বিশেষ নিবন্ধ, অভিজিৎ দাস: সাদা পেন্ট দিয়ে মাটিতে আঁকা আয়তাকার খোপ। একটা-দুটো নয়, পরপর...শতাধিক। ঠায় কাজ করে চলেছে আর্থ মুভার। সাদা খোপ বরাবর কাটা হচ্ছে মাটি। চলছে কবর খোঁড়া। গণকবর। যে শিশুগুলির মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা ছিল, তারা চিরঘুমের দেশে। দলা পাকিয়ে যাওয়া ছোট্টো দেহগুলি একে একে কফিনবন্দি হয়ে আসছে। মায়েরা আছড়ে পড়ছেন সেই কফিনগুলির উপর। সন্তানহারা ইরানি মা অস্পুটে বলছেন, ‘অ্যাজিযাম খুব বাশি’... ভালো থাকিস সোনা আমার।
ইরানে সপ্তাহের প্রথম কাজের দিন শনিবার। ২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল তেমনই একটা দিন। চেনা ট্রাফিক, সকালের চেনা কর্মব্যস্ততা। দক্ষিণ-পূর্বের হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত মিনাব শহর। হরমুজ প্রণালী ও উপসাগরীয় জলপথের নৈকট্যের কারণে শহরটির সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইরানের শক্তিশালী আইআরজিসি বাহিনীর নৌসেনা শাখার ঘাঁটি এখানে। সামরিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মিনাবেরই প্রাণকেন্দ্রে ‘শাজারে তাইয়েবে’ স্কুল। ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুকন্যারা এখানে পড়াশোনা করে। ২৮ ফেব্রুয়ারিও কয়েকশো শিশু একমুখ হাসি নিয়ে মা-বাবার হাত ধরে স্কুলে এসেছিল। সবেমাত্র ক্লাস শুরু হয়েছিল তাদের। আচমকা আছড়ে পড়ল মিসাইল। ভয়ংকর বিস্ফোরণ। স্কুলের ছাদ সহ ভবনের বড়ো অংশ ভেঙে পড়ল। সেই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েই মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৬৫ জনের। সিংহভাগই নিষ্পাপ শিশু। জখম আরও ৯৫। ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি আক্রমণের প্রথম দিনেই মিসাইল হামলা চালিয়ে শিশুদের স্কুল উড়িয়ে দেওয়ার এই ঘটনা ঘটে। তাও আবার সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হওয়ার আগেই নিশানা বানানো হয় স্কুলভবনকে। স্যাটেলাইট ইমেজ ও ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে একাধিক রিপোর্টে দাবি, এই এয়ার স্ট্রাইকে টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। তবে একথা কে না জানে, পশ্চিম এশিয়ায় বর্তমান যুদ্ধে যে দেশগুলি জড়িত, তাদের মধ্যে একমাত্র আমেরিকার কাছেই রয়েছে এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র। একথা ঠিক যে, স্কুলটির কাছেই ছিল ইরানের সেনাবাহিনীর দপ্তর। কিন্তু স্কুলটির ক্যাম্পাস ছিল সেই সামরিক দপ্তর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ‘প্রিসিশন অ্যাটাকে’র যুগে কীভাবে শিশুদের স্কুলে মিসাইল হামলা চলল? সেই কৈফিয়ত কে দেবে? শতাধিক নিরীহ শিশুর রক্তে যাদের হাত ভিজে, তাদের শাস্তি আদৌ হবে তো? নাকি তেমনই কাউকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে বরণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের?
