ঢাকে কাঠি পড়তে আর মাত্র দু’সপ্তাহের অপেক্ষা। তারপরেই পুজো মণ্ডপ আলো করে মা দুর্গার আগমন ঘটবে মর্তে। বাঙালির সেরা পার্বণ আগতপ্রায়। পুজোর ছুটি বহু বাঙালির কাছেই যেমন ঘরে ফেরার বার্তা নিয়ে হাজির হয়, তেমনই অনেকেই আবার এই ছুটির অপেক্ষায় থাকেন বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে বেড়াতে যাবেন বলে। বেড়ানোর প্ল্যান যাঁরা ইতিমধ্যেই ছকে ফেলেছেন, তাঁদের বলি, বেড়ানোর সময় শেষ মুহূর্তের কিছু সচেতনতার কথা মাথায় রাখা খুবই জরুরি। পুজোর ভিড় সামলে বেড়ানোর ঝক্কি নেহাত কম নয়। নিজের বয়স বুঝে বেড়ানোর কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলাই এই সময়ের জন্য শ্রেয়। এক্ষেত্রে বেড়ানোর তালিকার কয়েকটা ভাগ করে নেওয়া যাক। তাতে জরুরি জিনিস কোথায় কেমন খেয়াল রাখবেন সে বিষয়ে টিপস দেওয়াও সহজ হবে।
পারিবারিক বেড়ানো
ছোট পরিবার: পরিবার যদি ছোট হয়, অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী-সন্তান তাহলে বয়স অনুযায়ী সতর্কতার তালিকাও বদলে যায়। ভ্রামণিকরা যদি সবাই প্রাপ্তবয়স্ক হয় তাহলে সবার মধ্যেই ভাগ করে দিন দায়িত্ব। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর উপর ট্রেন বা প্লেনের টিকিট, হোটেল বুকিংয়ের কাগজ, ভাড়ার গাড়ির কনফার্মেশন স্লিপ ও ড্রাইভারের ফোন নম্বরের দায়িত্ব থাকলে, আনুষঙ্গিক ছোটখাট জিনিস যেমন ফোনের চার্জার, টর্চ, টুপি সানগ্লাস, প্রসাধনী কোথায় কোনটা নেওয়া হবে তার ভার সম্পূর্ণ সামলাতে দিন সন্তানকে। নিজের মতো করে সে জিনিস গোছাবে এবং তা মনে রাখার দায়িত্বও তারই। টিকিট এবং হোটেল বুকিংয়ের কাগজ একটা আলাদা ফাইল করে তার ভেতর রাখুন। তাতে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে। হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কাগজগুলো দিন অনুযায়ী সাজিয়ে নিন। এছাড়াও প্রতিটির সফট কপি নিজের ফোনে একটা আলাদা ফোল্ডার করে রেখে দিন। ফোন থেকেই তা দেখাবেন, কিন্তু অনেক জায়গায় মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় না, সেই সময় কাগজগুলো কাজে লাগবে।
বাচ্চা সহ ভ্রমণ: ছোট পরিবারে যদি বাচ্চা থাকে তাহলে আবার দায়িত্বের ভাগ বদলে যাবে। তখন স্বামী স্ত্রীকেই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে সব দায়িত্ব সামলাতে হবে। ট্রাভেল টিকিটের দায়িত্ব যদি স্বামীর উপর থাকে তাহলে বুকিংয়ের কাগজ থাকবে স্ত্রীর কাছে। তবে দুটোই অন্য জনের কাছেও রাখতে হবে কারণ বাচ্চা সামলাতে কে কখন ব্যস্ত হয়ে পড়বেন কেউ জানে না। এবার আসি বাচ্চার প্রসঙ্গে। ছোট বাচ্চা নিয়ে বেড়ানোর প্রচুর ঝক্কি। তার খাবার, খেলনা, ডায়াপার, নানারকম পোশাক ইত্যাদি নানা কিছু নিতে হয়। সেক্ষেত্রে খাবারের একটা আলাদা ব্যাগ করুন। এখন বাচ্চার দুধ ও জলের বোতলের আলাদা