বাঙালি পরিবারে বিয়ের অনুষ্ঠান নানা হাসিঠাট্টায় পূর্ণ। এই ঘরোয়া মজলিশের কেন্দ্রে থাকে নববিবাহিতরা। লিখেছেন রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
বাঙালি পরিবারে বিয়ের অনুষ্ঠান নানা হাসিঠাট্টায় পূর্ণ। এই ঘরোয়া মজলিশের কেন্দ্রে থাকে নববিবাহিতরা। লিখেছেন রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
স্বামী বিবেকানন্দের মেজভাই পুণ্যদর্শন মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘বিবাহের আনুষ্ঠানিক প্রথা’ শীর্ষক রচনায় লিখেছেন, ‘স্ত্রী-আচার একটা জাতির বিশেষ করিয়া শিক্ষণীয়। কারণ এই সকল হইতেছে অতি প্রাচীন প্রথা। সেই জাতির অন্তর্নিহিত প্রাণস্বরূপ ইহাতে বিদ্যমান থাকে। কিন্তু স্ত্রী-আচার বুঝিতে হইলে গৃহ্যসূত্র সকল বিশেষ করিয়া দেখা আবশ্যক।’ কথাগুলো নেহাতই তত্ত্বকথা নয়। কারণ বাঙালির বিয়ে তো শুধুমাত্র দু’টি মানুষের সম্পর্কের চুক্তি নয়। এটি দু’টি পরিবারের সংস্কৃতি, আগের প্রজন্মের স্মৃতি এবং আচার-অনুষ্ঠানের একটি পূর্ণাঙ্গ জগৎ। সেই জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল স্ত্রী-আচার।
স্ত্রী-আচারের মধ্যে লুকিয়ে থাকে যা কিছু শুভ সেই সব মঙ্গলময় ভাবনা। এটি আসলে বিয়ের শুরু হওয়া থেকে তা শেষ হওয়া পর্যন্ত নববধূকে কেন্দ্র করে পালন করা নানা রীতি, আনুষ্ঠানিকতা এবং পারিবারিক বিশ্বাসের সম্মিলন। হ্যাঁ, অবশ্যই এই অনুষ্ঠানে বর বা নতুন জামাইয়েরও নানারকম ভূমিকা থাকে। কিন্তু তা সবসময়ই কনেকে কেন্দ্র করে। আর বিয়ের এই স্ত্রী-আচারের উদ্দেশ্য কিন্তু কেবল মজা বা দেখনদারি নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর ভিতর লুকিয়ে থাকে বাড়ির একটি নতুন সদস্যকে স্বাগত জানানো, তাকে পরিবারের অংশ করে নেওয়া এবং জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার ইঙ্গিত।
সত্যি কথা বলতে গেলে, বিয়ের স্ত্রী-আচারের সূচনা হয়ে যায় বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র ছেপে আসার সময় থেকেই। এই নিমন্ত্রণপত্রের এক কোণে তেল, হলুদ ও সিঁদুর ছোঁয়ানোর সুন্দর আচারটি কিন্তু একান্তভাবেই বাড়ির মহিলারাই করে থাকেন। আসলে তেল এবং হলুদকে খুবই পবিত্র বলে ধরে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে বিবাহ-অনুষ্ঠান সিঁদুর ছাড়া হয় না বলে তাও এখানে যোগ করা হয়ে থাকে। মূলত এইসব কারণে যুগ যুগ ধরে হলুদকে বিয়ের অন্যতম উপকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই একই কারণে বিয়ের দিন সকালে বরের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা আগে বরের গায়ে হলুদ দিয়ে, তারপর সেই হলুদ কনের বাড়িতে বয়ে নিয়ে গিয়ে কনের গায়ে ছুঁইয়ে, মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন। বলা হয়, এতে বর-কনের নজর লাগবে না। আর হলুদ খুব ভালো অ্যান্টিসেপটিকও বটে। ত্বকের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতে এবং শরীরকে স্নিগ্ধ রাখার