দুর্গাপুজো, নবরাত্রির কারণে মাঝে কয়েকদিনের অলিখিত বিরতি ছিল। উৎসবের আঁচ মিটতেই শাসকের ঘুম ছুটিয়ে ফের দাবানলের মতো ছড়াতে শুরু করেছে আন্দোলনের ঝাঁঝ। জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে শুক্রবার রাজধানী দিল্লি সহ বিভিন্ন শহরে আছড়ে পড়ল জনরোষ। এবার আর শুধু জেন জি নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পথে নেমেছেন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষ এবং যুব সংগঠনগুলি। মোদি সরকারের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে ককরোচ জনতা পার্টি ঘোষণা করেছে, এবার ‘টপ বস’-এর ইস্তফার লক্ষ্যে এগবে আন্দোলন। ‘টপ বস’ মানে যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার সতর্কবার্তা দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখেছে সর্বভারতীয় কৃষক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ সংযুক্ত কিষান মোর্চা। জ্ঞানেশের ইস্তফার সঙ্গে এসআইআর বাতিলের দাবি তুলেছে এই মোর্চা। পাশাপাশি ‘পিপলস এগেনস্ট এসআইআর’ মঞ্চের অধীনে থাকা অন্তত ৩০০টি সংগঠন শুক্রবার দিল্লি সহ নানা শহরে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেশের ৮৮ শহরে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে নামার যে বার্তা দিয়েছে তাতে চাপ বাড়ছে সরকারের। এমন অগ্নিগর্ভ আন্দোলন ঠেকাতে আধাসেনা, র্যাফ-পুলিশের সঙ্গে ব্যারিকেড, শারীরিক নিগ্রহ ও ১৬৩ ধারাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে মোদি সরকার। সেইসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের ‘স্বৈরাচারী’ পদক্ষেপের প্রচার আটকাতে ডিজিটাল সাংবাদিকদের কাজে বেড়ি পরাতে তৎপর কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ মূলত এদের দৌলতেই পুলিশি বর্বরতার ছবি ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু সরকারের দমনপীড়নের অস্ত্রগুলি যত দাঁত-নখ বের করছে, জ্ঞানেশ কুমার তথা নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারির একের পর এক অভিযোগ তত সামনে উঠে আসছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, এই ইস্যুতে জনরোষ দমনের কাজটি এবার শাসকের পক্ষে আদৌ সহজ হবে না।
একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে যে আন্দোলন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে নতুন করে ইন্ধন জুগিয়েছে একটি নথি। তথ্য জানার অধিকার আইনে প্রকাশিত সেই নথিতে দেখা গিয়েছে, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত ২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিবকে পৃথকভাবে দু’টি চিঠি দেন দুই নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু এবং বিবেক যোশি। দু’টি চিঠিতেই স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের অন্ধকারে রেখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকের কাজের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের নির্দেশ জারি করেন গর্গ। সন্দেহ নেই, দুই কমিশনারের চিঠিতে ডেপুটি কমিশনারকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হলেও এই অনিয়মের পিছনে যে জ্ঞানেশ কুমারের পরোক্ষ মদত রয়েছে তা বোঝানো হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো খোঁজখবর নেওয়া তো দূরের কথা, ক্যাবিনেট সচিব চিঠি দু’টি পাঠিয়ে দেন সেই জ্ঞানেশ কুমারের কাছেই। নির্বাচন কমিশনের কাজে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করবে না কেন্দ্রীয় সরকার— এই যুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু পরোক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তির হাতেই তদন্তভার তুলে দেওয়ায় সরকারের সদিচ্ছা ও জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচানোর অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। দিন যত গড়াচ্ছে, ঝুলি থেকে একের পর এক বিড়াল বেরিয়ে পড়ছে!
কেলেঙ্কারির অভিযোগে ফের নাম উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের। একটি স্বাধীন সংস্থার গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এসআইআর-এ ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা ৩০ লক্ষ ৫৪৫ জন ভোটারকে ‘যোগ্য’ বলে রায় দিয়েছিলেন বিচার বিভাগীয় আধিকারিকেরা। এর অর্থ, এঁদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম থাকার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকছে না। অথচ এঁদের মধ্যে ১৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ৮৮৭ জনের (প্রায় ৫০ শতাংশ) বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে আবেদন করেছে খোদ নির্বাচন কমিশনই! এও কি সম্ভব! কমিশনের আবেদনে এই প্রায় ৫০ শতাংশের নাম বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিক কারণে প্রশ্ন উঠেছে, বিচারকদের যাচাইয়ের পরেও কেন নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করল নির্বাচন কমিশন? পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজ্যের এক প্রাক্তন নির্বাচন আধিকারিকও। নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে তিনি জানতে চেয়েছেন, দফায় দফায় যাচাইয়ের পর বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সবুজ সংকেতে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ‘যোগ্য’ হিসাবে স্থান পেল, তাঁদের অর্ধেকের নাম আবার বাদ দেওয়ার জন্য কোন নিয়মে ট্রাইবুনালে আবেদন করল নির্বাচন কমিশন? নির্বাচন কমিশন তথা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে এমন সাতকাহন প্রকাশ্যে আসার পরেও তাঁকে আড়াল করতে মরিয়া মোদি-শাহ নেতৃত্ব! কারণ হয়তো, জ্ঞানেশ কুমারকে সরালে তার আঁচ লাগবে তাঁর নিয়োগকর্তাদের উপরেও। এই ‘অশুভ’ আঁতাত যত স্পষ্ট হচ্ছে, তত মরিয়া হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের উপর দমনপীড়নের পথে হাঁটছে সরকার। এই লড়াইয়ে শেষপর্যন্ত হয়তো বর্বরতা হার মানবে। হয়তো বা পিছু হটতে হবে সরকারকে। কিন্তু মোদি জমানায় এই ইস্যুতে যে ন্যক্কারজনক পরিস্থিতির রেকর্ড তৈরি হল তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে আর কোনো সরকারের আমলে হয়নি বললে বোধহয় এতটুকু ভুল বলা হবে না।


