হিমাংশু সিংহ: পরীক্ষাটা নরেন্দ্র মোদির না রাহুল গান্ধীর? একজনের রাজ্যপাট হারানোর, অন্যজনের কুরসি দখলের! কিন্তু এবারও না হলে?
উৎসবের মধ্যেও ককরোচ আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি। বিরোধীদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু জ্ঞানেশ কুমার হলেও দেশবাসীর প্রশ্ন ঘুরেফিরে একটাই, নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা না রাহুল গান্ধীর! জোয়ার-ভাটার মতোই রাষ্ট্রনেতাদের উত্থান পতনও একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। মোদিজির বয়স এখন ৭৬। টানা ১৩ বছর প্রধানমন্ত্রী। ১২ বছর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী, মোট ২৫ বছরের ঈর্ষণীয় সাফল্যের উড়ান। চলতি মাসের শুরুতেই যা ঘটা করে পালিত হয়েছে দেশজুড়ে। যে রেকর্ডে মোদির সঙ্গে টক্কর দিতে পারেন শুধু রাহুলের দাদু জওহরলাল নেহরু। রাহুল গান্ধীর বয়স ৫৬ বছর ৪ মাস। তার চেয়েও বড়ো কথা, তিনি সোনিয়া-রাজীবের পুত্র। বিগত প্রায় আট দশকের রাজনৈতিক ওঠাপড়ায় দেশের সবচেয়ে এলিট পরিবারের এলিজিবল ব্যাচেলর উত্তরাধিকারী। বাবা রাজীব গান্ধী দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে। ঠাকুমা ইন্দিরা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন ৪৯ বছরে। আর দাদু জওহরলাল স্বাধীনতার পর দেশের শীর্ষ আসনে বসেন ৫৮ বছর বয়সে। নেহরুজিই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও বটে। এমন সম্ভ্রান্ত পরিবারিক ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে রুপোর চামচ মুখে জন্মালেও গত প্রায় দেড় দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় আশা জাগিয়েও একাধিক ভোটযুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছেন সোনিয়া-পুত্র। তীরে এসে সাফল্য হাত ফসকে গিয়েছে বারবার। কংগ্রেস কোণঠাসা হয়েছে একের পর এক রাজ্যে। বলার মতো কিছুই নেই রেকর্ড বুকে। প্রতিবার ভোটের ফল বেরলে বিজেপি কটাক্ষ করে বলেছে, গান্ধী পরিবারের সাড়া জাগানো চকমকি রকেটটা আরও একবার গোত্তা খেল রাজনীতির মরা গাঙে। ২০১৮ সালে একযোগে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড় জয়ের পর মনে হয়েছিল কংগ্রেসের কুরসি দখল বুঝি মুঠঠি মে, কিন্তু তা হয়নি। চোদ্দো, উনিশ, চব্বিশ সালে পরপর কংগ্রেস ও তার জোটসঙ্গীরা পর্যুদস্ত। সামনে ঊনত্রিশের লড়াই। তাও প্রায় আড়াই বছর দূরে। এই প্রেক্ষিতে জেন জি’র অসন্তোষ এবং ককরোচদের নাটকীয় অগ্রগতি ভোট রাজনীতির দৌড়ে আপাত ছত্রভঙ্গ বিরোধী শিবিরকে অক্সিজেন দিয়েছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে। এ কম বড়ো পাওনা নয়!
নাগরিকদের বড়ো অংশের মধ্যে নেতার হুঁশিয়ারি আর পুলিশের লাঠিতে ভয় কেটে গিয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, রিলস, ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে মুখ গুঁজে থাকা তরুণ সমাজ আজ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক। এই প্রজন্ম ফাঁপা ভাষণে ভোলে না, গুগল ঘুরিয়ে হিসাব মেলাতে শুরু করে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বসে সকাল সন্ধে। দেখে নেয় সরকারের আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নিজেদের স্বপ্নপূরণের হিসাব মেলাতে পারছে কি না? অধিকার রক্ষা হচ্ছে কি না! চাওয়া-পাওয়ার জরিপ শেষ হলে এরাই এমন অপ্রিয় প্রশ্ন উত্থাপন করে, যা ধুরন্ধর শাসকের পক্ষেও হজম করা কঠিন। এদের আরশোলা, খরগোশ যে নামেই ডাকুন এরা দাদাগিরি দেখলেই সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বেপরোয়া। এখানেই প্রশ্ন, সিজেপি কি রাজনৈতিক দল হিসাবে নাম নথিভুক্ত করতে যাচ্ছে? প্রশ্ন শুনে আজকের তরুণ তুর্কি অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, ‘না, এরকম কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই।’ তাহলে কী হবে? ‘অপারেশন সাকসেসফুল বাট পেশেন্ট ইজ ডেড’ হলে তার দায় বর্তাবে কার উপর? বিদ্রোহ, আন্দোলন তো আর খামখেয়ালি বিষয় নয়। এটা নেপাল বা বাংলাদেশও নয়! তাহলে? ককরোচরা একাই বাঘ হতে পারবে কি?
