Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ফ্ল্যাট কিনছেন, ঠকে গেলে কী করবেন?

অবসরের পর ফ্ল্যাট কিনতে চেয়েছিলেন উত্তরপাড়ার বিভূতি সান্যাল। সেই মোতাবেক গোপালপুরের দিকে ফ্ল্যাট নিতে চাইলেন। প্রোমোটারের সঙ্গে কথা ও চুক্তি দুই-ই হয়।

ফ্ল্যাট কিনছেন, ঠকে গেলে কী করবেন?
  • ১৯ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন অনেকেই। স্ট্যান্ড অ্যালোন আবাসনে ডেভেলপার নাকাল করছেন, এদিকে টাকাও দিয়ে ফেলেছেন বেশ কিছুটা। প্রতারিত হওয়ার দুশ্চিন্তায় গৃহস্থের মাথায় হাত! ভারতীয় আইন কিন্তু ন্যায়বিচার দেবে আপনাকে। কোন পথে সমাধান? পরামর্শে কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী আদর্শকুমার শর্মা।

Advertisement

 

ঘটনা ১
অবসরের পর ফ্ল্যাট কিনতে চেয়েছিলেন উত্তরপাড়ার বিভূতি সান্যাল। সেই মোতাবেক গোপালপুরের দিকে ফ্ল্যাট নিতে চাইলেন। প্রোমোটারের সঙ্গে কথা ও চুক্তি দুই-ই হয়। তাঁদের সকল কাগজপত্র বৈধ ও ফ্ল্যাট কেনার জন্য লোন পেতে কোনও অসুবিধা হবে না বলে জানান প্রোমোটার। ৫ লক্ষ টাকা আগামও নেওয়া হয় তাঁর থেকে। কিন্তু বিভূতিবাবুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে ব্যাঙ্কে যাওয়ার পর। তখনই বিভূতিবাবু জানতে পারেন, এই স্ট্যান্ড অ্যালোন ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে তিনি মোটেই লোন পাবেন না, পুরোটাই নগদে কিনতে হবে। কারণ এই নতুন ফ্ল্যাটের এলাকাটি এখন আর গোপালপুরের এলাকায় পড়ে না। বরং বিধাননগর কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত হয়েছে। তাই কাগজপত্রে রয়ে গিয়েছে গলদ।

ঘটনা ২
মা অসুস্থ বেহালার অঙ্গন মিত্রের। তাই ফ্ল্যাট বাছার সময় লিফট আছে এমন প্রপার্টি চেয়েছিল সে। স্ট্রেচারে করে রোগীকে ওঠানো-নামানো যাতে সহজ হয়। কিন্তু ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পর তিন বছর কাটলেও এখনও লিফট করে দেয়নি প্রোমোটার। শুধু তা-ই নয়, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার অনেক পরে ফ্ল্যাট হাতে পেয়েছেন অঙ্গন।

ঘটনা ৩
স্ট্যান্ড অ্যালোন ফ্ল্যাট কিনতে চেয়েছিলেন সৌমী দে। পছন্দ 
করে একটি ফ্ল্যাটও কিনে ফেলেন দুর্গাপুর অঞ্চলে। কিন্তু হস্তান্তরের বছর খানেকের মধ্যে বুঝতে 
পারেন, প্রোমোটার তাঁদের বিস্তর ঠকিয়েছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি এই ফ্ল্যাটে এখনই দেওয়ালে ফাটল, পলেস্তরা খসে যাচ্ছে।

 

তিন ঘটনাই বাস্তব। শুধু চরিত্রগুলির বদলে সেখানে থাকতে পারি আমি-আপনি যে কেউ। অবসরের পর আজীবনের সঞ্চয় ভাঙিয়ে একটা মনের মতো ফ্ল্যাট। কিংবা ভিন জায়গায় চাকরিসূত্রে গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজা। কোথাও আবার শখ! ফ্ল্যাট কেনার কারণ ও উদ্দেশ্য এক একজনের কাছে এক এক রকম। তবে এই ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে, স্ট্যান্ড অ্যালোন ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে নানা বিচিত্র সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় অনেককেই। তাই এসব সমস্যা সমাধানে তৈরি হয়েছে কেন্দ্রের রিয়েল এস্টেট রেগুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আইন (রেরা)। 
অতীতে কিন্তু এই আইন ও কড়া নিয়মকানুন ছিল না। বাড়ি করার মতো স্যাংশনড প্ল্যান নিয়ে কাজ হতো। রেজিস্টার্ড ডেভেলপমেন্ট এগ্রিমেন্ট ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির প্রভূত কাগজপত্র ছাড়াই কাজ হয়ে যেত। সাধারণ ১০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে এগ্রিমেন্ট সই হতো ও ৫০ টাকার নোটেরিয়াল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ছেপেই বাড়ি বা জমির উপর ফ্ল্যাট তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু একবিংশ শতকের শুরুর দিকে এই নিয়মে বদল আসে। এখন এই রেজিস্টার্ড ডেভেলপমেন্ট এগ্রিমেন্ট ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ছাড়া প্রোমোটার কোনওদিন কোনও ফ্ল্যাট তৈরি করতে পারবে না। জমির বা বাড়ির মালিকের সঙ্গে প্রোমোটারের বিস্তারিত চুক্তি নির্ধারিত হয় এই দুই চুক্তির মাধ্যমে। এরপর রয়েছে রেরা আইন। পশ্চিমবঙ্গে এই আইন বাস্তবায়িত হয় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল রেরা’-র মাধ্যমে। 

