ক্ষমতার চোখে আম জনতা কি কীটপতঙ্গ?
  • ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: সবার আগে ভাবতে হবে প্রতিটি ক্ষমতার পরিচালকরা আমাদের ন্যূনতম সম্মান দেয় কি না। ক্ষমতাবান কে? কোনো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে যে, সে তখন একজন রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো আচরণ করে। সরকার অথবা রেল। পুরসভা কিংবা পুজো কমিটি। মন্ত্রী অথবা আধিকারিক। হাতে সামান্যতম ক্ষমতা পেয়ে স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। ভিড়কে কীটপতঙ্গ ভাবাই সামাজিক ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব হয়েছে। তাই পুজোর আনন্দকে ম্লান করে দিয়ে চোরবাগানের মতো ঘটনা ঘটে যায় ক্ষমতাবানদের নির্লিপ্ত উদাসীনতায়। চোরবাগানের ঘটনা যতটা বেদনাদায়ক, ঠিক ততটাই স্বাভাবিক এই ঘটনার পিছনে থাকা কারণ। কারণটি হল, সাধারণ মানুষকে মানুষ নয়, কীটপতঙ্গ মনে করা। 

Advertisement

অফিস টাইমে অথবা উৎসবের সময় লোকাল ট্রেন কিংবা মেট্রোরেলে যে ভিড় হবে, সেটা সকলেই জানে। কিন্তু মুম্বই অথবা শিয়ালদহ সর্বত্র লোকাল ট্রেনে যাত্রীকে পোকামাকড় ভেবেই দেওয়া হয় পরিষেবা। কে ঝুলে ঝুলে যাচ্ছে, কে পোস্টে আঘাত পেয়ে পড়ে যাচ্ছে কী যায় আসে! যখন দুই বাস রেষারেষি করে তখন যাত্রীদের প্রাণ নিয়ে চালক কন্ডাকটর ভাবে না যে তারা নিজেরাও আম জনতা। অথচ স্টিয়ারিং হাতে পেলেই ক্ষমতা প্রদর্শন ও পাবলিককে পোকামাকড় ভাবে। 
দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় দর্শককে। ইচ্ছাকৃত ভিড় দেখায় পুজো কমিটি। ভিড় তাদের চোখে সাফল্য। ভিড় তাদের কাছে পোকামাকড়। তাই অনেক উঁচু কোনো স্টেজে বসে থাকেন কর্মকর্তারা। অথবা জনতার বাইরে কোনো নিরাপদ বলয়ে তাঁরা ঘুরে বেড়ান।  তাঁরা বুকে রিবন ঝোলানো  কার্ড দেখিয়ে ক্ষমতায়ন উপভোগ করেন। ক্যানিং, বসিরহাট, বারাসত, রানাঘাট, বাগনান, বাগুইআটি, গড়িয়া থেকে আসা ছেলেমেয়ে কাঁধে ঠাকুর দেখার আম জনতার লাইনকে এরা ভিড় ভাবেন। আসলে ভাবেন কীটপতঙ্গ!  পুরস্কার দাতা কমিটির সদস্যরা অথবা সেলেব্রিটি কিংবা ভিআইপি মণ্ডপে চলে এলে সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়? পোকামাকড়ের মতো। 
রাজনৈতিক দল, সরকার কিংবা পুজো কমিটি, যেই হোক, ভিড় মানেই হল সাফল্য। এই মনোভাব কি এই নতুন সরকারের আমলেই শুধু হয়েছে? একেবারেই নয়। পূর্বতন সরকার এই ভিড়ের উৎসাহবর্ধক। আরও বেশি থিম, আরও বেশি ভিড়, আরও বেশি কৃত্রিম জনসমাবেশ দেখানোর প্রয়াস সর্বদা হয়েছে। সেই সময়ই এই একই ঘটনা হতে পারত। হয়নি সৌভাগ্যবশত। হয়তো ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট কুশলী ভাবে হয়েছে। কিন্তু থিমের আড়ালে ভিড়ের মরণকূপ তৈরি হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে চলে গিয়েছে পুজোর আয়োজন। নতুন সরকার অবিকল সেই ফরমুলাই গ্রহণ করেছে। কারণ তাদের ধারণা, ভিড় যদি আমার পুজোয় হয়, তার অর্থ আমার জনসংযোগ অনেক বেশি। আমার নামডাক আরও হবে। কিন্তু নতুন রাজনীতিক ও কমিটি প্রধানদের উচিত ছিল এই শিক্ষা নেওয়া যে, অতীতের সেই বিখ্যাত পুজো আয়োজক নেতাদের আজ একটিমাত্র ভোটের পর কী হাল হয়েছে! অতএব ভিড়কে নিছক ভোটার নয়। মানুষ ভাবা উচিত। 
