Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে...

কলেজ স্ট্রিটে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া দুই মধ্যবয়সি যখন দেখলেন গল্প করতে করতে রাত সাড়ে ন’টা হয়ে গেল, তখন দু’জনেই উচাটন হয়ে পড়লেন বাড়ি ফেরার জন্য

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে...
  • ১০ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: কলেজ স্ট্রিটে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া দুই মধ্যবয়সি যখন দেখলেন গল্প করতে করতে রাত সাড়ে ন’টা হয়ে গেল, তখন দু’জনেই উচাটন হয়ে পড়লেন বাড়ি ফেরার জন্য। একজন যাবেন হাওড়া, অন্যজন শিয়ালদহ। ট্রেন ধরতে। একজন বললেন, এখনই না গেলে চুঁজরো পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। কাল আবার মেয়ের পরীক্ষা আছে। দ্বিতীয় ব্যক্তি  ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। বললেন, এই রে কেশনগর লোকাল ছেড়ে না যায়। ঠিক পাশেই দাঁড়ানো কোনও কলকাতাবাসী এসব বাক্যালাপ শুনে ভাবতে পারেন এরা কোথায় যাওয়ার কথা বলছেন! এই চুঁজরো, কেশনগর এগুলো কোথায়? তবে তিনি যদি বাংলার জেলায় জেলায় ভাষ্যরীতি সম্পর্কে কিছুটা অবগত থাকেন, তাহলে কিন্তু অনায়াসে বুঝতে পারবেন, হাওড়া থেকে চুঁজরো যাওয়ার ট্রেন ধরার জন্য যিনি দৌড়ে বাসে উঠলেন, তিনি আদতে হুগলির চুঁচুড়ার আদি বাসিন্দা। আর তাই চুঁচুড়াকে বলে থাকেন চুঁজরো। আর ওই যিনি ঠিক উল্টোদিকের বাস ধরে শিয়ালদহ স্টেশনে গেলেন, তিনি নদীয়ার কৃষ্ণনগরের নাগরিক। যাঁরা নিজের শহরকে কৃষ্ণনগর নয়, প্রাত্যহিক আলাপচারিতায় উচ্চারণ করেন কেশনগর। সাহেবরা না হয় অপভ্রংশ করে মিডনাপুর নাম দিয়েছিলেন, কিন্তু আম বাঙালিই বা কতজন সঠিক উচ্চারণ করেন? আমরা তো হামেশাই বলে থাকি, মেদনিপুর যাব! নিখুঁতভাবে মেদিনীপুর কি বলা হয় সর্বদা?

Advertisement

চার বন্ধুর আড্ডায় একজন যখন বললেন, সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বনগাঁর’ যেখানে থাকতেন, একবার গেলে হয় কোনও রবিবার! অন্য বন্ধু বেশ উৎসাহিত হয়ে বলবেন, ‘বোনগাঁয়’ কি ট্রেনে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে? নাকি বাসে? অর্থাৎ একই স্থানের নাম কেউ বলেন বনগাঁ। কেউ উচ্চারণ করেন বোনগাঁ। কোনটা ঠিক? একইভাবে বহু মানুষ আবার বনাঞ্চলে ঘুরতে যেতে পছন্দ করে। আবার তারই সঙ্গী বলে, ‘সেদিন যে রাস্তায় গেলাম, মাঝখানে দেখলাম গভীর বোন’। এই বোন কিন্তু সহোদরা নয়। অরণ্য। দোষের কী আছে? বাঙালি সবথেকে বেশি যে শব্দ ব্যবহার করে, সেই ‘মন’কে কেই বা মন বলে? সকলেই ‘মোন’ বলে।
