ধৃতরাষ্ট্র বিবেক সঞ্জয়কে প্রশ্ন করছেনঃ অস্মিন্, ধর্মক্ষেত্রে তথা অস্মিন্ কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধার্থং সমবেতাঃ মামকাঃ অর্থাৎ মমপক্ষীয়াঃ পান্ডবাঃ অর্থাৎ পান্ডবপক্ষীয়াঃ তে যুদ্ধার্থং সমবেতাঃ কিম্ অকুর্বত ভো বিবেক কথয়।
ধর্মক্ষেত্র কী? বলা হয়েছে, ধর্মক্ষেত্র হ’ল এই শরীরটা। শরীর না থাকলে ধর্ম সাধনা করা যায় না। যে সব মানুষ এই জীবনে অনেক ভাল কাজ করেছেন, যাঁদের আত্মা অনেক উন্নত হয়েছে তাঁরাও যদি মোক্ষ প্রাপ্তির পূর্বেই কালগ্রস্ত হন, মারা যান, তাহলে যতদিন পর্যন্ত না নোতুন জীবন পাচ্ছেন ততদিন তাঁদের প্রগতি স্তব্ধ থাকে, বন্ধ থাকে; কারণ শরীর পেলে, শরীর থাকলে তবেই সাধনা হবে। তাই শরীর হ’ল ধর্মক্ষেত্র। শরীর কেন ধর্মক্ষেত্র তা ভাল করেই বুঝিয়ে দিয়েছি সেদিন।
আর একটুখানি ফোনেটিক্সের কথা, শব্দবিজ্ঞানের কথা বলে দিয়েছি, ‘ক্ষ’-এর ‘কৃষ’ হ’ল ঋগ্বেদীয় উচ্চারণ আর ‘ক্খ’ হ’ল যজুর্বেদীয় উচ্চারণ। বাংলা, অসমিয়া ও আরো কয়েকটি ভাষা যজুর্বেদীয় নিয়মের দ্বারা পরিচালিত হয়। তাই তারা ‘খ’-এর মত উচ্চারণ করবে, আর ‘কষ’ (ক্ষ), ‘কখ’ (ক্ষ) দু’টো উচ্চারণই সমভাবে শুদ্ধ। তবে বাংলা উচ্চারণ-রীতি অনুযায়ী ‘কষ’ অশুদ্ধ, ‘কখ’ শুদ্ধ, কিন্তু সংস্কৃত রীতি অনুযায়ী দু’টোই শুদ্ধ।
এখন এই যে ধর্মক্ষেত্র বা শরীর, কেবল এখানেই যে সংগ্রাম চলছে তা’ তো নয়। এই যে ধর্মক্ষেত্র বা শরীরটা—এটা আছে কোথায়? থাকছে কোথায়?—না, এই কুরুক্ষেত্রে। সেটা কী জিনিস? এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়—সব কিছু চলমান, সব কিছু চলছে; থেমে থাকবার উপায় নেই, থামতে চাইলেও থেমে থাকা যাবে না। কারণ, গতি হ’ল অস্তিত্ত্বের পরিচায়ক। গতি নেই মানে সে অনস্তিত্বের দোষে দুষ্ট। এখন প্রশ্ন হ’ল, কেন সব কিছুতেই গতি থাকবে? এর উত্তর হচ্ছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটা পরম পুরুষের সংকল্পসঞ্জাত। তাই চিত্তাণু কেবলই ছুটে চলেছে তার চিন্তাধারার স্পন্দন অনুযায়ী ও এই চিন্তাধারার স্পন্দন সর্বক্ষেত্রেই সংকোচ-বিকাশী। ‘উহ’ আর ‘অবোহ’ অনুযায়ী এগিয়ে চলে এই সংকোচ-বিকাশিত্বের ভেতর দিয়ে। এই স্পন্দনের ভেতর দিয়ে বস্তুরূপ পরিগ্রহ করে, আরেকটা রূপ আসে। তাই সৃষ্ট জগতে কেউ থেমে থাকতে পারে না। সে কোন-না-কোন রকমের রূপ পরিগ্রহ করছে, তাকে চলতে হয়েছে, চলতে হচ্ছে ও চলতে হবে। তাই এই সৃষ্ট জগতে কেউ থেমে নেই। সৃষ্ট জগৎ চলছে…চলছে…। তাই এই সৃষ্ট জগতের মূল ভাবটি হচ্ছে, ‘এগিয়ে চলো’।
এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে কেউ যদি স্থাণুভাবে থাকতে চায় তার সেই চাওয়াটা সার্থক হবে না। কারণ, এখানে চলাটাই ধর্ম, চলাটাই প্রাণধর্ম। কেউ বেঁচে আছে কিনা জানতে গেলে নাড়ীর স্পন্দন আছে কি না পরীক্ষা করি। নাড়ীর স্পন্দন অস্তিত্বের নির্ধারক।
শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে



