গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধী কণ্ঠ
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিরোধী পক্ষ প্রয়োজন মতো তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য মূলত সরকার বা রাষ্ট্র। অতএব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাতে প্রবল আপত্তি থাকে শাসক শিবিরের। এই ছবি চেনা এবং বহুকালের। কিন্তু এমন আপত্তিকে সামনে রেখে প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত করার প্রবণতা গণতন্ত্র অনুমোদন করে না। দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মহাসমাবেশ ১ নভেম্বর। এই মেগা কর্মসূচি রুখতে বিজেপির অতিতৎপরতা সেই প্রসঙ্গই সামনে এনেছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের একাংশের চিঠি, দীপাবলির বাজারে ক্ষতির আশঙ্কা এবং ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী গণহত্যার বেদনাদায়ক স্মৃতিকে সমাবেশের বিরোধিতায় ব্যবহার করতে মরিয়া তারা। সব মিলিয়ে বিরাট রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উপস্থিত বিরোধীদের সভা করার অধিকার। ব্যবসায়ীদের ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তার নিরপেক্ষ হিসাব প্রয়োজন। কিন্তু রামলীলা ময়দানে একটি রাজনৈতিক সমাবেশের কারণে দীপাবলির বাজার বিপর্যস্ত হবে, এই দাবিটি অতিসরল বইকি। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী গণহত্যা ভারতের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কিন্তু তার দায় নির্ধারণ, অপরাধীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি/পরিবারকে ন্যায়বিচার প্রদান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেই মর্মান্তিক ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মসূচি বাতিলের যুক্তি হিসাবে খাড়া করা হলে গণহত্যার স্মৃতির প্রতি সুবিচার হয় না। ইতিহাসের দায় নির্ধারিত হবে ইতিহাসেরই বিচারে। অন্যদিকে আজকের রাজনৈতিক বিরোধিতার মোকাবিলার রাস্তা একটাই: গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।

Advertisement

বহুদিন বাদে দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরে গিয়ে বৈঠক করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পুলিশকর্তাদের সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। বিরোধীদের সমাবেশ ঘিরে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে এই বৈঠক। অবশ্য কোনো বড়ো সমাবেশের আগে আইনশৃঙ্খলা পর্যালোচনা প্রশাসনের স্বাভাবিক দায়িত্ব। তাই শুধু একটি বৈঠক দেখেই শাসকের আতঙ্ক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে আসা যায় না। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের আড়ালে কিছু অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রতিবাদের পরিসর সংকোচনের চেষ্টা সমীচীন নয়। ব্যাপারটি বিরোধীদের কর্মসূচি বানচালে রাষ্ট্রীয় মতলব বইকি। এই অপপ্রয়াসের প্রতিবাদ জরুরি। বিজেপি যদি মনে করে, ১ নভেম্বর দিনটি শিখসমাজের কাছে শোক ও বেদনার, তবে সেই অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আবেদন জানাতে পারে তারা। কিন্তু রাজনৈতিক সমাবেশের নির্ঘণ্ট নির্ধারণে নিষেধাজ্ঞা জারির নৈতিক বা গণতান্ত্রিক অধিকার কোনো দলের নেই। একইভাবে বিরোধী জোটেরও দায়িত্ব, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখা এবং শিখ-বিরোধী গণহত্যার স্মৃতির প্রতি যথাযথ সংবেদনশীলতা অক্ষুণ্ণ রাখা। শাসক ও বিরোধী—উভয়ের কাছেই দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে একটি উন্নত গণতন্ত্র। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার অধীশ্বর হিসাবে শাসকের দায়িত্ব অধিক। বিরোধীদের বক্তব্য, প্রতিবাদ এবং জনসমাবেশের অধিকার রক্ষা করা প্রশাসনের কর্তব্য, শাসক দলের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা নয়। দিল্লির রাস্তায় কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র কিংবা রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতিবাদকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে রাজনৈতিক বিরোধিতার স্বাভাবিক অংশ হিসাবেই দেখতে হবে।
গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা ভোটগ্রহণের দিনগুলিতে নয়, বরং শাসকের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের দিনটিতে। সংসদীয় ব্যবস্থায় নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অপরিহার্য অঙ্গ: সরকারকে প্রশ্ন করা, তার জনবিরোধী নীতিসমূহের বিরোধিতা করা, প্রতিবাদে পথে নেমে আসা এবং জনসমাবেশের মাধ্যমে মানুষের সমর্থন সংগঠিত করা। সেই অধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আসন্ন সমাবেশে কত মানুষ উপস্থিত হবেন, কী বক্তব্য গুরুত্ব পাবে কিংবা কতটা হবে তার রাজনৈতিক অভিঘাত—এসব নির্ধারণ করবে জনতার অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক বিতর্ক। আগাম নিষেধাজ্ঞা, বাজারের ক্ষতির আশঙ্কা কিংবা ইতিহাসের ক্ষতকে রাজনৈতিক ঢাল করে সেই বিচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হল সস্তা মাতব্বরি। আবার নিছক বিরোধিতা করার জন্যই শাসকের বিরোধিতা অর্থহীন—বিকল্প নীতি, জনস্বার্থের দাবি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধতা স্পষ্ট করাও বিরোধী জোটের তরফে জরুরি। শাহের বৈঠক কিংবা শাসক দলের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে, একইস঩ঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান এবং রক্ষা করাও জরুরি। রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ারও নয় পুলিশ। গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার মধ্যে নয়, বরং সুযুক্তি ও উপযুক্ত জবাবসহ সেই বজ্রকণ্ঠের মুখোমুখি দাঁড়ানোরই মধ্যে।