এই যে আম জনতাকে গুরুত্ব না দেওয়া এটা কি নিছক পুজোর সময় দেখা যায়? একেবারেই নয়। সারা বছর ধরে লাইন দেওয়া মানুষকে ধর্মস্থান অথবা প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্লাবের কর্তারা ভাবেন আম পাবলিক। তাই বিখ্যাত স্থানে প্রবেশ করার জন্য একাধিক প্রবেশপথ থাকে। হাজার হাজার টাকা থাকলে ভিআইপি এন্ট্রি পাওয়া যায়। রাষ্ট্রক্ষমতার উপরের দিকে যারা থাকে, তাদের কোথাও লাইন দিতে হয় না। কোথাও অপেক্ষা করতে হয় না। গ্যাস বুকিং-এর কোনো টেনশন নেই। ট্রেনের টিকিটের ওয়েটিং লিস্ট পেতে হয় না। 
দেশের নাগরিককে যদি রাষ্ট্রযন্ত্র সম্মান করে, তাহলে কি নিত্যদিন তাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা সম্ভব? কখনো আধার ও প্যানের লিংক করানোর লাইনে দাঁড়ায় মানুষ। যারা অনলাইনে পারঙ্গম নয় তাদের চরম দুর্গতি। কখনো আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ড লিংক করাতে হবে ফতোয়া দেওয়া হয়।   হঠাৎ একদিন বলা হয় আজ একটু পর থেকেই নোট বাতিল করা হল। ব্যস! পোকামাকড়ের মতো মানুষকে দৌড়তে হয় ব্যাংকে, এটিএমে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সারাদিন, সারারাত লাইনে দাঁড়াতে হয়। 
গোটা দেশ যাদের পরিশ্রম ও নৈপুণ্যে চলছে, সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের মানুষ হিসাবে ভাবাই হয়নি। তারা ধর্তব্যের মধ্যেই নেই। যদি থাকত, তাহলে কোনো সরকার তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকার এক সময়ের মধ্যে ফেলে দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে যানবাহন সমস্ত বন্ধ করে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করতে পারে না। একটি দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা নিষ্ঠুর, স্বেচ্ছাচারী হলে হাজার হাজার সহ নাগরিক যখন হাজার কিলোমিটার রাস্তা হাঁটছে ঘরে ফেরার জন্য, সেই সময় ব্যালকনি সোসাইটিকে নির্দেশিকা দেয় থালা বাসন বাজাতে! হেলিকপ্টারে করে ফুল ছড়ানো হয়। তখন রাস্তায় হাঁটছে অভাগা ভারতবাসী। 
যারা ব্যালকনিতে থালা-বাসন বাজিয়েছিল, তারা কি মানুষের সম্মান পেয়েছে রাষ্ট্রের কাছে? পায়নি। তাই ট্যাক্স দেওয়া এবং ভোট দেওয়া জনতা অক্সিজেন পায়নি করোনায়। দামি হাসপাতালে ভরতি হলেও মৃত্যু হয়েছে পোকামাকড়ের মতো। মানুষ রক্ত পায় না দরকারে। কারণ কী? কারণ তারা নিছক ভিড় ও ভোটার। তার বেশি কিছু নয়। সরকারি দপ্তর, টিকিট কাউন্টার অটো-টোটো-বাস, বিধায়ক সবাই আম জনতাকে ভাবে গুরুত্বহীন এক মানুষ। গ্রাহ্য না করলেও চলে। সম্মান না দিলেও হয়। আমাদের মধ্যে এই প্রবণতা নেই? আছে। আমাদের হাতে স্পেশাল এন্ট্রি পাস থাকলে আমরাও ভিড়কে পোকামাকড় ভেবে করুণার চোখে তাকাই। আমাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বদলে যায়। 