অনুপকুমারের অভিনয় ভালোবাসে না, এমন সিনেমাভক্ত পাওয়া দুষ্কর। আবার গুপীর গানে অনুপ ঘোষাল অবিচ্ছেদ্য এক স্মৃতি। কিন্তু আলোচনায় যখন তাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, একই আলোচনাস্থলে তখন কেউ বলন ওনুপকুমার, ওনুপ ঘোষাল, কেউ বলেন অনুপ কুমার, অনুপ ঘোষাল। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাস পাঠ করার সময় আম পাঠক প্রথম বাক্যটি হয়তো পড়েছেন, অমিত রায় ব্যরিস্টার। কিন্তু সেটাই যখন শ্রুতিনাটক হয়ে বিগত শতকের আটের দশকে বাংলা বিনোদন জগৎকে রীতিমতো মুগ্ধ করল, সেখানে গ্রন্থনার শুরুতেই বিকাশ রায় পাঠ করলেন ‘অমিতো রায় ব্যারিস্টার...। ’ অমিত রায়ের প্রকৃত উচ্চারণ তাহলে কী? ব্যাকরণ হয়তো বলবে অমিতো রায় ঠিক, কিন্তু বাঙালি তো আজও বন্ধুকে অমিত নামেই ডাকে।
এসব নিছকই উচ্চারণের আঞ্চলিকীকরণ বা সহজীকরণ কিংবা অভ্যাস। বাংলা ভাষার বিস্তার, বৈচিত্র্য, উপভাষা, অপভ্রংশ, প্রাকৃত ইত্যাদির পাশাপাশি প্রকৃত ব্যঞ্জনা ও চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হল বাংলার উপভাষায়।  বাংলার জেলায় জেলায় উপভাষা কত প্রকার, সেটা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও সিদ্ধান্ত বস্তুত হয়নি। তবে কমবেশি যা নিয়ে দ্বিমত নেই, সেগুলি হল— রাঢ়ী, বারেন্দ্রী, কামরূপী এবং বঙ্গালি। রাঢ়ী উপভাষার বিস্তার পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সবথেকে বেশি জেলায়। কলকাতা, দুই চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, পুরুলিয়া, বীরভূম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া। পূর্ববঙ্গে নেই বললেই চলে। তবে খুলনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরের ভাষা শুনলে অনেক সময় মনে হতেই পারে যে,  এপার বাংলার কথাই তো শুনছি। বারেন্দ্রী উপভাষার আধিক্য মালদহ, রাজশাহি, পাবনা, বগুড়া, দক্ষিণ দিনাজপুরে। আবার কামরূপী উপভাষার প্রচলন প্রধানত উত্তরবঙ্গ। কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি  এবং ওপার বাংলার রংপুর। বঙ্গালি উপভাষার নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এই উপভাষার সিংহভাগই পূর্ববঙ্গের ভাষা। তবে কিয়দংশ বঙ্গালি উপভাষা ভাষ্যরীতি হয়ে রয়েছে নদীয়ার একাংশ, ত্রিপুরা, কাছাড়ে।
এই চারটি উপভাষার বাইরে কিছু ভাষাতাত্ত্বিকের মতে আরও একটি বাংলা উপভাষা রয়েছে। ঝাড়খণ্ডী। অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কিন্তু ঝাড়খণ্ডীকে তাঁর বাংলা উপভাষা শ্রেণিবিভাগের মধ্যে রাখেননি। কিন্তু ভাষাবিদ সুকুমার সেন রেখেছেন। গ্রহণযোগ্যতা ও বাস্তবসম্মত কার্যকারিতার বিচারে সুকুমার সেনের অভিমতই অধিক জনপ্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ ঝাড়খণ্ডী উপভাষাকেও বাংলা উপভাষার তালিকায় রাখা হয়। এই উপভাষার আধিক্য লক্ষ্য করা যায় মানভূম, সিংভূম, ধলভূম, দক্ষিণ-পশ্চিম বাঁকুড়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মেদিনীপুরের একাংশে। ঝাড়খণ্ডী উপভাষার বিশেষ রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হল, সাধারণ শব্দের সঙ্গে ‘ক’ অক্ষরকে অতিরিক্ত যুক্ত করা হয়। খাবেক, যাবেক, বল্লেক, করবেক।
