চীন নিয়ে সরকার নীরব কেন?
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: বিস্ফোরণটা ঘটিয়েছেন ইন্দো টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশের ডিজি শত্রুজিৎ কাপুর। ৩১ অক্টোবর তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। ঠিক তার আগে রাজস্থানের আলওয়ারে এক অনুষ্ঠানে তিনি যা বলেছেন, তাতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। জানি না কবে তিনি এর জন্য ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ চিহ্নিত হবেন! তিনি বলেছেন, অরুণাচল প্রদেশের একাধিক স্থানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর সংঘাত বা ‘ফেস-অফ’ ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই টানাপোড়েন এখনও অব্যাহত। ডিজি কাপুর জানান, দুর্গম উচ্চতায় মোতায়েন আইটিবিপি-এর নবগঠিত এলিট ‘শৌর্য কম্যান্ডো’ বাহিনী এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অসামান্য বীরত্ব দেখিয়ে চীনা অনুপ্রবেশ প্রতিহত করছে। গত মাসের ব্রিকস সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের সঙ্গে ফোটো তোলার জন্য মোদির আদিখ্যেতা আমরা দেখেছি। অথচ সেই জুলাই থেকেই অরুণাচলে দু’পক্ষের সংঘাত চলছে। ভারতের অভ্যন্তরে ৬-৭ কিলোমিটার ঢুকে তাঁবু খাটিয়ে দিব্যি রয়েছে চীনা সেনা। ২৬টি পেট্রলিং পয়েন্ট নাকি ভারতের হাতছাড়া। সরকার এতদিন সব জেনেও চুপ। কেন এই নীরবতা, তা নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।

Advertisement

চীনের এই আগ্রাসন নীতি নতুন কিছু নয়। ম্যাকমোহন লাইনকে না মেনে বেজিং বরাবরই অরুণাচলকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ প্রদেশ বলে দাবি করে। সেই ২০১৭ থেকে অরুণাচলের বিভিন্ন এলাকার চীনা নাম প্রকাশ করছে তারা। শুধু তাই নয়, বছর দশেকের মধ্যে একাধিকবার ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষ বা অচলাবস্থা দেখা গিয়েছিল। ২০১৭ সালের ভারত-ভুটান সীমান্তের ডোকা লা নিয়ে প্রায় ৭৩ দিন ধরে টানাপোড়েন চলেছিল। তবে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছিল ২০২২ সালের জুন মাসে পূর্ব লাদাখের গলওয়ানে। ১৫ জুন রাতে চীনের বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কর্নেল বি সন্তোষ বাবু সহ ২০ জন ভারতীয় জওয়ান শহিদ হন। অথচ, সেই ঘটনার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘কেউ আমাদের সীমান্তে প্রবেশ করেনি। কেউ আমাদের কোনো পোস্ট দখল করেনি।’ চীন যে গলওয়ানের পর থেমে গিয়েছে, এমনটা মোটেও নয়। ২০২২ সালেও অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং সেক্টরে প্রায় তিন শতাধিক চীনা সেনা কাঁটাতারের লাঠি ও রড নিয়ে ভারতীয় চৌকি দখলের চেষ্টা করে। যদিও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
চীন কিন্তু থেমে যায়নি। লাদাখ সীমান্ত থেকে মনোযোগ সরিয়ে তারা বারবার অরুণাচল সীমান্তে চাপ সৃষ্টির কৌশল বজায় রেখেছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের  চীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লি চীনের এই কৌশলকে ‘সালামি স্লাইসিং’ আখ্যা দিয়েছেন। কী এই সালামি স্লাইসিং? একেবারে বড়ো কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ছোটো ছোটো পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জোরদার করা। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের কৌশল নিলে একসময় সেগুলির সম্মিলিত প্রভাব অনেকটাই বড়ো হয়ে ওঠে। অধ্যাপক কোন্ডাপল্লির অভিযোগ, অরুণাচল এলাকায় চীন এই ধরনের কৌশল নিচ্ছে। বিশেষ করে আপার সুবনসিরি জেলার লুংচু ও তাকসিং এলাকা। তিনি যা বলেছেন, তা অনেকটাই ডিজি শত্রুজিতের মতোই। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও কার্যত এই ধরনের ‘ফেস অফ’ বা সংঘাতের ঘটনা মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চীনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহলদারির ধরন থেকে সরে আসার ফলেই দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কূটনৈতিক পদ্ধতিতে দু’দেশের এই ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর চেষ্টা চলছে।