ঠিক এখানেই রাহুল গান্ধীর পরীক্ষা। ককরোচদের শুরু করা বিক্ষোভ আন্দোলনকে রাজনৈতিক দিশা দিয়ে কংগ্রেসের পালে হাওয়া টেনে আনা খুব সহজ নয়। নিঃসন্দেহে কঠিন চ্যালেঞ্জ। যদি রাহুল সফল হোন তাহলে রাজীব গান্ধীর পর নেহরু-গান্ধী পরিবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খরা কেটে আবার কংগ্রেসের পালে আকাশভরা পূর্ণিমার চাঁদ হাসবে। আর ব্যর্থ হলে? বিজেপির বাক্যবাণ ধেয়ে আসবে, আর কতবার লঞ্চ হবে পাপ্পু মহারাজের!
এবার আন্দোলনের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে নির্বাচন কমিশন, জ্ঞানেশ কুমার এবং আড়াল থেকে মোদি সরকারের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ। বিরোধীদের বক্তব্য হচ্ছে, বিতর্কিত এসআইআর অমিত শাহ এবং শাসক বিজেপিরই গেমপ্ল্যান। জ্ঞানেশ কুমার বাধ্য ছাত্রের মতো যা কার্যকর করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সিংহভাগ কৃতিত্ব তরুণ ও যুব সমাজের। ওরা শেষ দেখার পণ করে পথে নামলে সরকার ও শাসক দলের জন্য কঠিন সংকট উপস্থিত হয় আজও। বিজেপি ২২ রাজ্যে ক্ষমতায়। দক্ষিণ বাদে উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম ভারতের বেশিরভাগই প্রায় দখলে। মাত্র সাড়ে পাঁচমাস আগের ঐতিহাসিক বঙ্গ বিজয় সংঘ পরিবারের বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নপূরণ। তবু আচমকাই উড়ে এসে জুড়ে বসা আরশোলাদের বিক্ষোভে সরকারটাই কম্পমান। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আচমকাই ক্ষমতার অলিন্দে উলটো হাওয়ার দাপট। ফল কী হবে জানি না। ভোটের যন্ত্রে প্রভাব কতটা তাও ভবিষ্যতের গর্ভে। তবে একটা বিপরীত ঢেউ কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে জাতীয় রাজনীতিতে। যে দমকা হাওয়ার শুরু ককরোচদের ধাক্কায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বাধ্য হয়ে ইস্তফার মধ্যে দিয়ে, তাই যেন আরও একটু জোরে বইছে। পথ না-হারালে তা যে আগামীতে দুরন্ত ঘূর্ণিতে পরিণত হবে না, কে বলতে পারে!
বাঘেরা একবার রক্তের স্বাদ পেলে আর থামে না। বহু পুরানো প্রবাদ। জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না-দেওয়া পর্যন্ত যদি এই আন্দোলন চলে তাহলে নৈতিকভাবে সরকারের ঘোরতর পরাজয় হবে। এই সংকট কীভাবে স্বঘোষিত বিশ্বগুরু সামাল দেন, সেটাই আগামী নির্বাচনে শাসকের অগ্নিপরীক্ষা।
জ্ঞানেশ কুমার কিন্তু কোনো লোকসভা ভোট পরিচালনা করেননি। ইস্তফা না দিলেও ঊনত্রিশের ভোটের চারমাস আগেই তাঁর মেয়াদও শেষ হওয়ার কথা। চব্বিশ সালের লোকসভা নির্বাচন করিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার। উনিশ সালের ভোট করিয়েছিলেন সুনীল অরোরা। আর যে
ভোটে মোদিজির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়া, সেই ২০১৪ সালের নির্বাচনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন ভি এস সম্পত। আন্দোলনের ধাক্কায় অপসারিত না হলেও আগামী ঊনত্রিশ সালের সাধারণ
নির্বাচনে জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার থাকার কথা নয়। তাঁর মেয়াদ শেষ হবে ২৬ জানুয়ারি ২০২৯। তবু নির্বাচন কমিশনের ৭৬ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব তিনিই। টি এন সেশন কিংবা কংগ্রেসের সৌজন্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়া এম এস গিলকে ইতিমধ্যেই ছাপিয়ে গিয়েছেন অগৌরবের খতিয়ানে।
শাসক ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীদের দমন করতে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের পথে হেঁটেছিলেন। সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারও কেড়ে নেন। সংবাদমাধ্যমেরও স্বাধীনতাও উধাও হয়ে যায়। মোদি সরকার তেমন কোনো লিখিত নির্দেশিকা জারি করেনি। দিল্লি পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সাধারণ ধারা প্রয়োগ করেই বিক্ষোভকারীদের যন্তরমন্তর অভিযান ভেস্তে দিতে মরিয়া। কিন্তু আন্দোলন মোকাবিলা করতে গিয়ে যেভাবে মেট্রো-রেল সহ গণপরিবহণ স্তব্ধ করা হয় তা জরুরি অবস্থার থেকে কম কীসে। বলতে দ্বিধা নেই, অকস্মাৎ যেন সরকারের ‘ক্যাচ টোয়েন্টি টু’ সিচুয়েশন। ভীমরবে হাজার হাজার ককরোচ হাজির। পাশে দোসর কংগ্রেস সহ বিরোধীরা—যারা একে অপরের মুখ দেখত না, বিশ্বাস করত না, তারাই দূরত্ব ঘুচিয়ে হাত মেলাচ্ছেন অকাতরে! মহা উৎসাহে ক্ষমতা দখলের আনন্দ নাড়ু পাকানো শুরু!