গিরীশচন্দ্র ঘোষের বিখ্যাত নাটক প্রফুল্ল। সেখানে রমেশ তাঁর দাদা যোগেশকে বলেছে, ‘দাদা, আমাদের কি পৃথক করে দিলেন? যোগেশ বলল, না ভাই, তা নয়। এতদিন মা ছিলেন। এখন বউতে বনতি হোক না হোক, সম্পত্তি ভাগ হওয়াই ভালো।’ বোঝাই যা঩চ্ছে রাঢ়ী ভাষার কথোপকথন। যাতে সকলের বুঝতে সুবিধা হয়। কিন্তু ঝাড়খণ্ডী উপভাষায় মানভূম অঞ্চলের এই সম্পত্তি ভাগ করা নিয়ে যে বহুচর্চিত উদাহরণ রয়েছে, সেটি হল, ‘এক লোকের দুটা বেটা ছিল। তাদের মাঝে ছুটা বেটা তার বাপকে বল্লেক, বাপ হে, আমাদের দৌলতের যা হিস্যা আমি পাব, তা আমাকে দাও। এতে তার বাপ আপন দৌলত বাখরা করে তার হিস্যা তাকে দিলেক।’ আবার কামরূপী তথা রাজবংশী (মূলত উত্তরবঙ্গ) এই একই বাক্যটি কীভাবে বলবে? সেখানে বলা হবে, ‘একজন মানসির দুই কোনা বেটা আছিল। তার মদ্দে ছোট জন উয়ার বাপোক কইল, বা, সম্পত্তির যে হিস্যা মুই পাইন, তাক মোক দেন।’
কলকাতা এবং সংলগ্ন জেলা বলবে, পানে জর্দা দিলি না? ঝাড়খণ্ডী উপভাষা কিন্তু বলবে, ‘পানটায় জর্দা কেনে নাই দিলি?’ বর্ধমানের উপভাষার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ধ্বনিতাত্ত্বিক বদল। অর্থাৎ কাককে ‘কাগ’ উচ্চারণ করা। শাক হবে ‘শাগ’। আবার বর্ধমান রাঢ়ী উপভাষার শ্রেণিভুক্ত হলেও তার নিজস্ব আঞ্চলিকতা রয়েছে। যেমন সুভাষ ভট্টাচার্য ‘ভাষার অভিমুখ’ গ্রন্থে উদাহরণ দিয়েছেন একটি কথোপকথনের... 
‘—এতো রেতে কোথা যেচিস?
—ওমনিই যেইতে মোন হোইলো তাই যেচি। ক্যানে তুমি যাবা আমার সঙ্গে?
—মোন হইল? লয়? যা ক্যানে, বুজবি মজজা।
—তুমি ঘরে দোর এঁইটে ঘুমোও গা। আম চললাম। কাইল কাঁটোয়া যাব, লববানের বাজার কইরতে।’ 
রাঢ়ী উপভাষা এলাকায়  শব্দপ্রয়োগের চমকপ্রদ কিছু বৈশিষ্ট ভাষ্যরীতির বৈচিত্র্য, অভ্যাস এবং উদ্ভাবনের আভাস দেয়। যেমন, বৃষ্টি হবের বদলে বলা হয় আজ জল হবে। ‘জমি কিনে বাড়ি করব’ নয়। জায়গা দেখছি। সস্তায় পেলে জায়গা কিনে বাড়ি করব। জমিকে যেমন জায়গা বলা হচ্ছে, তেমন আবার পাত্রকেও জায়গা আখ্যা দেওয়া হয়। চাল রাখার জায়গা দিন। চাল রাখব। দুধের জায়গা দিন।
বাংলা ভাষার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে বিতর্ক কখনও থেমে থাকেনি। বস্তুত ১৯১৬ সালের আগে পর্যন্ত জানা ছিল যে, কৃত্তিবাস এবং মালাধর বসুর লিখা রামায়ণ ও শ্রীকৃষ্ণবিজয়ই হল প্রথম বাংলা ভাষায় লিখিত কাব্য। সেই কারণেই ১৮৭৭ সালে যখন রমেশচন্দ্র দত্ত ‘হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচারে’ লিখেছেন, সেই সময় তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সূত্রপাত হয়েছিল বৈষ্ণব পদাবলীকে সামনে রেখেই। কিন্তু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলা ভাষার ইতিহাসের সম্পূর্ণ বাঁকবদল করে এক নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন সংক্রান্ত একটি গবেষণার কাজ করছিলেন তিনি। সেই সূত্রেই তাঁকে দফায় দফায় যেতে হয়েছিল নেপালে। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগারে তিনি একটি গুপ্তধনের সন্ধান পেলেন। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত একটি পুঁথি। এর সঙ্গে আরও তিনটি পুঁথি একত্র করে ১৯১৬ সালে তিনি সম্পাদনা করে  লিখলেন ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা’। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা করে জানালেন, এই চারটি পুঁথির মধ্যে প্রথমটি বাংলা ভাষায় লিখিত। যার নাম দেওয়া হল ‘চর্যাগীতি’। একটি চর্যাগীতির গানের গীতি ছিল,
‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।’ 
যা অনেকটাই আধুনিক বাংলার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। 
আধুনিক বাংলা কাকে বলে? কোনও একটি সময়কালকে ধরে আধুনিকতার মানদণ্ড বিচার্য হতে পারে না। কোনও একটি ভাষার ব্যবহার যদি বহু বছর পরও সমকালীন যুগের কাছে যথেষ্ট সমকালীনই মনে হয়, তাহলে বলা যেতে পারে ঩সেই রচনারীতি আধুনিক। চমকপ্রদ বিষয় হল, ৫০০ বছর আগে লিখিত বাংলার অতীত সাহিত্যে সমকালীন ভাষা প্রয়োগের নিখুঁত আভাস পাওয়া যায়। যেমন অনায়াসে বলা যেতে পারে যে, অন্যতম আধুনিক সংলাপের সন্ধান পাওয়া যায় কবি বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে। সেখানে একটি নারী চরিত্রের মুখে একটি হাহাকার শোনা গিয়েছে। ওই নারী বলছেন—
জনমদুখিনী আমি
দুখে গেল কাল
যে ডাল আমি ধরি
ভাঙে সেই ডাল। 
এই লেখাটি কোন সময়কালে রচিত হয়েছিল?  ১৪৯৪ থেকে ১৪৯৫ সালের মধ্যে। কীভাবে জানা গেল? সেটিও অতীত বাঙালির তীক্ষ্ণ মেধার প্রকাশ। কবি বিজয়গুপ্ত সাংকেতিক রচনাকাল দিয়েছেন। লেখার শুরুতেই বলেছেন, ‘ঋতু শশী বেদ শশী শক পরিমিত’। অর্থ কী? ৬ ঋতু। ১ চন্দ্র। ৪ বেদ। ১ চন্দ্র। তাহলে পাশাপাশি রাখলে হচ্ছে ৬১৪১। এটা আসলে উলটোদিক থেকে পড়তে হবে। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে ১৪১৬। শকাব্দ। সুতরাং ১৪১৬ শকাব্দ। অর্থাৎ ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দ। সুতারং এই কাব্য এমন সময় লেখা হচ্ছে, যখন প্রত্যক্ষভাবে যে সময় চৈতন্যদেব জীবিত এবং তাঁর ধর্ম আন্দোলন কিছুকাল পর শুরু হবে। অর্থাৎ পাঠক জানতে পারছে, আজ থেকে ৫০০ বছর আগে শ্রীচৈতন্যের আমলে বাংলায় এই বাংলা ভাষায় সাধারণ মানুষ কথা বলত। এই কারণেই এই লেখনী আধুনিক। এই বাক্যগুলি দেখলে মনেই হতে পারে, এখনকার কোনও নারী এই কথাগুলি বলছেন। এটাই আধুনিকতা।
উনবিংশ শতকে কলকাতা বা বঙ্গে বাংলা ভাষার সংলাপ কেমন ছিল? কীভাবে জানা যাবে? একমাত্র উপায়—কিছু বই। অর্থাৎ চরিত্রেরা যে ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু সেখানেও জটিলতা রয়েছে। সাহিত্যে যখন সংলাপের অনুপ্রবেশ ঘটল, সেই সময় প্রধান দুই ভগীরথ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উনবিংশ শতকে প্রধানত তাঁদের গল্প-উপন্যাসের চরিত্রদের দিয়ে সাধু ভাষায় কথা বলিয়েছেন। সাহিত্যের প্রসাদগুণ বৃদ্ধির জন্য, কথ্য ভাষার সঙ্গে সাহিত্যের ভাষার প্রভেদ রাখার জন্য হয়তো ইচ্ছাকৃত এই সংলাপ রচনা। কিন্তু সমস্যা হল, সেক্ষেত্রে আজ বসে জানার