কম্পার্টমেন্ট সহ খাবারের ব্যাগ পাওয়া যায়। সেরকমই একটা সঙ্গে নিন। এছাড়া তার খেলনার একটা ছোট ব্যাগ সঙ্গে রাখুন। অতিরিক্ত খেলনা নেবেন না। এমন কিছু নিন যা তার খুব পরিচিত, যেগুলো কাছে পেলে সে স্বস্তি বোধ করে। কারণ বাড়ির চেনা পরিবেশ ছেড়ে বাচ্চা যখন বেড়াতে যায় তখন অচেনা পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তার পরিচিত কিছু জিনিস লাগে। খেলনাগুলো সেই কাজটা করবে। এছাড়া বাচ্চার পোশাক ও ডায়াপারের জন্য একটা আলাদা স্ট্রলি ব্যাগ নিতে পারেন। আজকাল অনেক ছোট সাইজের বেবি স্ট্রলি পাওয়া যায়, তেমনই একটাতে বাচ্চার পোশাক গুছিয়ে নিন।
বড় পরিবার: আপনার পারিবারিক ভ্রমণের সদস্যদের মধ্যে যদি বাবা মা, ভাই বোনের পরিবার ইত্যাদি যুক্ত থাকে তাহলে কিছু জিনিস খেয়াল রাখতে হবে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ট্রাভেল লাইট। বেড়ানোর ক্ষেত্রে এটা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা দরকার। যত কম লাগেজ নেবেন বেড়ানো ততই সহজ হবে। তাতে বেশি মালপত্রের খেয়াল রাখতে হবে না, ঝাড়া হাত-পা হয়ে ঘুরতে পারবেন। বয়স্ক লোক নিয়ে বেড়ানো প্ল্যান করলে তাঁদের কথা ভেবে জায়গা এবং দিন নির্দিষ্ট করুন। অর্থাৎ এমন কোথাও যাবেন না যেখানে প্রচুর ওঠা নামা করতে হয়, পাহাড় চড়তে হয় বা উচ্চতাজনিত সমস্যা হতে পারে। ভ্রমণের মাঝে একটু রেস্ট ডে রাখুন। অর্থাৎ টানা বেড়ানোর মাঝে একদিন বা দু’দিনের ব্রেক। নাহলে বয়স্ক লোকের পক্ষে খুবই ক্লান্তিকর হয়ে উঠবে বেড়ানো। তাঁরা অসুস্থও হয়ে পড়তে পারেন। ফলে হালকা ভ্রমণতালিকা রাখুন। খানিক বেড়ানো কিছুটা বিশ্রাম, এইভাবেই বেড়ানোর পরিকল্পনা সাজাতে হবে। খুব বয়স্ক সদস্য থাকলে এমন জায়গা বাছুন যেখানে খোলা হাওয়ায় বিশ্রাম নেওয়া যায়। সমুদ্র এমন ক্ষেত্রে খুবই উপযুক্ত। এছাড়াও জঙ্গল, এমনকী কিছু শহরও এই ধরনের বেড়ানোর পক্ষে উপযুক্ত।
মহিলাদের একক ভ্রমণ
একক ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়তে মহিলাদের এখন প্রচুর দেখা যায়। সেক্ষেত্রে কিছু সাবধানতা ও সতর্কতা মেনে চলা খুবই জরুরি। আগে থাকতে সব বন্দোবস্ত পাকা করতে হবে। জায়গাটা সম্বন্ধে গবেষণা করতে হবে, কোথায় থাকবেন সেটা ঠিক করতে হবে, সাইটসিইং ট্রিপ এবং এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়ার গাড়ি ভাড়া করে নিতে হবে। আর একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শরীরের দিকে সবসময় নজর রাখা। সামান্যতম শরীর খারাপ হলেও একা বেড়ানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিন। নাহলে আনন্দ যদি শরীর খারাপের কারণে মাটি হয়ে যায় তাহলে আর বেড়িয়ে মজা কোথায়? তাই প্রস্তুতি প্রয়োজন শারীরিক ফিটনেস নিয়েও। সিকিম ও লাদাখে এমন কিছু হোমস্টে রয়েছে যা শুধুই একা মহিলা পর্যটকদের থাকার