Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সংসদ যখন বিতর্কের পরিসর হারায়

বিদ্রুপ কারোরই হয়নি। গত ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদে অধিবেশনের আগে ‘প্রচলিত’ যে মন্তব্য করেছেন সেটি প্রণিধানযোগ্য

সংসদ যখন বিতর্কের পরিসর হারায়
  • ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: বিদ্রুপ কারোরই হয়নি। গত ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদে অধিবেশনের আগে ‘প্রচলিত’ যে মন্তব্য করেছেন সেটি প্রণিধানযোগ্য। সাংসদদের উদ্দেশে, বিশেষ করে ‘একটি বা দুটি দল’কে মনে রাখার জন্য তিনি অনুরোধ করেন যে, সংসদ হল এমন একটি জায়গা যেখানে ‘নাটক করা নয়, বক্তৃতাই দেওয়া উচিত’।

Advertisement

উসকানিমূলক মন্তব্য
শীতকালীন অধিবেশনের শুরুটা শুভ হয়নি। এই প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদির কথাগুলি উদ্ধৃত করা উচিত:
‘দুর্ভাগ্যবশত, এমন একটি বা দুটি দল আছে যারা তাদের পরাজয় হজম করতে পারে না। আমি ভেবেছিলাম, বিহারের ফলাফলের পর যথেষ্ট সময় পেরিয়ে গিয়েছে এবং তারা সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু তাদের গতকালের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে যে, পরাজয় এখনও তাদের সমস্যা ঘটাচ্ছে। ...
‘...দেশে স্লোগান দেওয়ার জন্য বহু জায়গা আছে। যেখানে পরাজিত হয়েছ, সেখানে ইতিমধ্যেই 
চেঁচিয়েছ তুমি। সেখানেও তুমি চিৎকার করতে পার, যেখানে তুমি আগামী দিনে হারতে চলেছ। কিন্তু এখানে, আমাদের জোর দেওয়া উচিত নীতির উপর, স্লোগানে নয়।’
তিনি রাজ্যভিত্তিক দলগুলিকেও কটাক্ষ করেছেন। মোদি বলেছেন, ‘কিছু রাজ্যে শাসক-বিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি) এমন তীব্র যে, ক্ষমতায় আসার পর নেতারা আর জনগণের মধ্যে যেতে পারছেন না ... তাঁরা সংসদে এসে তাঁদের সমস্ত ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।’
এটা ছিল ‘ক্লাসিক’ দ্বিমুখী বক্তব্য। প্রতিটি অধিবেশনের শুরুতে, সরকার বিশ্ববাসীর কাছে ঘোষণা করে যে তাদের লুকোনোর কিছু নেই 
এবং ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এবং সংসদে 
যেকোনও বিষয় নিয়েই আলোচনা করা যেতে পারে। তবে বাধাও একটি আছে: বাধা ‘নিয়মের বাধ্যবাধকতা (সাবজেক্ট টু দ্য রুলস)’। রুলস বা নিয়মগুলি কার্যপ্রণালী পুস্তকে (দ্য বুক অফ রুলস অফ প্রসিডিয়োর) রয়েছে। তবে রুলগুলির ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ প্রায়ই প্রিসাইডিং অফিসারের (স্পিকার বা চেয়ারম্যান) হাতে থাকে। সরকারের ফ্লোর নেতাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমেই তাঁরা তা প্রয়োগ করেন। বিরোধী দল তাদের এজেন্ডা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে উপস্থাপন করলে সরকার সবসময়ই প্রতিটি বিষয়ের বিরোধিতা করে। এর ফলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং প্রধানমন্ত্রী এটাকেই ‘নাটক’ কটাক্ষসহ অবমাননা করেছেন। 
কার এজেন্ডা?
সরকারের এজেন্ডা হল বিলগুলি এবং বাজেট। প্রশ্নোত্তর পর্বে আলোচনার অনুমতি মেলে না। বিরোধী দলের তরফে একটি বাস্তব ও মুক্ত আলোচনার সুযোগ জোটে কেবলমাত্র মুলতুবি প্রস্তাবের উপর বিতর্কের সময়। আর কিছুটা হলেও পাওয়া যায় একটি স্বল্পক্ষণের আলোচনা কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের উপর আলোচনার অনুমতি পেলে। এগুলি হল সময়োচিত সংসদীয় ব্যবস্থা এবং এর কিছু নিয়ম আছে।