উপায় নেই যে, সেই সময় মধ্যবিত্ত বাঙালি কীভাবে কথাবার্তা বলত। অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘দুর্গেশনন্দিনী’ গ্রন্থ রচনার আগেই দু’জন বিখ্যাত লেখক সমকালীন বাংলা ভাষা কেমন ছিল, সেকথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৫৮ সালে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থ। আর ১৮৬১ সালে প্রকাশিত কালীপ্রসন্ন সিংহের লিখিত ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’। সেখানে স্পষ্ট ভাবে জানা গেল, কলকাত্তাইয়া ভাষা ঠিক কেমন ছিল। একটি সংলাপের উদাহরণ হল, ‘আরে না হে না, ওসব বাজে কথা। আমারও বাড়ি টালাতে, রাজাদের বাড়ির পেছনে যে সেই বড় পগারটা আছে জানো? তারি পাশে যে পচা পুকুর, সেই আমাদের খিড়কি।’ সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ১৮৬০-৬১ সালে কলকাতায় যে ভাষায় কথোকপথন হত, আজ কমবেশি সেই সুরই রয়ে গিয়েছে। বিরাট কোনও পার্থক্য হয়নি।
বাঙালিকে বাংলার প্রবাদ, বাংলার লোকগান, বাংলার সংস্কৃতি প্রতিটি সাংস্কৃতিক চিহ্ন প্রদান করেছে বাংলার জেলাগুলি।  
বিভিন্ন জেলার জনপদগুলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, জনসমাজের প্রকৃতি বারংবার উঠে এসেছে জেলাগুলিতে প্রচলিত প্রবাদবাক্যে। যেমন, 
রানাঘাটের হাতনাড়ুনি
শান্তিপুরের কলকলানি
নবদ্বীপের খোঁপা
গুপ্তিপাড়ার চোপা।
অথবা
বোলপুরের ধুলো
নানুরের মূলো
কীর্ণাহারের তুলো।
বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন উপভাষা এবং আঞ্চলিক স্থানের ভাষার বৈচিত্র, ধ্বনি পাথর্ক্য। তার মধ্যে একটি বিশেষ উপভাষা এমনই বিস্ময়করভাবে বিস্তার লাভ করেছে, যার ভৌগোলিক সীমানাটি বেশ বিস্ময়কর। শুধুমাত্র সুবর্ণরেখা নদীর পার্শ্ববর্তী জনপদগুলিতে আবর্তিত করে একটি ভাষার জন্ম হয়েছে। নাম—‘সুবর্ণরৈখিক ভাষা’। নদীর নামে ভাষার নমুনা সম্ভবত বিরল। যদিও মেদিনীপুরেরই একটি আংশিক ভাষাভঙ্গি সুবর্ণরৈখিক। তবুও যেন আপন মাধুর্যে ভাস্বর। সুবর্ণরেখা নদী ঠিক যে জনপদগুলিতে বাহিত হয়েছে, সেটি বাংলাও হতে পারে, অথবা ওড়িশা, তীরবর্তী গ্রামগুলিতে এই ভাষার প্রচলন। যদিও ক্রমেই সেগুলি কম ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় কিছু সংগঠন তো রীতিমতো ভাষা রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়েছে।
বাংলা ভাষার ইতিহাসে সবথেকে বেদনাদায়ক অধ্যায় কোনটা? দেশভাগ। এই একটি ঘটনা ছিন্নমূল লক্ষ লক্ষ মানুষের থেকে শুধু যে নিজেদের ঘরবাড়ি, জীবিকা, সুস্থির জীবন এবং নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ তথা স্বদেশ কেড়ে নিয়েছে তা-ই নয়, সবথেকে বেশি ক্ষতি করেছে ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার। নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ, পাবনা, ঢাকা, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, রাজশাহী, খুলনা, যশোর থেকে আচমকা একদিন সম্পূর্ণ অজানা অচেনা একটি স্থানে