Bartaman Logo
২১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নারীর পেশা ও মাতৃত্ব

আনন্দীবেন প্যাটেলের মন্তব্যে নারীর পেশা ও মাতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেন এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ? বিস্তারিত পড়ুন।

নারীর পেশা ও মাতৃত্ব
  • ২০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: ​আন্না রজম জর্জ (মালহোত্রা) থেকে শুরু করে প্রাঞ্জল লাহেনসিং পাতিল কিংবা উম্মল খের। সবিতা প্রধান, সুরভি গৌতম থেকে হালফিলের টিনা ডাবি বা দিব্যা তানওয়ার। এগুলি কয়েকটি নাম মাত্র। প্রত্যেকেই মহিলা আইএএস। এদের সাফল্যের পিছনে 

Advertisement

স্ট্রাগল আছে। ডেডিকেশন আছে। এদের সবার 
স্টোরি আলাদা। কিন্তু মিল একটাই আছে। ভাগ্যিস এদের কেউ বলেননি, শোন বাপু, আইএএস-ফেস যাই হও না কেন, আগে ভালো মা হতে হবে। তারপর ওসব দেখা যাবে।
কেন বললাম এই কথা? উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল এবং গুজরাতের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী আনন্দীবেন প্যাটেল সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের কানপুরে ছত্রপতি শাহুজি মহারাজ ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেখানেই তিনি বলেন, ‘আপনি আইএএস অফিসার হোন বা শিক্ষক, সবার আগে দক্ষ মা হতে হবে। বাড়িতে কীভাবে রান্না করতে হয়, তা প্রত্যেকের জানা উচিত।’ অর্থাৎ, নারীদের আইএএস অফিসার বা শিক্ষক হওয়ার মতো পেশায় যাওয়ার আগে  ‘একজন দক্ষ মা’ হওয়া উচিত। মাতৃত্ব এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালন করাটাই নারীদের প্রাথমিক কর্তব্য হওয়া উচিত। এর দু’দিন আগেই লখনউয়ের ডঃ এ পি জে আবদুল কালাম টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আজকাল ছেলেমেয়েরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। তারপর মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সেই সন্তানদের দায়িত্ব সরকারের উপর এসে পড়ে।’  নারীদের পেশা, মাতৃত্ব এবং বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে তাঁর এই উপদেশের পরেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন নারীরা মহাকাশে যাচ্ছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ রাখছেন। ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশকে সাফল্য এনে দিচ্ছেন। বিচার ব্যবস্থায় সাফল্য পাচ্ছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির মতো পদেও দায়িত্ব নিচ্ছেন। তখন একজন সাংবিধানিক প্রধানের মুখ থেকে এহেন মন্তব্য সমাজে নারীর অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আসলে আনন্দীবেন প্যাটেলের মন্তব্যকে শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত মতামত হিসাবে দেখলে কিন্তু ভুলই হবে। তিনি যে রাজনৈতিক দল এবং আদর্শগত ঘরানা থেকে উঠে এসেছেন, তার মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। তাঁর মন্তব্য মূলত সংঘ পরিবারের বৃহত্তর মতাদর্শেরই প্রতিফলন। সমাজে নারী এবং পুরুষের ভূমিকা নিয়ে আরএসএস-এর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সংঘের মতে নারী হলেন ‘মাতৃশক্তি’। অর্থাৎ, একজন নারীর সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র পরিচয় হলো তিনি একজন মা। হিন্দু সংস্কৃতির রক্ষক এবং পরিবারের মূল ভিত্তি হিসাবে মাতৃত্বকে সর্বোচ্চ আসনে বসানো হয়। আনন্দীবেন প্যাটেলের ‘আইএএস হওয়ার আগে দক্ষ মা হওয়া প্রয়োজন’ মন্তব্যের মধ্যে সংঘের এই ‘মাতৃশক্তি’ দর্শনেরই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
আরএসএস-এর একটি অন্যতম কর্মসূচি হলো ‘কুটুম্ব প্রবোধন’ বা পারিবারিক জাগরণ। সংঘ বিশ্বাস করে যে, সমাজকে শক্তিশালী করতে হলে আগে পরিবারকে শক্তিশালী করতে হবে। আর এই পরিবারের সংস্কৃতি, সংস্কার এবং মূল্যবোধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করার মূল দায়িত্ব হল মায়ের। পেশাগত জীবনে নারী যতই সফল হোন না কেন, সংঘের আদর্শ অনুযায়ী পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্বই সর্বাগ্রে বিবেচ্য।​১৯৩৬ সালে আরএসএস-এর নারী শাখা হিসাবে ‘রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সমিতি নারীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের কথা বলে। যদিও মূল লক্ষ্য হলো নারীদের হিন্দু রাষ্ট্রের আদর্শ মাতা এবং সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা। সমিতি মনে করে পশ্চিমি সংস্কৃতি পরিবারের কাঠামো ভেঙে দেয়। তাদের মতে, নারীর স্বাধীনতা মানে পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে থেকে সমাজের সেবা করা। খুব স্বাভাবিকভাবেই ​​আরএসএস লিভ-ইন রিলেশনশিপ, বিবাহবিচ্ছেদ বা নারীদের এককভাবে স্বাধীন জীবনযাপন করাকে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে মনে করে। তাই আনন্দীবেন প্যাটেল যখন পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা বা স্বাধীনভাবে সম্পর্ক তৈরি করার বিরোধিতা করেন, তখন সেটি আসলে তাঁর সংঘেরই শিক্ষা।
মনে রাখতে হবে, সমাজে মাতৃত্ব কোনো বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়। এটি ব্যক্তিগত পছন্দ। একজন নারী মা হবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। একজন সফল প্রশাসক, চিকিৎসক বা শিক্ষক হওয়ার জন্য মাতৃত্বের কোনো পূর্বশর্ত থাকতে পারে না। ভারতে নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে ঠিকই। বিভিন্ন সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা এখন ছাত্রদের সমান বা তারও বেশি। প্রশাসনিক পরিষেবা, বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, বিজ্ঞান গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই নারীদের উপস্থিতি বাড়ছে। কিন্তু এরই মধ্যে এটাও সত্য যে, ভারতীয় নারীরা অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ভারতে তুলনামূলকভাবে এখনও কম। বিশেষ করে শ্রমশক্তিতে। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের ২০২৪ সালের 'টাইম ইউজ সার্ভে বলছে, প্রতিদিন ৮১.৫ শতাংশ নারী কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই ঘরের নানা কাজ করেন। যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৭.১ শতাংশ। নারীরা ঘরের কাজের পিছনে দিনে গড়ে ২৮৯ মিনিট সময় দেন। আর পুরুষরা দেন মাত্র ৮৮ মিনিট। সন্তান বা পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের দেখভালের জন্য নারীরা প্রতিদিন ১৪০ মিনিট ব্যয় করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সময় মাত্র ৭৪ মিনিট।
সোজা কথায়, সন্তান লালন-পালন এবং ঘরের কাজের পুরো দায়িত্ব সাধারণভাবে নারীর উপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এরপর কোনো একজন রাজ্যপাল বিশেষ করে মহিলা রাজ্যপাল যদি এমন মন্তব্য করেন, তবে কি এই বৈষম্য আরও বাড়বে না? রাজ্যপালের অভিমত কি কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরোধিতা করছে না? কারণ সরকারই তো ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’-এর কথা বলছে। আইনসভায় ৩৩ শতাংশ নারীদের উপস্থিতির কথা বলছে। নারী ক্ষমতায়নের কথা তুলে ধরছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ একজন রাজ্যপাল নারীদের পরোক্ষে ঘরে থাকার বার্তা দিচ্ছেন। এটাকে কি স্ববিরোধিতা বলব না?
