করার সাহস ট্রাম্পকে কে দিল?
  • ৩ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: যুদ্ধক্ষেত্রে জয়পরাজয় হতেই পারে। সম্পর্কের ওঠাপড়া, চড়াই উতরাই, তাও বিশ্ব রাজনীতিতে মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তা বলে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এমন অসম্মান ও অবমাননা কোনওমতেই মানা যায় না। স্বাধীন ভারতের ৭৫ বছরের ইতিহাসে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া আর কোনও রাষ্ট্র আঙুল তুলে ‘উচ্ছন্নে যাক’ বলে দিল্লিকে তোপ দাগার সাহস দেখায়নি। মোদিজি যাঁর হয়ে মার্কিন মুলুকে উড়ে গিয়ে প্রচার করেছিলেন, সেই ট্রাম্পই অযাচিত ‘বন্ধুত্ব’র প্রতিদান দিলেন কড়ায়গণ্ডায়। ভারত সরকার মাথায় না তুললে কোন আক্কেলে আমেরিকা বলে ‘রাশিয়ার সঙ্গেই ভারতের মৃত অর্থনীতিও ডুববে’? এত বড় স্পর্ধা কার সৌজন্যে? আরও রহস্য, ওই বক্তব্যের ৪৮ ঘণ্টা পরও ৫৬ ইঞ্চি ছাতির প্রধানমন্ত্রী পাল্টা তোপ না দেগে মৌনব্রত অবলম্বন করার নীতি নিলেন কেন? দেখাদেখি পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও চীনও যদি এ ধরনের অবমাননায় ভরা নোংরা ভাষা ছুড়ে দেয় তাহলেও কি নীরবতাই একমাত্র উত্তর হবে ভারতের? জানি না নিজেকে সাহসী সাজাতে নেহরুকে বিঁধে এবার নতুন কোন বক্তব্য পেশ করবে বিজেপি সরকার!

Advertisement

আসলে পাক্কা ব্যবসায়ীকে মন দিলে এভাবেই ঠকতে হয়। অন্য সব বিশেষণ তোলা থাক, কারণ তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী চেয়ারের মালিক। কে না জানে সম্পর্কের কানাগলি পেরিয়ে তিনি শুধু দেনাপাওনার হিসেব কষেন। দাঁড়িপাল্লা অন্যদিকে ঝুঁকলেই মৌতাতে ইতি। চোখ লাল। রাত পেরলেই বন্ধু শত্রু হয়, আর শত্রু বনে যায় মিত্র! বেশ চলছিল, বাধ সাধল মস্কোর সঙ্গে হালে দিল্লির মেলামেশা। পাঁচ বছর আগেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১-১২ বিলিয়ন ডলার। কোভিডের পর তেল ও অস্ত্রের ঢালাও কারবার বৃদ্ধি পেয়ে এখন সেই বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এত কম সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য প্রায় ৬ গুণ বেড়ে যাওয়ার পর আর ব্যবসায়ী ট্রাম্পের মাথা ঠিক থাকে? হোয়াইট হাউসের অনুমান শীঘ্রই মস্কোর সঙ্গে দিল্লির বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে ফেলবে। এই মুহূর্তে ভারত মার্কিন বাণিজ্যের পরিমাণ ৮৮ বিলিয়ন ডলার। তাই আঘাত করো, যত পারো ভয় দেখাও পুরনো বন্ধুকে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলো। তার চরম শত্রুদেরও মদত দাও, যদি রাশিয়াকে ছেড়ে আবার পথে আসে! সেই কারণেই পাকিস্তানের উপর শুল্ক ১৯ শতাংশ, আর ভারত বিধ্বস্ত ২৫ শতাংশের আঘাতে।
নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন আদালতে কড়া শাস্তি এড়িয়েছেন, একথা সবার জানা। তিনি চূড়ান্ত খামখেয়ালি এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যত কম বলা যায় ততই যে ভালো, তাও গোটা বিশ্ব জানে। কিন্তু সমস্ত কূটনৈতিক পরম্পরা ও ঐতিহ্য উপেক্ষা করে তিনি যে ভাষায় সার্বভৌম ভারত সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন তা এককথায় অভাবনীয়। এ নিয়ে নয়াদিল্লির কাছ থেকে তৎক্ষণাৎ আরও কড়া প্রতিক্রিয়া আশা করা কি অন্যায়? তাঁর আচরণই বুঝিয়ে দিচ্ছে, তোষামোদ আমেরিকাকে আরও হিংস্র করে। সম্মানের বদলে শুধু অবহেলা আর অবমাননা জোটে। অথচ হাজার হাজার কোটি খরচ করে বিশ্ব ঘুরে একাধিকবার মোদিজি প্রকাশ্যে বলেছেন, তাঁর আমলে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা নাকি ভারতকে আগের চেয়ে বেশি সমীহ করেন। এই সেই বদলে যাওয়া সম্ভ্রমের নমুনা! বরং মোদিজির ভারত যে আমেরিকার কাছে ষোলোআনা এলেবেলে রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুলে আম সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। 
মোদিজি মানুন আর নাই মানুন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির যেদিন হোয়াইট হাউসে ঢুকেছেন সেদিনই ভারতের সঙ্গে মার্কিন মৌতাতে দাঁড়ি পড়ে গিয়েছে! রাষ্ট্রপ্রধান না হয়েও মুনির হোয়াইট হাউসে সর্বোচ্চ আপ্যায়ন পেয়েছেন। অস্ত্র পেয়েছেন। মদত পেয়েছেন। দু’শো প্রতিশ্রুতি আদায় করেছেন। আর এখন পাকিস্তানের সঙ্গে এমন এক তেলভাণ্ডার গড়ার চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে, যার দরুন মোদির একদা ‘বিশেষ বন্ধু’ বলতে পারেন, ‘একদিন আসবে যখন ভারতকে তেলের জন্য পাকিস্তানের কাছে যেতে হবে!’ এই একটা কথা ’৬২ সালের চীন বিপর্যয় কিংবা সিন্ধু জলচুক্তির চেয়ে কম অপমানের কি? ভেবে দেখুন, পাকিস্তানের উপর কম শুল্ক চাপিয়ে কোন ইঙ্গিত দিচ্ছে আমেরিকা! ৬ শতাংশের এই ফারাক মোটেই হেলাফেলার নয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও হোয়াইট হাউসে হাসতে হাসতে গলা মিলিয়েছেন মোদি, জয়শঙ্কর, দোভালরা। মোদিজিকে সেসময় যথেষ্ট গদগদই দেখাচ্ছিল। এমন একটা মহল তৈরির চেষ্টা হয়েছিল যেন ট্রাম্প সাহেব দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এলেই পড়শি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন সব ভয়ে থরথর করে কাঁপবে। যাবতীয় সমস্যার সমাধান ঢলে পড়বে ভারতের পক্ষে, দিল্লির স্বার্থের কথা মনে রেখে। তারপরও বিদেশমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীরা পালা করে গিয়েছেন ওয়াশিংটন। অপারেশন সিন্দুরের মাহাত্ম্য বোঝাতে ‘কংগ্রেসি বন্ধু’ শশী থারুরকেও পাঠিয়েছে মোদি সরকার। কিন্তু নিট ফল? এপর্যন্ত হোয়াইট হাউসের অধিপতি অন্তত ৩১ বার বলেছেন, ভারত নয়, হালের অপারেশন সিন্দুরের আড়ালে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ থামিয়েছেন তিনিই। প্রকাশ্যে বলেছেন, ইসলামাবাদও এই মুহূর্তে আমেরিকার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী নয়। এই একের পর এক ন্যারেটিভে ভারত সরকারের সম্মানটা রইল কোথায়? মোদিজি সংসদে দাঁড়িয়ে নাম করে কেন বললেন না, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিথ্যা বলেছেন। সম্পর্কটা কি ভাসুর আর ভাদ্র-বউয়ের?  