ভারতের নির্বাচন কমিশন কখনওই ১০০ শতাংশ নিরপেক্ষ নয়। তবে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়তে শুরু করে ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের সময় থেকে। ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্বাচনি বিধিভঙ্গের প্রশ্নে কমিশনের তৎকালীন প্রধান সুনীল অরোরার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সেই সময়ের অন্যতম কমিশনার অশোক লাভাসা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে মত দিলেও তা গৃহীত হয়নি। নির্বাচন মিটে গেলে লাভাসার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। তিনি কমিশনারের পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশনার অরুণ গোয়েল কেন আচমকা পদত্যাগ করেছিলেন, তা আজও গভীর রহস্য। দেশের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ঘিরে এত অস্বচ্ছতা ভোট ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বারবার। সুনীল অরোরাকে ইমপিচ করার প্রস্তাব পেশ করার কথা বিরোধী শিবির থেকে বলা হলেও নেতারা বিশেষ উৎসাহ দেখাননি। এক্ষেত্রেও অনিয়ম কিছু হয়ে থাকলে তার দায় ষোলো আনাই জ্ঞানেশ কুমারের কি না, প্রশ্ন সেখানেই। জ্ঞানেশের পিছনে কার হাত?
পার্থক্যটা হচ্ছে গত ১২ বছরের শাসনে এই প্রথমবার কেন যেন মনে কু ডাকছে। বিজেপি কর্মকর্তাদের মুখের হাসিও মুহূর্তে উধাও। একটা অজানা আশঙ্কা হাড়ে মজ্জায়। জেন জি আন্দোলনের ধাক্কায় মোদি সরকার ও শাসক দলটাকে বড্ড দিশাহারা দেখাচ্ছে। একঝাঁক মুখপাত্র, সিনিয়র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সর্বভারতীয় সভাপতিকে দিয়েও ড্যামেজ কন্ট্রোল না-হওয়ায় মরিয়া হয়ে নামতে হচ্ছে এই সরকারের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অমিত শাহকে। তবু আন্দোলন, বিক্ষোভ কিছুতেই থামার নয়। কিছুটা বেপরোয়া হয়েই বিরোধীরা যেমন এককাট্টা তেমনি গত বুধবার জেন জিদের পাশে দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে রাহুল গান্ধী যেভাবে সরকারকে হুঁশিয়ারি দিলেন তাও বড়ো বদলের ইঙ্গিত। অত্যাচার পুলিশি নিগ্রহ করে আন্দোলন থামানো যায় না। বরং তা আরও তীব্র হয়। মোদি সরকারের উচিত, আন্দোলনকারীদের ডেকে কথা বলা। নাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পুলিশের লাঠি কিংবা আধাসেনার বন্দুক সমাধান নয়। কমিশনকেও বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে সব সঠিক তথ্য সামনে আনতে হবে। মানুষ যেন নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থা না-হারায়। মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে গণতন্ত্রের সর্বনাশ। দয়া করে সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে কেটে খেয়ে ফেলবেন না।
শুরুতেই যে-কথা বলেছিলাম, বিরাট পরীক্ষার সামনে রাহুল গান্ধী। মোদিজি প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন ৫১ বছর বয়সে, ২০০১ সালে ভুজ ভূমিকম্পের পর। তারপর পঁচিশ বছরের স্বপ্নের দৌড়! রাহুলের বয়স এখন ৫৬ বছর ৪ মাস। এখনও উড়ান শুধু তেল ভরে চলেছে। এবারও নাহলে রকেট আর কবে উড়বে? রাজনীতির এই এসপার ওসপার লড়াইটা দেখার জন্য মুখিয়ে ১৪০ কোটি ভারতবাসী। মোদির ঘুম নেই, রাহুলের চোখ চকচকে। দেশবাসী শেষকথা বলবেন ইভিএমে। সড়কের লড়াই কী পরিণতি পায়, আপাতত তা দেখারই অপেক্ষা। সরকার বদল শুধু মুখে বললে হবে না, করে দেখাতে হবে। কাজটা কঠিন।



