এই শরতে উৎসবের আলো আর ঢাকের বাদ্যি সঙ্গে নিয়ে দুর্গোৎসবের আনন্দে মেতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল তিলোত্তমা তথা সমগ্র বাংলা। কিন্তু শুরুতেই আবাহনের সুরে মিশে গেল এক গভীর বিষাদের সুর। সঙ্গে যুক্ত হল ক্ষোভ এবং তীব্র বিশৃঙ্খলা। বাঙালির সেরা উৎসব হিসাবে স্বীকৃত দুর্গোৎসব এবার শেষ হল এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে। একদিকে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জন দর্শনার্থীর নির্মম মৃত্যু, আর অন্যদিকে উৎসবের আবহেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধীদের, বিশেষত বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে লাগাতার হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা— এই দুই ঘটনার জেরে প্রশ্ন উঠছে উৎসবের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে।
চোরবাগানের ঘটনাটিকে একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এই গোটা ঘটনাটি আসলে পরিকাঠামোগত গাফিলতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার এক চরম উদাহরণ। প্রতিমা দর্শনে আসা সাধারণ মানুষ মণ্ডপের ঘিঞ্জি পরিবেশে ঢোকার পর নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণে পদপিষ্ট হলেন। মাইকে ভুল খবর ঘোষণা, আপৎকালীন প্রস্থান পথ না থাকা এবং অভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবক বা পুলিশি নিয়ন্ত্রণের অভাব নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার পরেই তড়িঘড়ি গঠিত হয়েছে ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজন উদ্যোক্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সদস্যকে। ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িতে গিয়ে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দিচ্ছেন, স্বজনহারাদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। প্রশাসনিক তৎপরতা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের এক মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনের গভীরে যে বড়ো প্রশ্নটি বিঁধে রয়েছে, তা হল—ভিড় সামলাতে রাজ্য সরকার যে সমস্ত পদক্ষেপ নিল, তা কি আগে নেওয়া যেত না? ৫৮ হাজারেরও বেশি অনুমোদিত পুজো যে রাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে ভিড় সামলানোর ব্লু-প্রিন্ট কি ঘটনার আগেই তৈরি থাকা উচিত ছিল না? পুলিশ ও প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে বিধিনিষেধ ভেঙে বিশাল আয়োজন চালানো হল, কাদের প্রভাবে মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ এই প্রশ্রয় পেল—সেই সব প্রশ্নের এখনও সদুত্তর মেলেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল দোষী ও প্রকৃত প্রশাসনিক ব্যর্থতা চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে নাগরিক সমাজ।
একইসঙ্গে, উৎসবের প্রাঙ্গণে সহনশীলতার যে ঐতিহ্য বাংলা বহন করে আসছে, তা এবার মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বামপন্থীদের বইয়ের বিপণিতে হামলার ঘটনাগুলিতে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে মণ্ডপের বাইরে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের বইয়ের স্টল দেওয়া এক অতি পরিচিত চিত্র। অথচ, এবার রাজ্যের নানা প্রান্তে সেই বই বিপণিতে অহেতুক আক্রোশ থেকে আক্রমণ, বই ছেঁড়া ও স্টল ভাঙচুর করা হল। সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয়, এই ঘটনায় শাসকদল ও সরকারের অন্দরে নীতিগত অমিল ও অবস্থানগত বিভাজন। দলের রাজ্য সভাপতি ও কয়েকজন মন্ত্রী যখন প্রকাশ্যে বইয়ের উপর হামলাকে অসংস্কৃতিক এবং অনভিপ্রেত বলে নিন্দা জানাচ্ছেন, তখন খোদ শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ থেকে সনাতনী ভাবাবেগ ও ধর্মীয় প্রসঙ্গ তুলে ধরে হামলাকারীদের পরোক্ষ মদত দেওয়ার মতো বক্তব্য শোনা গিয়েছে। একদিকে ‘গেরুয়া পরে গুন্ডামি’ না করার বার্তা, অন্যদিকে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা—তা প্রমাণ করে যে শাসকদলের মতাদর্শগত অবস্থান ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত থাকতে পারে, কিন্তু বই ও বিচারধারার উপর এমন আগ্রাসী আক্রমণ কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। যদিও আক্রমণ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের বই কেনার উৎসাহ কিন্তু কমানো যায়নি। চোরবাগান-কাণ্ড এবং বই-বিপণিতে হামলার সার্বিক চিত্রটি দেখলে মনে হয়, প্রশাসনিক বিভ্রান্তি ও ভাবাদর্শগত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলা। উৎসব যেখানে মিলনক্ষেত্র হওয়ার কথা, সেখানে দেখা গেল এক চরম বিশৃঙ্খলা ও অসহিষ্ণুতার প্রদর্শন। সরকার একাধিক গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বললেও, শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতিপূরণ, তদন্ত রিপোর্ট বা কোনো ঘটনা থেকে দায় ঝেড়ে ফেললেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভের নিরসন হতে পারে না। আজ সময় এসেছে উৎসব আয়োজনের প্রতিটি ধাপে সার্বিক নিরাপত্তা বিধিকে কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করার এবং ক্ষমতার প্রভাবে নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি বন্ধ করার। একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিসরে যে হিংসার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে, তা অবিলম্বে প্রশাসনিক দৃঢ়তার সঙ্গে দমন করতে হবে। বিসর্জনের বিষাদের মাঝে আজ প্রয়োজন—আত্মপর্যালোচনা এবং আগামীতে এমন মর্মান্তিক ও অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারের আন্তরিক সংকল্প।