‘হিন্দি-চিনি’ ভাই ভাই বলে সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন নেহরু। ৬০ বছর আগের কথা। আর ট্রাম্পের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত ‘ঢলাঢলি’ করতে গিয়েই দেশমাতৃকাকে অসম্মানিত করার সাহস জুগিয়েছেন হিন্দুত্বের পোস্টার বয়। সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভাষণকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করলেও হলফ করে বলতে পারি, ট্রাম্পই হালের যুদ্ধ থামিয়েছেন কি না এই সংশয়টা আজ সংক্রামিত সিংহভাগ দেশবাসীর মনেই। বলতে দ্বিধা নেই, প্রতি মাসে যে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মোদিজি বিশ্ব ভ্রমণ করছেন তার নিট ফল বিরাট এক শূন্য। অসময়ে পাশে দাঁড়ানোর বন্ধু কই? অপারেশন সিন্দুরে রাশিয়া ছাড়া দিল্লি সক্রিয়ভাবে পাশে পায়নি কাউকেই! স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, কে ঠিক বলছেন, মোদি না ‘বন্ধু’ ট্রাম্প?
পাকিস্তানে ‘তেলভাণ্ডার’ গড়ে তোলার মার্কিন ঘোষণাও চূড়ান্ত বিস্ময়কর। কে না জানে, পাকিস্তান নিজেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সিংহভাগ অন্য দেশ থেকে আমদানি করে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা হোয়াইট হাউসের পুরনো কৌশল। স্রেফ ভারতকে চাপে রাখতেই এই ধরনের ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। সেই রাগ থেকেই ভারতের একাধিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর তুলনায় কম অঙ্কের শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। বাংলাদেশ (২০%), পাকিস্তান (১৯%), আফগানিস্তান (১৫%) এবং শ্রীলঙ্কা (২০%)। আমেরিকার বিদ্বেষের কারণ একটাই। বুঝিয়ে দেওয়া, রাশিয়াকে ছেড়ে আমার থেকে অস্ত্র, তেল কেনো।  কেন এস ৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কিনছ পুতিনের দেশ থেকে? সম্পর্কের আসল ভিত ও ভিত্তি যে বাণিজ্য, বুঝতে ভুল করেছেন মোদিজি। নিজেকে পয়লা নম্বর ‘মিত্র’ প্রমাণ করতে তাঁর সেই স্বপ্নের দৌড় এভাবে ব্যুমেরাং হবে কেউ ভেবেছিল? আজ নরেন্দ্র মোদি ৫৬ ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে বলার মতো অবস্থাতেও নেই যে, আমেরিকার সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যে ছেদ টানলাম। তাহলে যে তাঁর গদিই টলমল হয়ে যাবে। অথচ সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার বলতেই হবে, ভারত কোনও বৈদেশিক শক্তির চোখরাঙানিতে ভয় পায় না। দেশের যা সর্বনাশ তা করেছেন নেহরু, গান্ধী ও তাঁদের বংশধররা। কিন্তু মোদিজি আমেরিকার বেশি কাছে যেতে গিয়ে দেশের ইজ্জতটাকেই যে বেচে দিলেন তার বেলা? যদি ২৫ শতাংশ শুল্ক এবং রাশিয়া ‘পেনাল্টি’ সেপ্টেম্বরের পরও লাগু থাকে তাহলে ভারতীয় অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের মধ্যে পড়বে। জিনিসের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে চাহিদা কমে যাওয়ায় বিরাট অংশের কর্মসংস্থানও ধাক্কা খেতে বাধ্য। মোদি, ট্রাম্প, জাতীয় রাজনীতির ঘোলাজল কোথায় পৌঁছবে জানি না, তবে প্রয়াত মনমোহন সিংয়ের আত্মা কিন্তু জেগে উঠে বলবে, ‘কই আমার সময় ওবামা সাহেব তো ভারতকে এমন অপমান করার সাহস দেখাননি। ডুবে মরুক বলে কটাক্ষ ছুড়ে দেননি। আমি তো দুর্বল ছিলাম, তোমরাই বলেছ সর্বদা হাঁটু কাঁপত! আজ মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম নিতে এত ভয় কেন?’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