প্রশ্নটা কেন উঠছে? কানপুরের যে সমাবর্তনে আনন্দীবেন ওই মন্তব্য করেছেন, সেখানে সম্মানপ্রাপকদের ৮২ শতাংশই ছিলেন মহিলা। তাঁদের আনন্দীবেন দক্ষ মা হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ভালো কথা। কিন্তু যদি উলটো হত। বহু পুরুষও তো সেখানে পদক ও মানপত্র পেয়েছেন। তাঁদের কেন ‘দক্ষ বাবা’ হওয়ার উপদেশ দেওয়া হল না? শুধু নারীদের ক্ষেত্রে মাতৃত্বের বাধ্যবাধকতা কেন চাপিয়ে দেওয়া হবে? সমালোচকদের মতে, এই ধরনের মন্তব্য সমাজে প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাধারাকেই মান্যতা দেয়। যে মেয়েটি রাত জেগে পড়াশোনা করছে, এই ধরনের বক্তব্য তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত দিতে পারে। আবার অনেকেই বলছেন, এই ধরনের মন্তব্য কর্মক্ষেত্রে নারীদের আরও বিপাকে ফেলবে। কারণ মেয়েটি তো সংসারেই ফিরে যাবে ধারণা প্রচলিত হলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে। আনন্দীবেনের মন্তব্যকে ‘প্রগতি-বিরোধী’, ‘লিঙ্গবৈষম্যমূলক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে মাতৃত্বের মূল্য কে দেবে? মাতৃত্ব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি সমাজ সত্যিই মাতৃত্বকে মূল্য দেয়, তবে তার দায় কি নারীর একার? ঘর-সংসসারে পুরুষেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে, এই আলোচনা কেন গুরুত্ব পায় না?একজন নারী যদি আইএএস অফিসার হন এবং একই সঙ্গে মা হন, তবে কি আমরা তাঁকে কম  দায়িত্বশীল মা বলে চিহ্নিত করব? নাকি রাষ্ট্র ও পরিবার—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেব? 
একজন নারী ‘এক্সপার্ট মা যেমন হতে পারেন, তেমনি একই সঙ্গে ‘এক্সপার্ট প্রশাসক’, ‘এক্সপার্ট শিক্ষক’ বা ‘এক্সপার্ট বিজ্ঞানী’ও হতে পারেন। রাষ্ট্রের কাজ তাঁর পছন্দের পথকে সীমাবদ্ধ করা নয়, বরং সেই পথকে আরও সহজ করে দেওয়া। মনে রাখা দরকার, ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এমন এক সমাজ গঠনের উপর, যেখানে নারীদের বলা হবে না—‘আগে এটা হও, তারপর ওটা’। বরং বলা হবে—‘তুমি যা হতে চাও, তার জন্য সমান সুযোগ তোমার অধিকার।’ আনন্দীবেনের মন্তব্যের বিরোধিতায় মুখ খুলেছে সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস। দু’দলেরই মূল বক্তব্য, আনন্দীবেনের এই মন্তব্য একেবারে সেকেলে টাইপের। আজকের জেন জি প্রজন্ম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধ্যান-ধারণাই নেই। আজকের দিনে দিদা-ঠাকুরমারাও নিজেদের বদলাচ্ছেন। কিন্তু সংঘের আদর্শ উদ্বুদ্ধ উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল পালটাচ্ছেন না। কিরণ বেদির মতো প্রথম মহিলা আইপিএস বলেছেন, একজন নারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা কে নির্ধারণ করবে? নারীদের জীবনের নিয়মাবলি কে লিখে দেবে? নারীদের নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার থাকা 
উচিত। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য রেখা বর্মার ভাষায়, কোন পথ বেছে নিতে হবে, তা আজকের তরুণীরা ভালোই জানেন। তাই আচার্য হিসাবে সেই জ্ঞান না দিয়ে তিনি শিক্ষার উন্নতি বা নারী সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে পারতেন। আবার কঙ্গনা রানাওয়াতের মতো সাংসদ-অভিনেতার বক্তব্য, নারীরা দেবী, শক্তি ও মাতার প্রতীক এবং লালন-পালন তাঁদের স্বাভাবিক গুণ।
একজন দক্ষ প্রশাসক কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বশীল মাও হতে পারেন। আজকের দিনের নারীরা একথা প্রমাণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে পারেন। মাতৃত্ব একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু সেটি কখনোই নারীর একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। এটি তাঁর মেধার পরিমাপক হতে পারে না। তাই ​নারীদের কী করা উচিত, সে ব্যাপারে সমাজ ও রাষ্ট্রের ফতোয়া দেওয়ার দরকার নেই। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে নারীরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথে স্বাধীনভাবে হাঁটতে পারেন। তাঁদের প্রয়োজন শুধু ডানা মেলার জন্য একটু মুক্ত আকাশ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