Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অদ্ভুত কণ্ঠস্বরকে আমরা স্বাগত জানাই

বক্তৃতাটি যদি কোনও নেতাকে পড়তে শুনে থাকেন, তাহলে আপনি ভাবতেন যে শব্দগুলি বাল গঙ্গাধর তিলক, জওহরলাল নেহরু, জয়প্রকাশ নারায়ণ কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার, এবং সেটা হবে আপনার ভুল ভাবা।

অদ্ভুত কণ্ঠস্বরকে আমরা স্বাগত জানাই
  • ২৪ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: বক্তৃতাটি যদি কোনও নেতাকে পড়তে শুনে থাকেন, তাহলে আপনি ভাবতেন যে শব্দগুলি বাল গঙ্গাধর তিলক, জওহরলাল নেহরু, জয়প্রকাশ নারায়ণ কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার, এবং সেটা হবে আপনার ভুল ভাবা। এক্ষেত্রে 

Advertisement

এই বক্তা ছিলেন আসলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শ্রীনরেন্দ্র মোদি।
এই শব্দগুলি সেই সাংবাদিকদের কাছে সংগীতের মতো শোনাবে, যাঁরা ১১ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনের যোগ দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থই হয়েছেন; তাঁরা আশা করতে পারেন, অবশেষে, মোদিজি সরাসরি টেলিভিশনে প্রচারিত প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার সংকল্প ভঙ্গ করবেন। এই শব্দগুলি সম্পাদকীয় লেখকদের আশ্বস্ত করবে যে, তাঁদের চিরকাল সতর্ক থাকার এবং ‘একদিকে’ ও ‘অন্যদিকে’-এর মতো বাক্যাংশ যোগে ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ সম্পাদকীয় লেখার প্রয়োজন নেই। এই শব্দগুলি দুষ্টু শিল্পীকে তাঁর পেন্সিল বের করে ‘কাউকে রেহাই না দেওয়া, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও না’ কার্টুন আঁকতে অনুপ্রাণিত করবে। এই শব্দগুলি সম্পাদকদের জন্য একটি আঘাত হবে—যাঁরা, ‘পাঠক, আমাকে ক্ষমা করুন, কারণ আমি জানি যে আমি কী করি’ এই প্রার্থনাসহ ‘কবর’ দিয়েছেন অসংখ্য ‘স্টোরি’।
সাহসকে অভিবাদন
নরেন্দ্র মোদির কথাগুলি সত্যিই প্রেরণাদায়ক ছিল। রামনাথ গোয়েঙ্কার ঘোষিত অবস্থান ছিল ‘সাহসী সাংবাদিকতা (জার্নালিজম অফ কারেজ)’। তিনি যে সংবাদপত্রটি প্রতিষ্ঠা করেছেন তার ‘মাস্টহেডে’ এই শব্দাবলি প্রতিদিন শোভা পায়। রামনাথ গোয়েঙ্কার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন:
‘রামনাথজি ব্রিটিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর একটি সম্পাদকীয়তে বলেছিলেন যে, ব্রিটিশের আদেশ অনুসরণ করার চেয়ে তাঁর সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়াকেই তিনি শ্রেয় জ্ঞান করবেন। একইভাবে, যখন জরুরি অবস্থার আকারে দেশকে আবার দাসত্বে বাঁধার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন রামনাথজি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। এবং এবছর জরুরি অবস্থা জারির ৫০ বছর পূর্ণ হল।’
প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, কিন্তু আজকের মিডিয়ার বাস্তবতা কী? ভারতের বিশিষ্ট সংবাদপত্রগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামের চুল্লিতে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। অনেকে কল্পনাও করতে পারেননি, স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরে ‘গোদি মিডিয়া’ নামক একটি কথা খুঁজে পেতে হবে তাঁদের। হাজার হাজার পাঠক এবং দর্শক তাদের পরিত্যাগ করলেও অনেক সংবাদপত্র ও চ্যানেলের শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে সরকারি বদান্যতায়। 
নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, ‘পঞ্চাশ বছর আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দেখিয়েছিল যে ব্ল্যাংক এডিটোরিয়াল বা শূন্য সম্পাদকীয়ও দাসত্বের মনোবৃত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। ...এই কাহিনিগুলি আমাদের জানায় যে, রামনাথজি সর্বদা সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সর্বদা সবকিছুর উপরে স্থান দিয়েছিলেন কর্তব্যকে, তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শক্তি যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন।’
অপ্রিয় বাস্তব