গলওয়ান সংঘর্ষের পর জনপ্রিয় অ্যাপ ‘টিকটক’ সহ আরও কয়েকটি চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, জীতায়তাবাদের ধুয়ো তুললেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের উপর নির্ভরতা সামান্যও কমাতে পারেনি মোদি সরকার। বরং তা দিন দিন বেড়েছে। তা সে যতই ‘চীনা পণ্য বয়কট করুন’ রব তোলা হোক না কেন। ভারতের বাজার এখন ছেয়ে গিয়েছে চীনা পণ্যে। বিগত কয়েক বছরে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ঘাটতি রেকর্ড অঙ্ক ছুঁয়েছে। টাকার অঙ্কে সেটি ১০৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। আত্মনির্ভর ভারত’ বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র ঢাকঢোল পেটানো হলেও জীবনদায়ী ওষুধের কাঁচামাল থেকে শুরু করে টেলিকম বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ—প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্র চীনা আমদানির ওপর টিকে রয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের দেশের জওয়ানরা যখন সীমান্তে বুক চিতিয়ে লড়াই করছেন, ঠিক তখনই দেশের অর্থভাণ্ডার থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চীনের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে।
স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্স বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানি এই বিষয়টিই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, চীনের সাম্প্রতিক নীতি শুধুমাত্র সীমান্তে সামরিক চাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীন দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে। প্রথমত সামরিক ফ্রন্ট। সেটি হল, সীমান্তে সর্বক্ষণ চাপ বজায় রাখা। যাতে ভারত চরম আবহাওয়ায় বিপুল রসদ ও সৈন্য মোতায়েন রাখতে বাধ্য হয়। এর ফলে ভারতের বাজেটের একটি বড়ো অংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হবে। এতে উন্নয়নমূলক প্রকল্প থেকে সরকার দূরে সরে যাবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে চীন কৌশলগতভাবে ভারতের সীমান্তে নিরাপত্তার হুমকি বজায় রেখে দেয়। দ্বিতীয়ত হল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ফ্রন্ট। ​ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতির কথা তো আগেই জানিয়েছি। এছাড়া আরও নির্দিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের চীনা নির্ভরতাকে বেজিং দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। ভারতের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষেত্র যাতে দ্রুত চীনা আধিপত্য কাটিয়ে উঠতে না পারে, তার জন্য সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা ধরনের পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি করে বেজিং। যেমন শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। সীমান্তে আগ্রাসন বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর এই চীনা কৌশল ভারতকে এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাই মুখে যতই শক্তিশালী বিদেশনীতির আস্ফালন করি না কেন, আসলে বেজিংয়ের উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে দিল্লি ব্যর্থই হয়েছে। কংগ্রেস এই কারণেই বলেছে, চীন বুঝে গিয়েছে ভারত সরকার তাদের কিছুই বলবে না। দলের নেতা পবন খেরা বলেছেন, চীন এবং আমেরিকা— দু‌ ঩দেশকেই এত ভয় পাচ্ছেন কেন মোদি? দুই দেশের কাছে কেন ভারত সরকার আত্মসমর্পণ করেছে? ‘বিশ্বগুরু’ প্রধানমন্ত্রীর নীরবতার রহস্য কী?
