চোরবাগানের তদন্ত যেন মাথা পর্যন্ত পৌঁছায়
  • ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: সামান্য ঘোষক, চুনোপুঁটি কর্মকর্তা কিংবা পাড়ার বেচারা ভলান্টিয়ার ধরেই যেন চোরবাগান কাণ্ডের তদন্ত শেষ না হয়। গত ৪৯ বছরের বয়ে বেড়ানো বাম-তৃণমূল ট্র্যাডিশন বদলের শপথ নিয়েই নবান্ন দখল করেছে বিজেপি। শিল্পে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় বদলের অঙ্গীকারে আশ্বস্ত হয়েই অনেক আশা নিয়ে মানুষ মাত্র পাঁচমাস আগে ঢালাও পালাবদলের পক্ষে রায় দিয়েছে। শাসকই শুধু বদলায়নি, ডবল ইঞ্জিন সরকারের প্রতিষ্ঠায় বাংলার রং, ঢং সব পরিবর্তন হয়েছে শিকড় থেকে। দাবি এমনটাই। এবারই ছিল বিজেপি শাসিত বঙ্গের প্রথম সনাতনী পুজো। কিন্তু শুরুতেই ছন্দপতন। যাঁরা আজ সরকারে আসীন তাঁদের প্রমাণ করতে হবে এই প্রশাসন কাউকে আড়াল না করে নির্মমভাবে বিচারের বাণীকে দল মত বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর। মুখ্যমন্ত্রী কলকাতা পুলিশ থেকে শুরু করে পুরসভার কাউকে চোরবাগান কাণ্ডের তদন্তকারী সিটে রাখেননি। নিঃসন্দেহে নিরপেক্ষ থাকার সাধু প্রচেষ্টা। কিন্তু তা যেন শুধু কথার কথা হয়েই থেকে না যায়। শেষ পর্যন্ত গাফিলতি কার, তা যেন মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়। বিচার রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হলে মানুষ কিন্তু ক্ষমা করবে না, আস্থাও রাখবে না বেশিদিন। মানুষের বিশ্বাস অটুট রাখাই হবে মুখ্যমন্ত্রী ও শাসক দলের অগ্নিপরীক্ষা! ‘হিউম্যান এরর’ তো যেকোনো দুর্ঘটনারই অনিবার্য উপসংহার। তদন্ত শেষের আগেই এরকম ইঙ্গিত কি গোটা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার পক্ষে যথেষ্ট নয়! এখানেই বিগত জমানার ইতিউতি উঁকি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

Advertisement

দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে, আজ কোজাগরী লক্ষ্মীর আরাধনা। পদপিষ্ট হয়ে অপ্রশস্ত চোরবাগানের এগজিট গেটের কাছে ১৯টি তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছে মহাসপ্তমীর পয়লা সন্ধ্যায়। সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত এখনও দগদগে। বাঙালির মন থেকে সহজে এই ঘা শুকোবার নয়। যেমন অভয়ার মা-বাবা তাঁদের ডাক্তার কন্যাকে ভুলতে পারবেন না কোনোদিন, তেমনি পুজোর প্যান্ডেলে স্বজন হারানো পরিবারগুলিকেও এক বুক দুঃখ নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে ছলছল চোখে। ১৭ অক্টোবরের  ঠাকুর দেখতে যাওয়ার ভয়াল স্মৃতি অহর্নিশি তাড়া করবে আগরপাড়ার প্রাঞ্জল সরকার থেকে বরানগরের দীপালি ঘোষ কিংবা নিউ টাউনের মৃত দুই ছাত্রী তানিয়া বিশ্বাস ও বর্ণালি হালদারের পরিবারের সদস্যদের। এই অপূরণীয় স্বজন বিয়োগের ক্ষতির কোনো ভাগ হয় না, এক্ষেত্রে আর্থিক সাহায্য বলুন কিংবা সান্ত্বনা অর্থহীন। 
হঠাৎ বৃষ্টি এবং তার সঙ্গে প্যান্ডেল ভেঙে পড়ছে বলে পুজো কমিটির পক্ষ থেকে ‘রহস্যজনক’ ঘোষণার পরই হুড়োহুড়ি। একথা স্বীকার করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। দুই ঘোষককে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু ওই দুই ঘোষক নিজে থেকেই 
এমন বললেন, নাকি অন্য কারও নির্দেশে—এই উত্তর কিন্তু মেলেনি এখনও। ওই সময় পুজো কমিটির হোমরাচোমরারা কে কোথায় ছিলেন তাও অজানা। যেটুকু জানা গিয়েছে, সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যায় জলে ভিজে নতুন জামাকাপড়ে একদল মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে প্যান্ডেলমুখী। অপর আর একদল মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে আসতে নারাজ। এই টানাপোড়েনেই মুহূর্তে আনন্দ করতে আসা মানুষগুলি লাশ হয়ে গেল। আলো-আঁধারি পরিবেশ এবং স্লোপিং সিঁড়ি, আর মানুষের স্রোত সামলাতে না পেরে একদল পড়ে গেল মাটিতে। তার উপর দিয়েই মাড়িয়ে গেল আর এক দল। মুহূর্তে চোরবাগান প্যান্ডেলের এগজিট গেট যেন বধ্যভূমি। বিপদ জানিয়ে আসে না। ছোট্ট জায়গা, আগে থেকেই অন্তত ৪০টি এসির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল নকশায়। অথচ লাগানো হয়েছিল মাত্র ২৪টি। শুরু থেকেই প্রবল ভিড়ে দমবন্ধ করা অবস্থা। এই পুরো গাফিলতি তো শুধুমাত্র ওই দুই ঘোষকের হতে পারে না। নকশার ত্রুটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে পুলিশ ও উদ্যোক্তাদের উদাসীনতা। গতবার যেখানে তিনটি এগজিট গেট ছিল, কার অঙ্গুলিহেলনে এবার তা কমে মাত্র একটি হয়ে গেল তার উত্তর নেই। এখনও পর্যন্ত ধৃতদের কাছে সেই উত্তর আশা করাও বৃথা। ওই সিদ্ধান্তের মালিক তো ঘোষকেরা হতে পারেন না। যাঁরা মঞ্চ আলো করে ছিলেন, তাঁরা গেলেন কোথায়? এই সবেরই মিলিত 
যোগফল বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সবচেয়ে কালো দিনের উদ্রেক। যমে মানুষে টানাটানিরও বিশেষ সময় মেলেনি। এখন শুধু স্বজন হারানোর হাহাকার। মাধবডিহির আগমনি হারিয়েছে মা ও ভাইকে! বয়স তার অল্প। বাকিটা জীবন পড়ে রয়েছে। বাড়িতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তার পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাবতীয় সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কি ব্যক্তিগত জীবনের এই শূন্যতা দূর হওয়ার? 
ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখলে গোটা ঘটনাকে মর্মান্তিক বললেও কম বলা হয়। বিগ বাজেটের পুজোকর্তারা একটু সতর্ক হলেই এতবড়ো দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। এই পুজোর সঙ্গে স্থানীয় বিধায়ক, শাসক দলের জেলা সভাপতি এবং একঝাঁক নেতা-উপনেতার সক্রিয় যোগ। সেই সুবাদেই চোরবাগানের কমিটি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন আগের জমানার সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবীপক্ষ পড়ার আগে থেকেই তিনি ছিলেন পুরীতে। জয়ন্তবাবুর বক্তব্য একটাই, যতবার চোরবাগানের ঠাকুরের মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ততবারই অভিশপ্ত কিছু না কিছু ঘটেছে। কাকতালীয় হলেও এটাই নাকি বাস্তব। জয়ন্তবাবুর কথা সাদা মনে মেনে না নিলেও সন্দেহ ও সংশয়ের কিন্তু শেষ নেই। সেখানেই নানা সম্ভাবনা ও প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। যদি দুই ঘোষক প্যান্ডেল ভেঙে পড়ার কথা না বলে বিপদ বুঝে ভিভিআইপি গেটটিকে সাধারণের জন্য খুলে দিতেন। যদি তালাচাবি দেওয়া 
ইমার্জেন্সি ফটকের দ্বার মুক্ত করে দেওয়া হত। স্পনসরদের কথা ভেবে কিংবা চাপে যাবতীয় ভিড়ের ঢেউকে ওই একটি মাত্র এগজিট গেটের দিকে চালিত করা নাহলে ক্ষয়ক্ষতি নিঃসন্দেহে কম হত। এই গোটা অব্যবস্থার দায় এখন দুই ঘোষকের ঘাড়ে চাপিয়ে কারা পরিত্রাণ পেতে চাইছেন? পঞ্চমীর দিন থেকে চিড়েচ্যাপ্টা ভিড় হচ্ছে দেখেও কেন বিকল্প ব্যবস্থা করা হল না প্রশাসনের পক্ষ থেকে? সেদিনই কিন্তু একাধিক দর্শনার্থী সতর্ক করেছিলেন। কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর থেকে অকুস্থলের দূরত্ব কি খুব বেশি, যে টনক নড়ল এতগুলি প্রাণহানির পর! পুজোর উদ্বোধনমঞ্চে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং এবং শাসক দলের স্থানীয় তাবড় নেতানেত্রীরা। তবু পুলিশ দেরিতে সক্রিয় হল কেন? পঞ্চমীর দিনের ঠেলাঠেলির অভিজ্ঞতা থেকে না পুলিশ, না পুজোকমিটি, না পুরসভা—কেউই ঘুরে দাঁড়ায়নি। টনক যখন নড়ল তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। প্রলাপ ছাড়া আর কিছু করার নেই কারও।