বন্দোবস্ত করে। তবে একা বেড়াতে গেলে কিছু জিনিস খেয়াল রাখা জরুরি। এক, শরীর যেন খারাপ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দুই, কারও ব্যবহার সন্দেহজনক মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে সেই সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। তিন, নিজের চালচলন ও ব্যবহারের মধ্যে খুবই আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তুলতে হবে। এই টিপসগুলো মাথায় রাখলে একা বেড়ানোয় কোনও সমস্যাই দেখা দেয় না।
বয়স্কদের সবান্ধব ভ্রমণ
এমন অনেক লোক আছেন যাঁরা সকলেই সিনিয়র সিটিজেন এবং নিজেরাই একটা গ্রুপ বানিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন খেয়াল-খুশি মতো। তাঁরা বিশেষভাবে সতর্ক হয়ে তবেই বেরবেন। নিজেদের ট্রেন বা প্লেনের টিকিট ফোনে থাকলেও অবশ্যই তার প্রিন্ট আউট নেবেন। বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ঠিকমতো নিয়েছেন কিনা দেখে নেবেন। দৈনন্দিন ওষুধপত্র খুব খুঁটিয়ে হিসেব করে নিয়ে নেবেন। হোটেল বুকিংয়ের প্রিন্ট আউট নিয়ে নিন। যেখানেই যাবেন অগ্রিম বুকিং করে নেবেন। পুজোর সময় কিছু জায়গায় খুব ভিড় হয়। সেক্ষেত্রে এই ধরনের জায়গাগুলো এড়িয়ে যান। এমনভাবে ভ্রমণ পরিকল্পনা করুন যাতে বেড়ানোর ফাঁকে একটু বিশ্রামেরও অবকাশ পাওয়া যায়। হোল ডে সাইট সিইং প্ল্যান করবেন না। কোনও একবেলায় তা সীমাবদ্ধ রাখুন। অন্যবেলা নিজের মতো ঘুরুন। এতে পরিশ্রম কম হবে। ক্লান্তও লাগবে না।
জরুরি জিনিসপত্র
বেড়ানোর সময় কয়েকটা জিনিস জরুরির তালিকায় রাখুন। তার মধ্যে প্রথম হল ওষুধ। বাচ্চা নিয়ে বেরলে পেট খারাপ, জ্বর, বমি, কেটে যাওয়া ইত্যাদির জন্য ওষুধ অবশ্যই সঙ্গে নেবেন। তাছাড়াও জায়গা অনুযায়ী ডাক্তারের পরামর্শ মতো কিছু বিশেষ ওষুধও নিয়ে নেবেন। বয়স্ক লোকরা নিজেদের দৈনন্দিন ওষুধের পাশাপাশি জ্বর, পেট খারাপ, ব্যথা ও হজমের ওষুধ অবশ্যই নেবেন। ওষুধের তালিকা তৈরি করার সময় বাচ্চা এবং বুড়ো সকলেই নিজেদের ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।
মালপত্রের দায়িত্ব নির্দিষ্টভাবে ভাগ করে নিন সবার মধ্যে। তাতে এক বা একাধিক লাগেজ এক একজনের দায়িত্বে রাখুন। যে লাগেজ যার দায়িত্বে সে তার সম্পূর্ণ দেখভাল করবে। তা গাড়িতে তোলা, নামানো, হোটেলের ঘরে নিয়ে যাওয়া সবই তার দায়িত্ব। এতে এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়ার সময় লাগেজ ফেলে আসার ভয় কম থাকবে।
বেড়াতে যাওয়ার জন্য কী কী পোশাক লাগবে তা ভেবে ফেলুন আগে থাকতে। সেই মতো সময় সুযোগ অনুযায়ী জামাকাপড় স্যুটকেসে ফেলে রাখতে শুরু করুন বেড়ানোর দিন পনেরো আগেই। তাতে জরুরি জিনিস নিতে ভুল হবে না। এইভাবে নিখুঁত পরিকল্পনা মাফিক ভ্রমণ তালিকা বানিয়ে সেই অনুযায়ী বেড়াতে গেলে সমস্যায় পড়বেন না।