রহস্য উদঘাটনের কোনো প্রয়াস সরকার করছে না। বরং প্রতিনিয়ত তাদের নিশ্চুপ অবস্থান অথবা লোকদেখানো বিবৃতি একটাই সন্দেহ জোরদার করছে। সেটা হল, ‘নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ’। বিরোধীরা সংসদে যখনই চীনা অনুপ্রবেশের বিষয়টি উত্থাপন করেন, তখনই স্পর্শকাতর বিষয় বলে এড়িয়ে যায় সরকারপক্ষ। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন করলেই রাষ্ট্রদ্রোহী অথবা ডিপ স্টেটের টাকা ঢুকেছে বলে সরব হয় একাংশ। আর তারপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয় বিজেপির আইটি সেল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে না, কেন চীনের আগ্রাসন নিয়ে সরকার চুপ? কেন দেশের মানুষকে প্রকৃত সত্য জানানো হচ্ছে না। অরুণাচলের স্থানীয় বানজারারা বারবার অভিযোগ করছেন, তাদের দীর্ঘদিনের জমিতে পশু চরাতে দিচ্ছে না চীনের সেনা। অথচ সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, সীমান্তে যখন এই তীব্র অস্থিরতা, তখন দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে কেন এমন নিস্তব্ধতা? অরুণাচল সীমান্তে একের পর এক ‘মডেল ভিলেজ’ তৈরি করছে চীন। এগুলি নামেই গ্রাম। আসলে সামরিক বাহিনীর আস্তানা। এসব জেনেও সরকার কেন তথ্য গোপন  করার চেষ্টা করছে? দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতির ভয়াবহ বাস্তবতাকে আড়াল করে সরকার আসলে কী অর্জন করতে চাইছে? এ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একটি গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান সংসদ জানতেই পারবে না দেশ সুরক্ষিত আছে কি না? অথচ জাতীয় ঐক্যের পূর্বশর্তই হল বিরোধীদের বিষয়গুলি সম্পর্কে অবহিত করা। অথচ এখন যেটি চলছে, তাকে বলে তথ্যের একপেশে নিয়ন্ত্রণ। এটি কোনোমতেই কাম্য হতে পারে না।
চীনের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নীরবতা কিংবা অস্বীকারের কৌশল কখনোই কার্যকর হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, দুর্বলতাকে আড়াল করার চেষ্টা আগ্রাসী শক্তিকে আরও সাহসী করে তোলে। সীমান্তে দ্রুত গতিতে পরিকাঠামো গড়ে তুলছে চীন। আর আমাদের প্রশাসন ব্যস্ত সীমান্ত সংঘাতের খবর যাতে শিরোনাম না হয়, তা নিশ্চিত করতে। জনগণ যাতে কিছু জানতে না পারে, তার জন্য তৎপরতা তুঙ্গে। ​সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষা করতে হলে কিন্তু ​জনসমক্ষে স্বচ্ছতা সবার আগে দরকার। বিরোধীদের নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক এবং সংসদে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে প্রকৃত বাস্তব তুলে ধরা উচিত। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিবৃতি ও স্লোগান দিলে চলবে না। আইটিবিপি ও ভারতীয় সেনার জন্য আধুনিক ড্রোন, উচ্চ-উচ্চতার সামরিক সরঞ্জাম ও নজরদারি পরিকাঠামো দ্রুত বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ আইটিবিপির ডিজি নিজেই বলেছেন, চীনের সঙ্গে লড়াই করতে হলে রণকৌশল ও অস্ত্রশস্ত্র ঢেলে সাজতে হবে। ড্রোন প্রযুক্তির সর্বাধুনিক মডেল ছাড়া এখন আর যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত ​অর্থনৈতিক দিক থেকে বাস্তববাদী হতে হবে। চীন থেকে আমদানির বিকল্প অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা জরুরি। চমক দেওয়া স্লোগান দিয়ে হাততালি কুড়ানো যায়, কিন্তু আখেরে কাজের কাজ কিছু হয় না। তাই স্লোগান সর্বস্ব না হয়ে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করাটা সবার আগে প্রয়োজন। ​
একটি কথা সরকারের মাথাদের মনে রাখা উচিত। যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের কাছেই বাস্তব সংকট স্বীকার করতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হওয়ার নাটক করুক, আন্তর্জাতিক ক্ষত্রে তার অবস্থান দুর্বল হতে বাধ্য।