স্কুলটিতে শিশুদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা এক মহিলা কর্মী সেদিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পশ্চিম এশিয়ার একটি সংবাদ মাধ্যমে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মহিলা বলেছেন, বাচ্চাগুলো স্কুলের মাঠে যখন খেলা করত, রোজ ঠায় তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওদের হাসিমুখ দেখে মনটা শান্তিতে ভরে উঠত। ওইদিন একটা কাজে সবে স্কুল থেকে বাইরে বেরিয়েছি। আচমকা কান ঝালাপালা করা আওয়াজ। আগুনের ঝলকানি। ছাদটা ভেঙে পড়েছে। কালো ধোঁয়া উঠছে। জীবনে কখনো সেই দৃশ্য ভুলতে পারব না। মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ার আগে শিশুগুলোর গোঁঙানি শুনেছি আমি। কথা বলার মতো ক্ষমতা ছিল না আমার।
মাত্র আড়াই বছর আগের ঘটনা। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন ইউক্রেনের একটি স্কুল আক্রান্ত হয়েছিল। প্রাণ গিয়েছিল ৩২টি নিরপরাধ শিশুর। পশ্চিম এশিয়ার চলতি সংঘাতেও যুদ্ধবাজদের নির্লজ্জ হামলার শিকার হতে হচ্ছে অসংখ্য শিশুকে। ইরানের মতোই লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে ইজরায়েল। সেখানে ইজরায়েলি এয়ার স্ট্রাইকে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১২১টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের পরিসংখ্যান বলছে, শুধুমাত্র লেবাননে যুদ্ধের কারণে নিরাশ্রয় ৩ লক্ষ ৭০ হাজার শিশু।
প্রতিটি যুদ্ধের সঙ্গেই ওত-প্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে বেশ কয়েকটি সাধারণ পরিণাম। অসংখ্য করুণ মুখ। আতঙ্কগ্রস্ত পরিবার। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। গৃহহীন উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত। এবং অতি অবশ্যই— বিপন্ন শৈশব। মনে রাখা দরকার, শিশুদের জীবন ও তাদের ভবিষ্যৎ কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেরই অংশ হতে পারে না। রাশিয়া হোক বা আমেরিকা, ইরান, ইজরায়েল হোক বা ইউক্রেন— যে-ই হোক না কেন। যত বড়ো সুপারপাওয়ারই হোক না কেন, স্কুলে হামলা সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ। অসভ্যতা। জাতীয় নিরাপত্তা হোক বা কৌশলগত স্বার্থ— কোনো স্লোগানই শিশুর প্রাণের চেয়ে বড়ো নয়। কিন্তু যুগে যুগে যুদ্ধের ইতিহাস অন্য কথা বলছে। রাজনীতির দাবার বোড়ে হয়ে উঠেছে নিরীহ নিষ্পাপ শিশুদের রক্ত। স্কুলে বোমা-মিসাইল, শ্রেণিকক্ষে ছিন্নভিন্ন বই-খাতা, দলা পাকিয়ে যাওয়া দেহ আর রক্তমাখা ব্যাগ— এই চিত্র মানবসভ্যতার চরম লজ্জা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এধরনের নৃশংস ঘটনার দায় কি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো কমান্ডার বা ফাইটার এয়ারক্র্যাফ্ট পাইলটের? নাকি দায় সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে থাকা রাষ্ট্রনেতারও? সামরিক অভিযানে শিশুদের প্রাণহানির দায় কি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এড়াতে পারে? তাছাড়া, চুপ করে থাকা বাকি বিশ্বের রাষ্ট্রনেতাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও অতি গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামরিক সিদ্ধান্তের রাশ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতেই থাকে। প্রেসিডেন্ট হোন বা প্রধানমন্ত্রী, তাঁরা অবশ্যই সরাসরি বোমা ফেলেন না। কিন্তু সামরিক নীতি, হামলার টার্গেট নির্ধারণের অনুমোদন তাঁদের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। ফলে কোনো অভিযানে যদি শিশুদের প্রাণহানি ঘটে, তার নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় কি এড়িয়ে যাওয়া যায়?
