রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পর্যুদস্ত তৃণমূল কংগ্রেসের উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, তার ফয়সালা এখনও হয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু আপাতত এবারের ২১ জুলাই কার, সেই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে রাজনৈতিক মহল থেকে আম জনতা। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে নিহতদের (‘শহিদ’) স্মরণে বাৎসরিক সমাবেশ হয়ে আসছে রাজ্যে। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু পালাবদলের পর মমতার তৃণমূল এখন তিন টুকরো। এক টুকরো এনসিপিআই নামের একটি দলে যোগ দিয়ে কেন্দ্রের এনডিএ সরকারের শরিক বলে নিজেদের ঘোষণা করেছে। এতে লোকসভার ২০ জন সাংসদ (যাঁরা তৃণমূল টিকিটে নির্বাচিত হয়েছিলেন) রয়েছেন। অন্য এক টুকরো রাজ্য বিধানসভায় ‘আসল তৃণমূল’-এর স্বীকৃতি আদায় করে প্রধান বিরোধীদলের মর্যাদা পেয়েছে। এই বিদ্রোহী শিবিরে সিংহভাগ তৃণমূল বিধায়ক রয়েছেন। এই অংশের উপর রাজ্যের নতুন শাসকগোষ্ঠীর প্রচ্ছন্ন মদত থাকায় বিদ্রোহী শিবির দিন দিন আড়ে-বহরে বেড়ে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এক টুকরো আদি ও অকৃত্রিম মমতাপন্থী, যাদের কপালে জুটেছে ‘কালীঘাট তৃণমূলে’র তকমা। অতএব ২১ জুলাইয়ের ‘শহিদ’ স্মরণের অনুষ্ঠানও এবার তিন ভাগ। প্রত্যেকেই ‘শহিদ স্মরণ’ করায় আসল হক তাদের বলে দাবি করেছে। স্মরণ-অনুষ্ঠানের আর এক দাবিদার প্রদেশ কংগ্রেস— যাদের সমাবেশ হবে শহিদমিনার ময়দানে। স্বভাবতই গত বছর পর্যন্ত যে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়নি, এবার সেটাই ‘বড়ো’ আকারে দেখা দিয়েছে। ২১ জুলাই তুমি আসলে কার? যুব কংগ্রেসের? এনসিপিআই নামক তৃণমূল সাংসদদের? বিধানসভার বিদ্রোহী তৃণমূলের? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের?
ক্ষমতার কারবারি রাজনীতির এই আকচাআকচিতে হয়তো ধাঁধায় পড়েছেন সেই শহিদ পরিবারগুলিও! এতকাল অর্থাৎ গত বছর পর্যন্ত শাসক তৃণমূলের মঞ্চে নেতা-মন্ত্রী, দলনেত্রীর স্নেহধন্য সেলিব্রিটিদের সঙ্গে শহিদ পরিবারের লোকজনদের দেখা যেত। যদিও তৎকালীন বিরোধীকণ্ঠে অভিযোগ শোনা যেত, শহিদ স্মরণের অনুষ্ঠান হলেও সেই মঞ্চে শহিদ পরিবারই ছিল সবচেয়ে বেশি ব্রাত্য। এবার তাই ‘প্রকৃত শহিদ স্মরণ অনুষ্ঠান’ করতে সব পক্ষই প্রায় শপথ নিয়ে ফেলেছে। সেইমতো নিহতদের পরিবারগুলিকে মঞ্চে হাজির করতে প্রায় সব পক্ষেরই তৎপরতা তুঙ্গে। প্রত্যেকেরই দাবি, তাদের মঞ্চেই থাকবেন শহিদ পরিবারের লোকেরা। ঘটনা হল, এই দড়ি টানাটানিতে প্রায় প্রত্যেক শহিদ পরিবারই বিস্মিত, হয়তো বা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হচ্ছেন। অনেকেই মনে করছে, ঘটনার ৩৩ বছর পর শহিদ পরিবারদের নিয়ে এই প্রতিযোগিতা কাম্য নয়। শহিদ পরিবারের কারও কারও মতে আবার, এতদিন যাঁর মঞ্চে (মমতার) গিয়েছি, এবারও তাঁর অন্যথা হবে না। নেত্রীর সঙ্গে বেইমানি করা যাবে না। আসলে টুকরো হওয়া তৃণমূলের নানা গোষ্ঠী সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। দেখাতে চাইছে তাদের জনসমর্থন বা ক্ষমতা প্রদর্শন। তাই ২১ জুলাইয়ের এহেন পরিস্থিতিতে শহিদ তুমি কার— সেই প্রশ্ন কেউ তুললেও বিশেষ ভুল হবে না। মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি এই বাংলার মানুষ বারবারই দেখেছে। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি যে, ৩৩ বছর আগের একটি অত্যন্ত বেদনাজনক ঘটনার জের টেনে যেভাবে স্বজনহারা শহিদ পরিবার নিয়ে দড়ি টানাটানি হচ্ছে তা শুধু দুঃখজনকই নয়, অমানবিক এবং অনভিপ্রেতও। এমন পঙ্কিল রাজনীতি কবে বন্ধ হবে?
বলা বাহুল্য, যা নিয়ে এত আয়োজন, প্রস্তুতি, দড়ি টানাটানি— তার তদন্ত রিপোর্ট কিন্তু গত পনেরো বছরেও সামনে আসেনি। তথ্য বলছে, ২০১১-তে ক্ষমতায় আসার পর ২১ জুলাইয়ের গুলি চালানোর ঘটনার তদন্ত করতে বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করে মমতার সরকার। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে কমিশন। বাম আমলের সেই ঘটনার সময় রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন মণীশ গুপ্ত এবং পুলিশ কমিশনার ছিলেন তুষার তালুকদার। কমিশনে তাঁরাও সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্য দেন তৎকালীন রাজ্যের মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কমিশনের সেই রিপোর্ট কোনো অদৃশ্য কারণে প্রকাশ্যে আনেনি। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে না আনা হলেও বছর বছর ঘটা করে কিন্তু ২১ জুলাই শহিদ স্মরণের অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু শহিদ পরিবারগুলি জানতেই পারেনি তদন্ত রিপোর্টে কী আছে। কেন তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি? স্বস্তির কথা হল, এবারের শহিদ দিবসের আগের দিন, সোমবারই বিধানসভায় আগের সরকারের কাছে জমা পড়া সেই রিপোর্ট পেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী শহিদ পরিবারগুলিকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, তাঁরা মনে করলে নতুন করে এফআইআর করতে পারেন। ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদনও জানাতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় নতুন করে আশা জেগেছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে। এবার হয়তো তাঁরা ন্যায় বিচার পাবেন।