আসল সমস্যা কোথায়? সমস্যা হল আমাদের আত্মসম্মান তলানিতে। আমাদের যে অবিরত নিরন্তর অপমান করা হয় যে কোনো ক্ষমতায়নের মাধ্যমে, এই অনুভব বোধ নেই। অবিরত ধমক দেয় ক্ষমতা। অশিক্ষিত ক্ষমতার কাছে অপমান পাই। শিক্ষিত ক্ষমতার কাছে অসম্মান পাই। আমাদের রাগ নেই। অপমান নেই। আত্মসম্মান নেই। চোরবাগান আসে এবং যায়। চোরবাগানরা জানে এরা এসব ভুলে যাবে। আবার একই রকম থেকে যাবে। ভিন্ন সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি এবং অশালীন সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করাকে স্মার্টনেস ভেবেছি। রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থন করাকেই ভেবেছি ওটাই রাজনীতিবোধ। দুর্গাপুজোর মণ্ডপের বাইরে স্টলে স্টলে বই পোড়ানোকে অপমান ভাবি না। যারা সনাতন ধর্মের স্বঘোষিত প্রচারক সেজে এরকম বইয়ের স্টলে আক্রমণ চালায়, যারা তাদের সমর্থন করে, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখায়, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যদি বলা হয় নবদুর্গার নাম বলো! দশমহাবিদ্যার তালিকা কী? শ্রীশ্রী চণ্ডীর অর্গল স্তোত্র থেকে দেবী কবচ অথবা রাত্রিসূক্ত কাকে বলে? এরা পারবে না বলতে। কারণ এরা কেউ হিন্দু সনাতন ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানেই না। চর্চা নেই। মেধা নেই। বুদ্ধি নেই। বোধ নেই। মস্তিষ্কহীন আনুগত্যে জীবন অতিবাহিত করে। 
যারা আজীবন ভোট দিয়ে এসেছে তাদের হঠাৎ একদিন কয়েকজন উচ্চস্তরের লোকের সিদ্ধান্তে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। লজিকাল ডিসক্রিপেপ্সির নামে চরম উদ্বেগে পড়ে খেটে খাওয়া, ট্যাক্স দেওয়া, ভোট দেওয়া মানুষ। স্বভূমিতে উদ্বাস্তু করে দেওয়ার হুমকি হুঁশিয়ারি শুনতে হয় অবিরত। বলা হয় তুমি বাংলাদেশি। বৈধ স্বদেশবাসীকে দেশবাসী হিসাবে স্বীকার না করার এই প্রবণতা বিশ্বে আর দেখা যায়নি। গোটা বিশ্বে অনুপ্রবেশকারী এবং ভিনদেশ থেকে আসা অবৈধ বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলে। ভারতে স্বদেশিদেরই বিদেশি করার চেষ্টা হচ্ছে! কারণ কী? কারণ, অকস্মাৎ ক্ষমতাবানদের হাতে ক্ষমতা এসেছে। তারা ভাবছে আমাদের যা ইচ্ছা তাই করব। 
আম জনতাকে এভাবে গুরুত্বহীন ভেবে আড়ালে কী কী হয়ে চলেছে? একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ হল মধ্যপ্রদেশে। সেখানে সরকার হঠাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। সরকার থেকেই ফাঁস করা হয়েছে একের পর এক দুর্নীতি। কোনো পুরসভায় ২০০টি এলইডি বালবের দাম দেখানো হয়েছে ৬০ লক্ষ টাকা। কোথাও কেনা হয়েছে ৬৫ কোটি টাকায় ডাস্টবিন। কোথাও আবার ফিনাইল কেনা হয়েছে এক বোতলের দাম ৩৩ হাজার টাকা দরে। ৬০ ওয়াটের একটি এলইডির দাম দেখানো হয়েছে ১১ হাজার টাকা। এসব তো পুরসভার অডিট একটিমাত্র রাজ্যে। তাহলে গোটা দেশে কী হচ্ছে? রাজ্যে রাজ্যে বেসরকারি হাসপাতাল হয়, সরকারি হাসপাতাল কোথাও বৃদ্ধি পায় না কেন? কারণ, সরকারি হাসপাতালে আম জনতা চিকিৎসা করায়। 
চোরবাগানের চোরাগলি আমাদের নিয়তি নির্ধারিত। মৃত্যু এবং লাইন দেওয়ার মিছিল তাই রিলসের  উৎসব। কাফকার ভাষায় আমাদের ‘মেটামরফোসিস’ হয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রের চোখে, ক্ষমতার চোখে আমরা নিছক পোকামাকড়! 
একটাই ভরসা। ভারতের গণতন্ত্রের একটি অদৃশ্য শক্তি আছে। সে অহংকার খোঁজে। যখনই অহংকারের সন্ধান পায়, সেটির বিনাশ করে! অতএব ক্ষমতাবানদের অহংকারের পতন হয় ভারতবর্ষে।