ফোর্থ এস্টেট বা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের অনুপ্রেরণামূলক কাহিনিগুলি এক ভিন্ন ধারার গল্পের সূচনা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন সম্পাদকের জীবনের একটি ঘটনা এইরকম ছিল যে, তাঁকে তাঁর চুক্তিভিত্তিক চাকরির বাকি বছরগুলির বেতনের জন্য একটি চেক হাতে ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে বলা হয়েছিল যে, সেদিনের কাজ শেষে তিনি যেন তাঁর ডেস্ক খালি করে দেন। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে একজন অ্যাংকর বা উপস্থাপকের দর্শক সবচেয়ে বেশি। তাঁর জীবনের একটি ঘটনা এইরকম: চ্যানেল মালিক তাঁকে ওই শো থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর মালপত্র গুছিয়ে নিতে বলেন। সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রিতে ঘটনাটি ‘মিডনাইট কু’ বা ‘মধ্যরাতের অভ্যুত্থান’ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিখ্যাত সাংবাদিকদের জীবনের আরও কিছু মর্মান্তিক কাহিনি আছে, যাঁরা গত ১০ বছরে তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন এবং আজও তাঁরা চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না।
কয়েকদিন আগে যশবন্ত সিনহা প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি সভার গল্প বলেছিলেন, সেখানে ভাষণ দেওয়ার জন্য তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন। ভাষণের পর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডা দেন। তাঁর অনুযোগ ছিল, তাঁর কিছু মন্তব্য মাঝেই মাঝেই প্রকাশ পায় না। এজন্য সেইসময় সাংবাদিকদের তিনি মৃদু ভর্ৎসনাও করছিলেন। তবু সকলেই চুপ ছিলেন, তবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এক তরুণ সাংবাদিক। তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনার মন্তব্য নিয়ে আমি অবশ্যই খবর লিখব। কিন্তু তাতে যদি আমার চাকরি চলে যায়, আপনি কি একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন?’ যশবন্ত সিনহা বললেন যে, এই কথা শুনে তিনি রীতিমতো হতবাক। অতঃপর ওই তরুণকে তিনি বললেন, ‘ইয়ং ম্যান, প্লিজ সেভ ইয়োর জব (বাবু, আগে তোমার চাকরি বাঁচাও)।’
আমারও একটা কাহিনি আছে: শীতের এক ঠান্ডা সন্ধ্যায়, আমি একটি ছোট রেস্তোরাঁয় একজন সাংবাদিকের সঙ্গে ডিনার করছিলাম। রাত প্রায় ১০টা তখন। ওই সাংবাদিক তাঁর অফিস থেকে একটি ফোন পান। তাঁকে অবিলম্বে তাঁর বাড়ি 
ফিরে যেতে বলা হল। সেখানে একটি ওবি ভ্যান অপেক্ষা করছিল। তাঁর কাজ ছিল একটি পূর্ব-প্রস্তুত বিবৃতি পড়া। তিনি তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চেয়ে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন তিনি এমন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন না, এবং তাঁর বসকে অনুরোধ করলেন না, যে অ্যাংকর ইতিমধ্যেই বাড়ি পৌঁছে গিয়েছেন, কাজটি তাঁকেই দিতে? সাংবাদিকটি গম্ভীর হয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আমার মা এবং বাবা আছেন। তাঁরা দুজনেই বয়স্ক এবং আমার উপর নির্ভরশীল। আমার বাড়ির জন্য একটি ইএমআই-ও চলছে।’ নিরুপায় সাংবাদিকটি উঠে যাওয়ার সময় অনেক ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
কিছু সাংবাদিক লোভ দ্বারা চালিত হন এবং 
মনে হয় তাঁরা উন্নতিও করেন। অন্যরা ভয় দ্বারা চালিত হন এবং বেঁচে যান। লোভ-চালিত সাংবাদিকরা চিৎকার চেঁচামেচি ও গালিগালাজ করেন এবং 
অদ্ভুত সব গল্প ফাঁদেন। এই ব্যাপারে অপারেশন সিন্দুর পর্বের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিছু সাংবাদিক এমনও ‘খবর’ প্রচার করেছিলেন যে, ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ নাকি করাচি বন্দর ঘিরে ফেলেছে এবং ভারতীয় সৈন্যরা করাচি শহরে প্রবেশের জন্যই প্রস্তুত!
ভয় অথবা স্বাধীনতা
চতুর্থ স্তম্ভ জুড়ে যে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে—যশবন্ত সিনহা ও আমার কথা এবং অন্যদের কাছ থেকে আপনি যা শুনেছেন, গল্পগুলিতে সেসবই  ফুটে উঠেছে। বিশ্বাস করুন, অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা আমাকে যা বলেছেন এবং আমি যা সংগ্রহ করেছি তাতেও রয়েছে একটি অদৃশ্য সেন্সর! সমস্ত প্রধান সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলের উপর ২৪×৭ বা সর্বক্ষণের নজরদারি রয়েছে। সম্পাদকদের কাছে গোপন টেলিফোন কল যায়। দেওয়া হয় পরামর্শ। সেসব উপেক্ষা করার পরিণাম ভালো হয় না। অনেক কাহিনি ‘সদ্যোমৃত’ আর অনেকগুলিকে ‘হত্যা’ করা হয়। মনে হচ্ছে যে হিন্দি মিডিয়া বাদে, ভারতীয় ভাষার একমাত্র ছোটো মিডিয়া সংস্থাগুলিই রক্ষা পেয়েছে।
ভয় হল স্বাধীনতার সবচেয়ে মারাত্মক শত্রু। ভারতে থাকতে পারে একটি ভীত-সন্ত্রস্ত প্রেস অথবা একটি স্বাধীন প্রেস।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