রেরা অ্যাক্ট
এই আইনের মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট জগতে প্রোমোটারের স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও ক্রেতার অধিকার সুরক্ষিত হয়। একটি নির্মাণে ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রফল ৫০০ বর্গমিটারের বেশি ও ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৮টির অধিক হলে তবেই এই রেরা কার্যকরী হয়। সাধারণত সিংহভাগ ক্ষেত্রে ৫০০ বর্গমিটারের বেশি ও ৮টি ফ্ল্যাটের অধিক নির্মাণ 
দেখা যায়। 
 রেরা-র আওতায় কী কী? 
রেরা আইনের ৩১, ১৮, ১৪, ১৯ ইত্যাদি ধারায় ফ্ল্যাট সংক্রান্ত নানা মামলার নিষ্পত্তি হয়। ফ্ল্যাট হস্তান্তরে দেরি, অনুমোদিত নকশার অবৈধ পরিবর্তন, প্রতিশ্রুত সুবিধা না দেওয়া, কমপ্লিশন সার্টিফিকেট/অকুপেন্সি সার্টিফিকেট না পাওয়া, নিম্নমানের নির্মাণ ইত্যাদি অভিযোগের জন্য এই ধারায় মামলা রুজু করা যায়।
 শাস্তি কী কী?
অপরাধ প্রমাণিত হলে নানা ধরনের শাস্তির প্রতিবিধান রয়েছে। ফ্ল্যাট হস্তান্তরে দেরি হলে সুদ-সহ ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। অপরাধের আকার ও গুরুত্ব বেশি হলে এই সুদের পরিমাণ অনেকটা বাড়ে। কেউ ফ্ল্যাট না নিতে চাইলে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়ার নীতি আছে। নির্মাণে ও নকশায় কোনও ত্রুটি থাকলে ৫ বছরের মধ্যে তা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় মোটা টাকা জরিমানা হয়। প্রোমোটার অন্যান্যভাবে চাপ তৈরি করলে বা ঝঞ্ঝাট প্রাণহানির ঝুঁকি পর্যন্ত গড়ালে জরিমানার সঙ্গে জেল হওয়ার সুযোগও অনেকাংশে থাকে। https://rera.wb.gov.in-এ গিয়ে বিস্তারিত দেখে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রয়োজনে পরামর্শ নিন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর। 
নির্মাণক্ষেত্রে আইনের হাত বেশ লম্বা। রেরা ছাড়াও আরও কয়েকটি আইনি প্রতিবিধান গ্রাহকরা ব্যবহার করতে পারেন। যেমন:  

পশ্চিমবঙ্গ অ্যাপার্টমেন্ট ওনারশিপ অ্যাক্ট, ১৯৭২
নিজের জমি বা বাড়িকে ফ্ল্যাট করার জন্য প্রোমোটারের হাতে তুলে দিচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করতেই এই আইন চালু হয়। এই আইনের মাধ্যমে প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক তাঁর অংশের ফ্ল্যাটের স্বতন্ত্র মালিকানা পান, সঙ্গে জমি ও কমন এরিয়ার উপর সহ-মালিকানা অর্জন করেন।
 এই আইনের মূল বিষয়
এই আইনে অ্যাপার্টমেন্টের ডিক্লেয়ারেশন ও ডিড রেজিস্টার করা হয়। সব ফ্ল্যাট মালিকদের নিয়ে একটি অ্যাসোসিয়েশনও গঠন করতে হবে। ফ্ল্যাটের কমন এলাকা, ছাদ, লবি ইত্যাদিতে সব ফ্ল্যাট মালিকদের অধিকার ও সামগ্রিক মালিকানা বহাল থাকার বিষয়টিও এই আইনের মাধ্যমে বলবৎ হয়। 
 সমস্যায় সমাধান
অনেক সময় দেখা যায়, বেশ কিছু অসাধু ডেভেলপার বা প্রোমোটার কমন এরিয়াকে নিজের নামে করে রাখেন বা নিজের নামে রেখে বিক্রি করতে যান, তাহলে দেওয়ানি মামলা করে নিষেধাজ্ঞা দাবি করা যায়। এছাড়া অ্যাসোসিয়েশন না গঠিত হলে কোর্টের মাধ্যমে চাপ তৈরিও করা যায়। জল, বিদ্যুৎ, নিকাশিব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির দায়িত্ব ডেভেলপার এড়িয়ে গেলে তা নিয়েও এই আইনে মামলা করা যায়। 