এধরনের ঘটনা ঘটলেই একদল রাজনীতি লাগানোর চেষ্টা করে আর অপর দল, মানে শাসক ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করে প্রাণপণ। এর কারণ একটাই, যতই আমরা গণতন্ত্র, সংবিধানের বড়াই করি না কেন বড়ো ছোটো প্রতিটি ঘটনা—সে বাম জমানার বউবাজার বিস্ফোরণ, আর জি কর হোক কিংবা চোরবাগান, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা রাজনীতি এবং তার নায়ক, খলনায়কদের হাতে কেমন বন্দি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে! রাজা আসে রাজা যায় কিন্তু পরিস্থিতির কি খুব বদল হয়? একটি পুজো কমিটি ছিল। প্রথমবার খুঁটি পুজোও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পালাবদলের দম্ভ জানান দিতে কেউ কসুর করে না। সেই দখলের প্রবৃত্তি থেকেই কমিটি বদল এবং দ্বিতীয়বার খুঁটি পুজোর উল্লাস! এটাই ক্ষমতার নেশা। কোনো দল, কোনো সংগঠন, কোনো ব্যক্তি এই আশ্চর্য বদলে যাওয়া ঝোঁকের বাইরে নন। 
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সকাল সন্ধ্যা ছুটে বেড়াচ্ছেন জেলা থেকে শহর। অত্যন্ত সৎ তাঁর 
চেষ্টা। কামনা করি, তিনি সফল হবেন। স্বজন 
হারানো প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ক্ষতিপূরণের চেক ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ও ছাড়া আর কীই-বা দেওয়ার আছে তাঁর। তবু দৃপ্ত কণ্ঠে বলছেন, পরের বার অনেক আগে থেকেই পুলিশ ও প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। সে তো আগামীবারের কথা। তাতে তো আর মৃত উনিশ জনের কেউ বেঁচে উঠবেন না। মুখ্যমন্ত্রীর তৈরি করে দেওয়া সিটের মাথায় রয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। বৃহস্পতিবার তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কলকাতা পুলিশের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে। তিনি জানিয়েছেন, সবদিক খতিয়ে দেখা হবে। মূল দোষী পুলিশ হোক বা অন্য কেউ—যাঁরই গাফিলতির জন্য এই ঘটনা ঘটে থাকুক না কেন, তাঁকে খুঁজে বের করাই এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য।
রাজ্য সরকার সিট গঠন করলেও অতীতে বহু ক্ষেত্রে তদন্ত ঝুলে থাকায় সংশয় থেকেই যায়। নিন্দুকে বলে সিটই হোক কিংবা তদন্ত কমিটি, সময় নষ্ট করা এবং মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোই যেকোনো তদন্তের মূল কথা। সেই জন্যই জনমানসেও সংশয় এত। আপাতত রাজ্য সরকার তদন্তের জন্য তিনমাসের একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। নিশ্চিতভাবে শুধু লোক দেখানোর জন্য সরকার এটা করেনি। মুখ্যমন্ত্রী প্রথম থেকেই এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক বলেই মনে হয়। প্রভাবশালী দেখে দেখে যেন তদন্ত গোত্তা না খায়। যে অতিসক্রিয়তায় বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙা হয়েছে সেই একই তৎপরতায় আসল দোষীকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। নতুন সরকারের কাছে দাবি এইটুকুই। তদন্ত যেন ঘোষক কিংবা ভলান্টিয়ারে সীমাবদ্ধ না থাকে। মাথারা ধরা না পড়লে বিচার কিন্তু অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। প্রশাসনিক বদল যে এসেছে তা প্রমাণ করার দায় মুখ্যমন্ত্রীর।