শিশুদের জীবন কীভাবে এত তুচ্ছ হয়ে উঠে! অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, একেবারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র এবং উন্নত গোয়েন্দা পরিকাঠামোর যুগে অসামরিক প্রাণহানি প্রায় শূন্যে নামানো সম্ভব বলে সমরবিদদের দাবি। তাহলে কীভাবে দিনের পর দিন বিভিন্ন যুদ্ধের বলি হতে হচ্ছে অগণিত শিশুকে। যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে তা স্বীকার করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে নীতি নির্ধারণ, এসবই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, সেই দায়বদ্ধতা নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কে গ্রহণ করবে সেই উত্তরটাই অজানা। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে রাষ্টসংঘ, নিরাপত্তা পরিষদ, ইউনিসেফ... এইসব ভারী ভারী নাম বাস্তবে কাগুজে বাঘ ছাড়া আর কিছুই নয়। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার স্বচ্ছতায়। ভুল স্বীকারের সাহসেই নেতৃত্বের মর্যাদা। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর মনোজগতে বিশাল প্রভাব ফেলে ভয়াবহ যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার ও ক্লিনিকাল বিষণ্ণতার মতো বহু জটিল মানসিক সমস্যার শিকার হতে হয় চোখের সামনে যুদ্ধ দেখা, বাবা-মার মরদেহ দেখা বা ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে যাওয়া হতভাগ্য শিশুদের। মারাত্মক সেই ক্ষতি শুধুমাত্র মানসিক ব্যাধিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধের তিক্ত ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কারণে তাদের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলি দৃঢ়তা হারায়। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে এই শিশুগুলি। সার্বিকভাবে গোটা জীবন সেই ক্ষতির বোঝা বহন করে চলতে হয় তাদের। ভেঙে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে হানাহানি, দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থা- সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে শিশুর ভবিষ্যৎ দুর্বিষহ করে তোলে।
আমেরিকা, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে বর্তমান সংঘাত পশ্চিম এশিয়ার লক্ষ লক্ষ শিশুর জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এবিষয়ে সতর্ক করেছে রাষ্টরসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ার এই গোটা অঞ্চলে ১ হাজার ১০০-র বেশি শিশু নিহত বা জখম হয়েছে। এবং এই সংখ্যাটা প্রতিদিন বাড়ছে। ইউনিসেফ তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে শিশুদের উপর চরম আঘাত এসেছে। এখনও পর্যন্ত ইরানে ২০০ শিশু, লেবাননে শতাধিক, ইজরায়েলে ৪ জন এবং কুয়েতে ১টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। যুদ্ধের জেরে অগণিত শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অবিরাম এয়ার স্ট্রাইকের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। ইউনিসেফ আরও বলেছে, শিশুদের হত্যা, অঙ্গহানি কিংবা তাদের প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকার ধ্বংস করার কোনো অজুহাতই মেনে নেওয়া যায় না। পশ্চিম এশিয়ার প্রায় ২০ কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ সংকটের মুখে। এবিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানও জানিয়েছে তারা। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন আদৌ দেখা যাবে? সেটাই আসল প্রশ্ন।
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোটা বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি ৭০ লক্ষেরও বেশি শিশু সংঘাত কবলিত এলাকাগুলিতে বসবাস করছে। এই সংখ্যাটা ১৯৯৫ সালের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি। ১৯৯৫ সালের সংখ্যাটা ছিল ২০ কোটির মতো। সবচেয়ে বেশি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় থাকতে হয় পশ্চিম এশিয়ার শিশুদের। সেখানে প্রতি ৫ জনে ২ জন শিশু যুদ্ধ এলাকার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে। আফ্রিকাকে এক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতি ৫ জনে একজন শিশু যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় থাকে। ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটিকে ‘তুমুল’ সংঘাতপূর্ণ এলাকার শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘চরম হিংসা’ হিসাবে রাষ্ট্রসংঘ যে ছ’টি ঝুঁকিকে চিহ্নিত করেছে, তার সবগুলিরই অস্তিত্ব রয়েছে এখানে। ওই ছ’টি ঝুঁকি হল— হত্যা ও অঙ্গচ্ছেদ, শিশুকে যুদ্ধে মোতায়েন ও ব্যবহার, যৌন নিপীড়ন, অপহরণ, স্কুল ও হাসপাতালে হামলা, মানবিক সহায়তা সরবরাহে বিঘ্ন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য সেভ দ্য চিলড্রেন ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রসংঘ ও অন্যান্য গবেষণামূলক নথি। তবে যুদ্ধে শামিল বিভিন্ন পক্ষের রেকর্ডে তথ্যের ব্যাপক ফারাক রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। সেভ দ্য চিলড্রেনের এই প্রতিবেদনে দাবি, শিশুদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে আইনি মানদণ্ডের উন্নয়ন ঘটলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। আর বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, বিশ্বজুড়েই শিশুদের বিরুদ্ধে নৃশংস কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। রাসায়নিক অস্ত্র, ল্যান্ডমাইন এবং ক্লাস্টার বোমার মতো অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে শিশুদের হত্যা ও বিকলাঙ্গ হতে হচ্ছে। সর্বোপরি প্রশ্ন হল, ওদের কী দোষ?