চলে আসতে হয়েছিল তাদের। সেখানে যে নতুন করে বাসভূমি গড়তে হবে, জীবিকা খুঁজতে হবে, সম্মানের এক জীবনের সন্ধান করতে হবে! শুধু তা-ই নয়, এর থেকেও বড় অসম্মানের যে বিষয়টি—নিজের মাতৃভাষাকে, এতদিনের মুখের ভাষাকে বাইরের জগতের কাছে যখন বলছে তারা, তখনই যেন সংকোচ হচ্ছে। কেন? কারণ, ওই ভাষাটি এই পশ্চিমবঙ্গ নামক বাঙালিদের দেশে কেউ শুনলেই বুঝতে পারছে যে, এই মানুষটি উদ্বাস্তু। তৎক্ষণাৎ সামাজিক মর্যাদার একটি  পার্থক্য রচিত হচ্ছে। ক্রমেই এই মানুষগুলির মধ্যে অজান্তেই একটি সতর্কতা গ্রাস করল যে, ঘরের ভাষা আর বাইরের ভাষা যেন কিছুটা পৃথক হয়। এই বাংলার শুদ্ধ ভাষা আমাদের দ্রুত শিখে নিতে হবে। তাহলেই যেন আমি আর একটু গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠব। কেউ ব্যঙ্গ করেছে ভাষা শুনে। কেউ বিদ্রুপ করেছে। অতএব নতুন একটা লড়াই শুরু হল। শুরু হল নতুন একটি ভাষা শেখার চেষ্টা, যাকে বলা হচ্ছে বিশুদ্ধ বাংলা। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর পিতা-মাতা, দাদু-দিদার ভাষায় কথা বলে না। কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে গিয়ে তারা এই বাংলা ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ হয়ে পড়ল। অর্থাৎ বাঙালির এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত মুখের ভাষা, পরিবারের ভাষা, ভাবপ্রকাশের ভাষা ৭৮ বছর ধরে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ল। একদিন সেই ভাষাকে বলা হবে, ওটা তো বিদেশি ভাষা। বাংলাদেশি ভাষা। 
বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা কাকে বলে? যে ভাষায় কলকাতা ও সংলগ্ন মানুষ কথা বলে, যে ভাষায় মূলস্রোতের সাহিত্য-গান-নাটক রচিত হয়, সেটাই বিশুদ্ধ বাংলা? যেহেতু এই ভাষা সকলে সহজে বুঝতে পারে এবং অঘোষিতভাবে এটা কাজের ভাষা, কথ্য ভাষা, লেখার ভাষা হয়ে উঠেছে, তাই এটা শুদ্ধ? তাহলে বাকি উপভাষাগুলি? সেগুলি অশুদ্ধ? এই মানদণ্ড কে স্থির করল? কলকাতার এই ভাষা যোগাযোগের ভাষা হতে পারে! হওয়াই সঙ্গত। কিন্তু তার জন্য কি বাংলার তাবৎ উপভাষা ও আঞ্চলিক ভাষাকে অশুদ্ধ আখ্যা দেওয়া যায়? নাকি দেওয়া উচিত? শহুরে শিল্পী যখন ভাটিয়ালি, বাউল কিংবা লালন শাহের গান গেয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করেন, তাঁরা কি অশুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করেন? বাংলায় ছড়িয়ে থাকা লোকশিল্প, লোকগাথা, লোকসঙ্গীত, পালাগান, কীর্তনের আশ্চর্য মেধা ও শিল্পসুষমার ভাষা কখনও অশুদ্ধ হতে পারে? অতএব কেউ একা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ নয়। ভাষা, উপভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, অপভ্রংশ সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা চিরন্তন এক মোদের গরব, মোদের আশা!
 গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
 সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