কোনও কারণে মুলতবি প্রস্তাবকে সরকারের নিন্দা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে, নিয়মটি স্পষ্ট—লোকসভায়, বিধি ৫৭-তে বলা হয়েছে: মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দেওয়া হবে ... ভারত সরকারের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত সাম্প্রতিক ঘটনার একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে। অন্যদিকে রাজ্যসভায়, জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য, পরোক্ষভাবে, সভার কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুমতি দেয় বিধি ২৬৭।
জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কোনও জরুরি বিষয়ে স্বল্পক্ষণের আলোচনা পরিচালিত হয় লোকসভার ক্ষেত্রে বিধি ১৯৩ এবং রাজ্যসভার ক্ষেত্রে বিধি ১৭৬ অনুসারে।
দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব হল সবচেয়ে সাদামাঠা ব্যাপার। লোকসভার ১৯৭ নম্বর রুল এবং রাজ্যসভার ১৮০ নম্বর রুল অনুসারে একজন সদস্য জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ জরুরি বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন এবং মন্ত্রী সেক্ষেত্রে বিবৃতি দিতে বাধ্য।
নীচের তথ্যগুলি প্রমাণ করছে বিরোধীদের জন্য প্রতিটি দরজা এবং জানালা ধীরে ধীরে কীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মোদি সরকার ক্রমশ একগুঁয়ে হয়ে ওঠার ফলে পরিস্থিতি আরও মন্দ হয়েছে:    (নিবন্ধের শেষে সারণি দ্রষ্টব্য)
দরজা, জানালা বন্ধ
প্রতিটি ক্ষেত্রের পরিস্থিতি বোঝাতে উপর্যুক্ত সংখ্যাগুলিই যথেষ্ট। প্রথম মেয়াদে মোদি সরকার মুলতুবি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল যে ওই প্রস্তাবের উপর বিতর্ক হলে সরকার কলঙ্কিত হবে। স্বল্পক্ষণের আলোচনা বা দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব নিয়ে তারা প্রথম দফায় একটু নরম ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এক্ষেত্রেও সরকারের অসহিষ্ণুতা প্রকট হয়ে পড়ে। দরজা বন্ধ রেখে জানালা খুলে রাখার কৌশল নিয়েছিল তারা। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে তৃতীয় দফায় কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ফিরেছে ঠিকই কিন্তু বিজেপির পক্ষে ‘সিম্পল মেজরিটি’ ছিল না। এই দুর্বল সরকার জানালাগুলিও বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা কি এটাই ধরে নেব যে, জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কোনও জরুরি বিষয়ই আর আলোচনার যোগ্য নয়?
পরিতাপের বিষয় এই যে, বিতর্ক লোকসভার চেয়ে বেশি চাপা পড়ে গিয়েছিল রাজ্যসভায়। অনেক সদস্য এজন্য তৎকালীন প্রিসাইডিং অফিসারকেই দায়ী করেন। গত সেপ্টেম্বরে একজন নতুন চেয়ারম্যান রাজ্যসভায় দায়িত্ব নিয়েছেন। আমার মনে হয়, চেয়ারম্যান ব্যাপারটা শিখে নিতে চাইছেন। তাছাড়া, চলতি শীতকালীন অধিবেশন এতই ছোটো যে এর থেকে কোনও মতামত বেরিয়ে আসবে না। 
সরকার বিশ্বাস করে না যে একটি প্রাণবন্ত এবং বিতর্ক-সমৃদ্ধ সংসদ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার মতবিনিময়, আলোচনা এবং বিতর্কের স্পষ্টতই বিরোধী। নরেন্দ্র মোদির অধিবেশন-পূর্ববর্তী মন্তব্যের বিড়ম্বনা এড়ানো যায় না।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