জন্যে এটির কোনও জুড়ি নেই। গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানকে ঘিরে নির্ভেজাল আনন্দের অনুভূতি পরিবার-পরিজনের মধ্যে ঘটে থাকে। মাসি-পিসি-কাকিমা-দিদিরা বর এবং কনের আইবুড়ো বন্ধুদের গায়ে এবং তাদের পরিচ্ছন্ন জামা-শাড়িতে হলুদ লাগিয়ে যথেষ্ট মজা করে থাকেন। তাঁরা বলেন, বিয়ের হলুদ গায়ে লাগিয়ে দিলে নাকি আইবুড়ো ছেলেমেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যাবে।
বিয়ের দিন ভোররাতে বর এবং কনেকে ঘুম থেকে তুলে তাদের দই-চিঁড়ে-মাখা খাওয়ানো হয়। দই এমনিতেই নাকি খুব শুভ। এর সঙ্গে চিঁড়ে মেখে খাইয়ে দিলে শরীর নাকি ঠান্ডা থাকে। এবং এই পবিত্র খাবারটি বর এবং কনেকে তাদের বাড়ির প্রায় সকলের হাত থেকেই গ্রাসে গ্রাসে প্রাণপণে খেতে হয়, তাই বিষয়টি পবিত্র হলেও একটুখানি অসুবিধের। প্রাচীন নিয়মে বর এবং কনেকে খালি পেটে বিয়ে করতে হতো। তাই সন্ধে বা রাত্তিরের লগ্ন হলে তাদের সারাদিন পেটে আর কিছু পড়ত না। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গিয়েছে কিছু ক্ষুধাকাতর বর-কনে তাদের কিছু দুর্বলচিত্ত বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় সারাদিন লুকিয়ে কিছু-না-কিছু খাবার ঠিকই খেয়ে চলেছে। আবার বিয়ের ঠিক আগের দিন রাত্রে চালগুঁড়ো, নারকেলকুরো, গুড় আর সাদা তিল দিয়ে ‘আনন্দনাড়ু’ নামে একটি চমৎকার ভাজা নাড়ু তৈরি করে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করার নিয়ম রয়েছে।
সবচেয়ে সুন্দর বিবাহের আচারগুলির মধ্যে একটি হল শুভদৃষ্টি। যখন বর এবং কনে তাদের বিয়ের দিনে প্রথমবার একে অপরকে দেখে। পরিবারে ভাইয়ের মতো পুরুষ সদস্যরা কনেকে কাঠের পিঁড়িতে বসিয়ে ছাদনাতলায় বরের কাছে নিয়ে আসে। কনের মুখ তখন পানপাতা দিয়ে ঢাকা থাকে এবং তাকে ওই পিঁড়িতে বসিয়েই তারা বরের চারপাশ দিয়ে সাতবার প্রদক্ষিণ করে। বরের বাড়ির সদস্যরা তখন এই সাতপাকের গুনতি গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর কনের বাড়ির লোকেরা খেয়াল রাখেন যাতে একটি পাকও কোনওভাবে বেশি না হয়। এরপর কনেকে ওই পিঁড়িতে বসিয়েই বরের সঙ্গে শুভদৃষ্টি করানো হয়। দারুণ একটি খেলা ‘বর বড় না কনে বড়’, হয় এসময়। এতে কনেকে তার পিঁড়েধরিয়েরা আর বরকে তার বন্ধুবান্ধবরা বেশি উঁচু করে তুলে ধরার প্রতিযোগিতা করে। এর ঠিক পরেই হয় মালাবদল। এই মালাবদলের সময় বর-কনের মাথার উপর আশপাশের কয়েকজন আত্মীয় হাতে করে একটি চাদরের শামিয়ানা খাটিয়ে দেন। আর দু’পক্ষের নাপিতভায়া তখন নিজেদের মধ্যে ছড়া কেটে যুদ্ধ করে। কিন্তু এই দু’জনের ছড়ার মূল ভাব কিন্তু একই এবং তা হল নতুন বর-কনের যাতে কারও নজর না লেগে যায় তার প্রার্থনা এবং যে নজর দিতে যাবে তার আসন্ন ক্ষতি ও সর্বনাশ।
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে বরকনেকে নিয়ে গিয়ে বাসরঘরে বসানো হয়। সেখানে তাদের নিয়ে নানারকমের মেয়েলি খেলার ব্যবস্থা করে কনের বান্ধবী, শ্যালিকা এবং শাশুড়ি ছাড়া অন্য বয়স্ক মহিলারা।
