প্রাণকৃষ্ণের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে ঠাকুর বলছেন, ‘মানুষে তিনি বেশী প্রকাশ।…পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে।’ একথাটি তিনি বহুবার বলেছেন। ব্রহ্ম-যিনি সমস্ত গুণ, সুখ দুঃখ, রোগশোকের অতীত তিনিই যখন আবার দেহধারণ করেন তখন জন্মমৃত্যু জরাব্যাধি ইতাদি জীবধর্ম তাঁকে স্বীকার করতে হয়; তা না হলে অবতার হওয়া সার্থক হয় না। আবার তিনি ইচ্ছা করলে এই দেহধর্ম ছেড়ে দিতে পারেন। সাময়িকভাবে শরীরটা যেন তাঁকে আটকে রেখে দেহে কিছু আমিত্ববোধ এনে দেয়।
অবতারকে জানতে হলে তাঁর দুটি দিক ভাবতে হয়। একটি তাঁর ঈশ্বরত্ব, দেবভাব আর একটি জরাব্যাধির অধীনতা—জীবভাব। এটা কল্পনা নয়, সত্য। এই দেহধারণ করা যতখানি সত্য, দেহের ধর্মগুলি স্বীকার করাও ততখানি সত্য। তা না হলে সাধারণ মানুষের থেকে তিনি অনেক দূরে থেকে যান। তাই মানুষের কাছে এলে তাদেরই মতো হয়ে তাদের কাছে ধরা দেন। দেহধর্ম স্বীকার করে এলেও সেই সঙ্গে তাঁর দেবভাবও পূর্ণমাত্রায় থাকে। আবার কখনও কখনও তাও বিস্তৃত হন। রামচন্দ্র সীতার শোকে আকুল হয়েছিলেন। ঠাকুর অক্ষয়ের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে বলেছিলেন, যখন অক্ষয়ের মৃত্যু দেখলাম যেন খাপের ভিতর থেকে তলোয়ারটা বের করে নেওয়া হল। দেহটা পড়ে রইল, প্রাণহীন আত্মা তার থেকে বিযুক্ত হয়ে গেল। কিন্তু তারপরই বলছেন, বুকের ভিতরে যেন গামছা নিঙ্ড়োচ্ছে। এই বেদনা হল জীবধর্ম, অবতার এটিকে অস্বীকার করেন না।
অনাহত ধ্বনি
তারপর অনাহত শব্দের প্রসঙ্গ উঠল। প্রত্যেক শব্দের উৎপত্তির মূলে থাকে কোনো না কোনো আঘাত। অনাহত শব্দের অর্থ হল যে শব্দ আঘাত থেকে উৎপন্ন নয়। অনাহত ধ্বনি বলতে শাস্ত্র বলছেন, এই জগৎটার যে সূক্ষ্মরূপ সেটি হল যেন নাম বা শব্দ। সমস্ত বস্তুর নামের একটা অব্যক্ত স্বরূপ, সেটি অনাহত ধ্বনি। যে স্বরূপ থেকে পরে জগতের বিভিন্ন বস্তুর নাম ও রূপ ক্রমশ পরিস্ফুট হবে।
এ ধ্বনি যেন ব্রহ্মের অবিভক্ত রূপ। তাঁর জগৎ রূপে নিজেকে বিভক্ত করার আগে জগতের যে কারণ বা বীজরূপ—সেই রূপটিকে বলে অনাহত রূপ। বলা হয়, যোগীরা অলৌকিক যোগশক্তির বলে এই ধ্বনি শুনতে পান। একেই প্রণব ধ্বনি বলা হয়। প্রণব মানেই হচ্ছে জগতের সূক্ষ্ম আদি রূপ যার থেকে জগতের সমস্ত নাম ও রূপের প্রকাশ। পঞ্চভূতাদি এমনকি তন্মাত্রাদি আবিষ্কারের অনেক পূর্বে ব্রহ্মের যে অব্যক্ত রূপ তাকে আর একদিক দিয়ে অনাহত বলা হয়েছে।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে