তন্ময় মল্লিক: বই মানে সরস্বতী। পড়াশোনা শেষে মা সরস্বতীকে প্রণাম করে ওঠার শিক্ষা শৈশবের। উদ্দেশ্য, বিদ্যার দেবীর আর্শীবাদ প্রার্থনা করা। আর কোনোভাবে বইয়ে পা লাগলে তো কথাই নেই। মা সরস্বতীকে ভক্তিভরে প্রণাম করে ক্ষমা চেয়ে নিই। ছোটোবেলায় বাবা, মায়ের দেওয়া শিক্ষা বয়সকালেও মানুষ ভোলে না। তাই বইয়ে পা লাগলে নিজের অজান্তেই হাত উঠে যায় কপালে। সেই বই যাঁরা ছিঁড়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে ক্ষমতা জাহির করেন, তাঁরা আর যাই হোক না কেন সনাতনী শিক্ষার ধারক ও বাহক নন। বইয়ের উপর আক্রমণ মানে সাক্ষাৎ মা সরস্বতীকে আঘাত। সেটা কি কোনো প্রকৃত সনাতনীর পক্ষে করা সম্ভব?
কলকাতার চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনায় ১৯জনের মৃত্যুতে এবার দুর্গাপুজোর আনন্দ ম্লান হয়েছে। পুজোর সময় এমন ভয়াবহ ঘটনা শুধু নজিরবিহীন নয়, হৃদয়বিদারকও। অনেকেই চেয়েছিলেন, এরপর আর যেন নতুন করে কোনো অঘটন না ঘটে। পুজোয় শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রশাসন এবং শাসক দল সতর্ক থাকবে। কিন্তু, সেই আশাকে মিথ্যে প্রমাণ করে কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ সিপিএমের বুক স্টলগুলিতে নির্বিচারে তাণ্ডব চালাল। স্টলের চেয়ার টেবিল ভাঙচুরের পাশাপাশি বই ছিঁড়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে ক্ষমতার আস্ফালন দেখাল।
বামপন্থীদের কাছে ধর্ম হল আফিমের মতো। তারা পুজোয় বিশ্বাসী নয়। কিন্তু, পুজোয় বুক স্টল দেয়। বামেরা ধর্মে বিশ্বাস না করলেও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে জনসংযোগের কাজে ব্যবহার করে। তারজন্য সিপিএমকে প্রচুর সমালোচনা শুনতে হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে শূন্যে নেমে গেলেও পুজোয় বুকস্টল দেওয়া বন্ধ হয়নি। এর আগে কখনো রাজ্যজুড়ে বুকস্টলে হামলা হয়নি। তবে সেই সময় বহু জায়গায় সিপিএমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসও জাগো বাংলার স্টল করত। কিন্তু, রাজ্যে কাঙ্ক্ষিত পালা বদলের পর বামেদের বইয়ের স্টল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। ফলে এতদিন যাঁরা বিজেপি এবং তৃণমূলকে একই মুদ্রার দু’টি পিঠ বলতেন, তাঁরা নিশ্চয়ই তফাৎটা বুঝতে পারছেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিক্ষক দিবসে ছাত্র সমাজে মোবাইলের ভয়ঙ্কর কুপ্রভাবের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। রাত জেগে মোবাইল ঘাঁটায় ছাত্রসমাজের সময়, শরীর, ভবিষ্যৎ সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তিনি ১২ ক্লাস পর্যন্ত মোবাইল না দেওয়ার পক্ষে জোরদার সওয়াল করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল আসক্তি কমাতে বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অথচ অভিযোগ উঠল যে, তাঁরই দলের কিছু উচ্ছৃঙ্খল কর্মী বামেদের বুকস্টলে হামলা চালিয়ে বই ছিঁড়ে দিল। বুকস্টলে কেবল মার্কস, লেনিন বা সমাজতন্ত্রের বই ছিল না, ছিল স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর মহাশয় সহ বিভিন্ন লেখকের বই। ফলে যাঁরা সিপিএমকে চাপে রাখার জন্য বুকস্টলে হামলা চালালেন তাঁরা কি ভারতের প্রণম্য মনীষী ও সাহিত্যিকদের অপমান করলেন না?
যাঁরা দিকে দিকে বামেদের বুকস্টলে হামলার কর্মসূচি পালন করলেন, তাঁরা কারা? যাঁরা ‘বুকিস্টল’ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন তাঁরা বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দের গুরুত্ব কি বোঝেন? বামেদের দাবি, হামলা করেছে বিজেপি। রাজ্যের সাধারণ মানুষও বলছে, বিজেপির উস্কানিতেই বুকস্টলে ভাঙচুর হয়েছে। কিন্তু, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, বামেদের বুকস্টলে ভাঙচুরের সঙ্গে বিজেপির দূর দূর তক কোনো সম্পর্ক নেই। যাঁরা আগে থেকে বিজেপি করছেন, যাঁরা প্রকৃত বিজেপি তাঁরা এই কাজ করতে পারেন না। কিছু মানুষ তৎকাল বিজেপি সেজেছে। তারা এই কাজ করতে পারে।’
‘ডিম থেরাপি’ শুরুর সময় শমীকবাবু কিছুটা অভিভাবক সুলভ আচরণ করেছিলেন। দলীয় কর্মীদের সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু, কাজ হয়নি। শমীকবাবু উপলব্ধি করেছেন, কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই। তাই সব দায় ‘তৎকাল বিজেপি’র উপর চাপিয়ে দেন। তাঁর একটাই কথা, ‘ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনো সম্পর্ক নেই।’ কোনো বিতর্কিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শমীকবাবু মন্তব্য করলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্যা বয়ে যাচ্ছে কটাক্ষের। কেউ বলছেন, ‘ফের কাটা রেকর্ড চালালেন শমীক ভট্টাচার্য।’ কেউ লিখেছেন, ‘ছিলেন বিবেক। হয়ে গেলেন কমেডিয়ান।’
বামেদের বুকস্টলে হামলার দায় শমীকবাবু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত সেই রাস্তায় হাঁটেননি। ‘এই হামলা করা আমাদের ঠিক হয়নি’, এই জাতীয় মন্তব্য করেননি ঠিকই, কিন্তু জানিয়ে দিয়েছেন, বামেদের বুকস্টলে হামলা মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘটনায় তিনি লজ্জিত। স্বপনবাবুর চেয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে আরএসএস নেতা জিষ্ণু বসুর কথায়। তিনি বলেছেন, ‘ক্ষমতার দম্ভে এসব করছে।’
আপাত দৃষ্টিতে বিজেপি এবং আরএসএসের প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী ও কার্যকর্তাদের মন্তব্য শুনে মনে হতেই পারে, বামেদের বুকস্টলে ভাঙচুর নিয়ে বিজেপিতে দ্বন্দ্ব আছে। বিজেপির একাংশ এই হামলাকে সমর্থন করছে না। কিন্তু, বিষয়টা কি সত্যিই এত সরল? বিজেপি একটা রেজিমেনটেড পার্টি। এই দলে হটকারী কিছু করা যায় না। সবটাই পরিকল্পিত। একপক্ষ যখন হামলায় উস্কানি দেবে, অন্যপক্ষ তখন তার সমালোচনা করবে। তাতে লাভ? যিনি হামলা বা ডিম থেরাপিতে মদত দেবেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সমালোচিত হবেন। দলের ঘাড়ে দোষ চাপবে না। সেই কারণে বিজেপির একপক্ষ যখন মুসলিমদের সমালোচনা করে, অন্যপক্ষ তখন নরম মনোভাব দেখায়। এটাই বিজেপির গেমপ্ল্যান।
অমিত শাহ বহুবার বলেছেন, তৃণমূলের চেয়ে বামেদের শাসন ভালো ছিল। এখন সেই বামেরা চক্ষুশূল হয়ে গেল কেন? কেউ কেউ মনে করছেন, সিপিএমের শক্তি বাড়ছে বলেই বিজেপি আক্রমণ করছে। কিন্তু, সত্যিই কি বামেরা শক্তিশালী হচ্ছে? বিধানসভায় সিপিএমের মাত্র একজন বিধায়ক। সদ্য হওয়া দু’টি উপনির্বাচনে বামেরা দাগ কাটতে পারেনি। এই ছ’মাসে তাদের শক্তি এতটা বেড়ে যায়নি যে বিজেপিকে আতঙ্কিত হতে হবে। তাহলে বিজেপি কেন বামেদের বুকস্টলে হামলা চালাতে গেল?
একথা ঠিক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিজেপির প্রতি সিপিএম নরম মনোভাব নিয়েছিল। সেই মুহূর্তে সিপিএমের কাছে মমতাই ছিলেন পয়লা নম্বর ‘রাজনৈতিক শত্রু’। ‘আগে রাম পরে বাম’ হুইস্পারিং ক্যাম্পেনের জেরে ধস নেমেছিল বামেদের ভোটব্যাংকে। ফুলেফেঁপে উঠেছিল বিজেপি। তাই অমিত শাহ থেকে বিজেপির অনেক নেতা তৃণমূলকে হারাতে বামেদের সমর্থন চেয়েছিল। বহু জায়গায় বিজেপি সফলও হয়েছে। কিন্তু, মতাদর্শগতভাবে বিজেপির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে সিপিএমের অবস্থান। মার্কসীয় দর্শন বস্তুকেন্দ্রিক এবং যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে বিজেপি ভাববাদ ও আধ্যাত্মিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। মমতাকে সরানোর জন্য উভয় দলের মধ্যে সাময়িক ‘বন্ধুত্ব’ হতে পারে। কিন্তু, দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই তৃণমূলকে দু’টুকরো করে দেওয়ার পর সিপিএমকে টার্গেট করেছে বিজেপি।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, বিধানসভায় ফ্লোর টেস্ট হলে ২৭৫টি ভোট পক্ষে পড়বে। এর অর্থ, তৃণমূলের টিকিটে জয়ী অধিকাংশ বিধায়কই বিজেপিকে সমর্থন করবেন। অনেকেই বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী খুব একটা অন্যায্য দাবি করেননি। তৃণমূলের অধিকাংশ নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক চাপে পড়ে বিজেপির কাছে নতিস্বীকার করেছেন। কারণ ক্ষমতায় থাকার সময় তাঁরা এমন কিছু কাজ করেছেন, যার জন্য প্রশাসন চাইলেই তাঁদের জেলে ভরতে পারে। কিন্তু, সিপিএমের ক্ষেত্রে সেই কৌশল কাজে লাগবে না। তাই ‘অ্যালোপ্যাথি’ ওষুধ প্রয়োগ করছে।
অ্যালোপ্যাথি ওষুধে দ্রুত কাজ হয়। কিন্তু, তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও থাকে। বিরোধীদের দমন করার জন্য বিজেপি যে ওষুধ প্রয়োগ করছে তাতে আপাতদৃষ্টিতে হয়তো লাভ হচ্ছে। কিন্তু, সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। পুজোর আগেই বামেদের বুকস্টলের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বিজেপি। তাতে বুকস্টলের সংখ্যা তো কমেইনি। কোথাও কোথাও বেড়েছে। হামলা সত্ত্বেও বই বিক্রি বন্ধ হয়নি। কোথাও ভাঙা স্টলে, কোথাও টোটোয় বই বিক্রি হয়েছে। যাঁরা বই কিনেছেন তাঁরা সবাই মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী, এমনটা নয়। তবুও কিনেছেন। হামলার বিরুদ্ধে এ এক নীরব প্রতিবাদ। জোর করে কোনো কিছুকে দমিয়ে দেওয়ার ‘সাইড এফেক্ট’। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয় ভিতরে। বাইরে থেকে তা বোঝা যায় না। আর যখন বোঝা যায় তখন কিছুই করার থাকে না।