যার মধ্যে প্রথমেই হল আংটি খোঁজার খেলা। এটি বাসরের একটি বহুল প্রচলিত খেলা। কিছুটা দুধ এবং সামান্য সিঁদুর মেশানো একটি গোলাপি রঙের জলে ভরা ছোট ধাতব গামলিতে একটি আংটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়। তারপর বর ও কনেকে একই সঙ্গে সেই পাত্রের জলে হাত ডুবিয়ে সেই আংটিটি খুঁজতে বলে সবাই। বলা হয়, যে প্রথম আংটিটি খুঁজে পাবে, দাম্পত্য জীবনে তার প্রভাব বেশি থাকবে। এটি নিয়ে বেশ হাসি-ঠাট্টাও হয়। তারই মধ্যে বর এবং কনে জলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে আংটি খুঁজতে গিয়ে নিজেদের হাত বেশ কয়েকবার ছুঁয়ে ফ্যালে। আমার এক মাসতুতো দিদিকে এই আংটি খোঁজা খেলতে গিয়ে নতুন জামাইবাবুর হাত ছুঁয়ে ফেলে শক খাওয়ার মতো হয়ে, জল থেকে বার তিনেক হাতটি তুলে ফেলতেও দেখেছি। নানা পরিবারে এই খেলাগুলি নিয়ে নানা রীতি। এর পর বাসরঘরের যে মেয়েলি খেলাটি খুবই জনপ্রিয় তা হল কড়িখেলা। তিনটে বেতের ছোট ছোট মাথা-ঢালা চুবড়ির মধ্যে বেশ কয়েকটি কড়ি রাখা থাকে। তার থেকে নিয়ে যে ক’টা কড়ি বর চেলে দেয়, কনে তার থেকে বেশ ক’টা সরিয়ে রেখে বাকিগুলো আবার এগিয়ে দেয়। সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে, অন্য চুবড়ি থেকে কড়ি বের করে বর আবার চেলে দেয়। তার থেকে আবার ক’টা সরিয়ে রেখে বউ আবার এগিয়ে দেয়। এইভাবে মোট তিনবারে বরের চেলে দেওয়া সব কড়ি কনে নিয়ে নেয়। অর্থাৎ বরের সব টাকাকড়ির উপর কনের পূর্ণ অধিকার স্বীকৃত হয়।
এরপর যদিও বরের নাম সবাই জানে, তবুও কনের কাছে সরাসরি তার বরের নাম জানতে চাওয়া হয়। এটাও কিন্তু বাসরঘরের এক মজার খেলা। প্রাচীন নিয়ম অনুসারে, বর হচ্ছেন মহাগুরু। তাঁর নাম কনেকে নিজমুখে উচ্চারণ করতে নেই। কিন্তু কনের বাড়ির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ারাই সেদিন কনেকে নানাভাবে তার বরের নাম উচ্চারণ করতে বাধ্য করে। নানাভাবে, অন্য আজেবাজে নাম বলে একসময় তাকে এমনভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে যাতে সে তার বরের নামটা একসময় উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়।
বর যখন বিয়ের পরে কনেকে নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকতে যায় তখন কনেপক্ষের অল্পবয়সি মেয়েরা, যেমন বান্ধবী ও শ্যালিকারা তাকে সেই ঘরে ঢুকতে বাধা দেয় এবং বরের কাছে মোটা টাকার যৌতুক দাবি করে। যতক্ষণ না বর নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়, ততক্ষণ তাকে বাসরঘরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। একইভাবে সারারাত বাসর জাগার পর সকালবেলায় বর যখন কনেকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ করেন, তখন এরাই আবার ‘বাসরজাগানি’ চায় এবং বরের পায়ের চটি লুকিয়ে রেখে দেয়, যতক্ষণ না তাদের পণের দাবি আদায় হয়। এই দাবি আদায় হলে তবেই তারা নতুন বর-কনেকে বাসি বিয়েতে বসতে দিত।