উপভোক্তা সুরক্ষা আইন, ২০১৯
স্ট্যান্ড অ্যালোন ফ্ল্যাট নিয়ে সমস্যা হলে যেমন রেরা-র অধীনে মামলা দায়ের হয়, তেমনই রেরা  ও গ্রাহক সুরক্ষা ফোরাম— দু’জায়গাতেই একসঙ্গে মামলা করা যায়। 
 অভিযোগের ভিত্তি
ডেভেলপারের পরিষেবায় নানা ত্রুটি থাকলে, বৈধ নথি না দেখালে, কোনওভাবে হয়রানি করলে, প্রতারণা বা মিথ্যা আশ্বাস দিলে, নকশায় বদল আনলে, অকারণে হস্তান্তরে দেরি করলেও অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
 শাস্তি কী
অপরাধ প্রমাণিত হলে জেলা কমিশনের অধীনে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত, রাজ্য কমিশনে ৫০ লক্ষ-২ কোটি, জাতীয় কমিশনে ২ কোটির ঊর্ধ্বেও জরিমানা হতে পারে।

অন্যান্য আইনি প্রতিকার
এছাড়াও ভারতীয় চুক্তি আইন, ১৮৭২ অনুসারেও মামলা দায়ের করতে পারেন। এতেও চুক্তিভঙ্গের জন্য ক্ষতিপূরণ মেলে। প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল বলেও গণ্য হতে পারে। ডেভেলপারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করা যায়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুসারে, ৩১৮ ধারায় প্রতারণা, ৩১৬ ধারায় বিশ্বাসভঙ্গের মামলা করা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে দেওয়ানি মামলা করে চুক্তি অনুযায়ী সব পরিষেবা দিতে বাধ্য করা যায়। নিষেধাজ্ঞা ও ঘোষণামূলক মামলাও দায়ের হতে পারে। 

 

খেয়াল রাখুন

ফ্ল্যাট কেনার আগে কী কী খেয়াল রাখবেন, তাও জানতে হবে আইনি পথে জটিলতা এড়ানোর জন্য। অনেক সময় বৈধ কাগজপত্র হাতে থাকে না বলে আইনি পথ জটিল হয় ও ফ্ল্যাটও মেলে না। তাই কিছু বিষয় খেয়াল রাখুন।

 আপনার ডেভেলপারের কাছ থেকে পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল বা মাদার ডিড দেখতে চান ও ফোটোকপি সঙ্গে রাখুন।

 ফ্ল্যাট কেনার পর আপনিই যে ফ্ল্যাটের বর্তমান মালিক, তা প্রমাণ করবে সেল ডিড বা বিক্রয় দলিল। সেটি অবশ্যই বুঝে নেবেন।

 এলাকা ও প্লটের নথি যাচাই করে নিন। পজেশন সার্টিফিকেট বা সনদ খতিয়ে দেখে নিন ফ্ল্যাটটি হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত আছে কি না।
 
 ফ্ল্যাট নিয়ে পূর্ববর্তী মালিকের কোনও লোন আছে কি না, জরুরি পরিষেবার বিল, খাজনা এসব বকেয়া আছে কি না জেনে নিন।

 ডেভেলপার বা সোসাইটি থেকে এনওসি নিন। এতে প্রমাণিত হয় যে ফ্ল্যাটটিতে কোনও আইনি সমস্যা নেই।

 ফ্ল্যাটের মিউটেশনের নথি অবশ্যই ভালো করে দেখে নেবেন। যদি ফ্ল্যাটটি বুকিং করা হয়ে থাকে, তাহলে বুকিংয়ের দলিলও যাচাই করুন।

 ফ্ল্যাটটি রেরায় রেজিস্ট্রেশন করা রয়েছে কি না দেখে নেবেন। 

 ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার আগে নিজের ক্রেডিট রিপোর্ট যাচাই করাও বাঞ্ছনীয়। 

মাথার উপর নিজস্ব ছাদ পাওয়া খুব সহজ কাজ নয়। তাই ফ্ল্যাট কেনার সময় একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

মনীষা মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