মর্মান্তিক ঘটনার শিক্ষা
  • ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

উৎসবের আনন্দ যদি মৃত্যুমিছিলে পর্যবসিত হয়, তার দায় এড়ানোর সুযোগ খোঁজা অন্যায়। চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে ভিড়ের নীচে চিরতরে চাপা পড়ে গিয়েছে ১৯টি তাজা প্রাণ। আরও অনেক মানুষ—শিশু, মহিলাই বেশি—জখম হয়েছেন কলকাতার এই মর্মান্তিক ঘটনায়। ঘটনাটি ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—উৎসবের জাঁকজমক, প্রচারের প্রতিযোগিতা এবং বেলাগাম ভিড়ের আড়ালে নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়। এক্ষেত্রে অবহেলার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে তাও চাক্ষুষ করা গেল। ১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমীর রাতে যে উৎসবমুখর পরিবেশ মুহূর্তে শোক ও আতঙ্কে ডুবে গেল, তার জন্য দায়বদ্ধ কে বা কারা তা নির্ধারণ করা জরুরি। প্রাথমিক তদন্তে পুজো কমিটির কর্মকর্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে মাইকে ঘোষণার বিতর্কটিও এসেছে তদন্তের আওতায়। সত্যিই যদি এমন বিভ্রান্তিকর ও আতঙ্কসৃষ্টিকারী ঘোষণা মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি বাধিয়ে থাকে—তবে তার পিছনে কারা ছিলেন? কোনো বদ মতলব ছিল কি? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ করেছিলেন? এসব প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ সামনে রেখে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাই। তবে তদন্তের আগেই কাউকে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করা নয়, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই দোষ নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ যেন তদন্তকে বিপথে চালিত করতে না-পারে, সরকারের দায়িত্ব এই বিষয়টি নিশ্চিত করা।

Advertisement

চোরবাগানের ঘটনায় একাধিক গ্রেপ্তার এবং বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রশাসনিক দায় চুকিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। মণ্ডপ নির্মাণের নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও নির্গমনের ব্যবস্থা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ এবং পুলিশ ও পুরসভার নজরদারি—সংশ্লিষ্ট সমস্ত ধাপ খতিয়ে দেখা দরকার। ফরেনসিক পরীক্ষা, মণ্ডপের ত্রিমাত্রিক স্ক্যান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং প্রাসঙ্গিক নথি ও প্রযুক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ‘রিকনস্ট্রাকশন’ করতে হবে। বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনা তো ছিলই। কিন্তু সেই অনুপাতে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তা কি পর্যাপ্ত ছিল? বিপদের আশঙ্কা দেখা দেওয়ার পর দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি? কোনো গাফিলতি প্রশাসনিক তৎপরতার দিকেও ছিল কি? এবংবিধ প্রশ্নগুলি সংগত, তাই উঠতেই পারে। পুজো উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার ভূমিকাও আতশকাচের নীচে রাখতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে সিট গঠিত হয়েছে। এই তদন্ত যেন স্বাধীনভাবে এবং স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গেই পরিচালিত হয়। অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে পদমর্যাদা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব আমলে না নিয়েই অভিযুক্তদের বিচারের কাঠগড়ায় টেনে নিয়ে যেতে হবে। বিএনএসের প্রযোজ্য ধারায় মামলা, নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রমাণ এবং আদালতে দ্রুত বিচার—এই ধারাবাহিকতাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ভিত্তি হতে পারে। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো তথ্য প্রচারকেও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু গুজবরোধের নামে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন, প্রশাসনিক ব্যর্থতার সমালোচনা কিংবা তথ্যের অধিকারকে খর্ব করা যাবে না। গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সত্য প্রকাশের অধিকার—দুটিই গণতান্ত্রিক সমাজে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড়ো কথা, মৃতদের পরিবার এবং আহতদের প্রতি সরকারের দায় কোনো ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যাঁরা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাঁদের জীবনে যে অপূরণীয় শূন্যতা নেমে এসেছে, তার ক্ষতিপূরণ অর্থ দিয়ে সম্ভব নয়। তবু তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা, আহতদের বিনামূল্যে ও উপযুক্ত চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং জীবিকার প্রশ্নে পাশে দাঁড়ানো সরকারের আশু কর্তব্য। ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে চেনা হয়রানি থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের রেহাই দিতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এ-ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে হবে রাজ্যজুড়েই। পুজোসহ সমস্ত বিপুল জনসমাগমের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা অডিট, ধারণক্ষমতা অনুযায়ী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত জরুরি ‘এগজিট’, প্রশিক্ষিত ভিড়-নিয়ন্ত্রণ কর্মী এবং কার্যকর বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। উৎসবের সাফল্য মণ্ডপের উচ্চতা, আলোকসজ্জার জৌলুস কিংবা দর্শনার্থীর সংখ্যায় মাপা যায় না—মানুষের নিরাপত্তাই তার প্রথম ও প্রধান শর্ত। চোরবাগান বিপর্যয় যেন—তদন্তের ফাইল, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা এবং রাজনৈতিক চাপানউতোরের গভীর গুহায় হারিয়ে না-যায়। নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, বিপন্ন পরিবারগুলিকে মানবিক সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ বিপর্যয় প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা—এই চারটি দায়িত্ব পালনেই সরকারের প্রকৃত কর্তব্যের পরীক্ষা। প্রাণ নিয়ে অবহেলা বা দায় এড়ানোর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই হোক এই মর্মান্তিক ঘটনার শিক্ষা।