Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

পুরনো ফেরিঘাটের মুখ থেকে ডান হাতে যে রাস্তা চলে গিয়েছে সে রাস্তা ধরে আমি বহুবার গিয়েছি।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
  • ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: পুরনো ফেরিঘাটের মুখ থেকে ডান হাতে যে রাস্তা চলে গিয়েছে সে রাস্তা ধরে আমি বহুবার গিয়েছি। ওই রাস্তা ধরে খানিক এগিয়ে বাঁ দিকের পথ ধরলেই শহরের প্রাণকেন্দ্র ঘড়ির মোড়ে পৌঁছে যাওয়া যায়। একশো মিটার এগলেই একটা বাঁক। তার ডান পাশে ছোট এক স্নান ঘাট। প্রাচীন ইটের ছাউনি অতিক্রম করে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নদী বক্ষে। শীতের সকাল। সকালের আলোতে চিক চিক করছে প্রবাহিণী গঙ্গাবক্ষ। ঘাট সংলগ্ন একটা চায়ের দোকান দেখে সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম। চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে দেখছিলাম প্রাচীন সেই ঘাটের দৃশ্য। দু’চারজন লোক স্নান করছে ঘাটে। ঘাটের পৈঠায় পড়ে আছে বিসর্জন হয়ে যাওয়া দেবদেবীর খড় আর কাঠের কাঠামো। যা সব পরিচিত স্নানের ঘাটেই দেখা যায়। স্নান ঘাট হিসাবে এ ঘাট বেশি বড় নয়। খুব একটা বিশেষত্বও চোখে পড়ল না ঘাটে। এমন অনেক ছোট ছোট স্নানের ঘাট আছে নদীর দু’পাশেই। তবে ঘাটের ছাউনির ইটের দেওয়ালের গায়ে দেখলাম লেখা আছে স্নান ঘাটের নাম— প্রসাদ দাস সেন স্নান ঘাট, বড়বাজার। স্থাপনা কাল ১৯৩০। অর্থাৎ প্রায় একশো বছরের প্রাচীন স্নান ঘাট। হঠাৎই চোখ পড়ল যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানেই রাস্তার বিপরীতে একটা আবর্জনার স্তূপের ওপর। তার ভিতর থেকে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে ফুট চারেক লম্বা, বৃত্তাকার স্তম্ভর মতো একটা লোহার জিনিস। এক ঝলক দেখলে জিনিসটাকে পুরনো দিনের বড় লোহার পাইপ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভালো করে জিনিসটার দিকে তাকাতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। ক’দিন আগেই আমি বিশেষ কাজে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সংগ্রহশালায় গিয়েছিলাম, সেখানে যেন আমি ওই জিনিসই সাজিয়ে রাখতে দেখেছি, যা উঁকি মারছে আবর্জনার স্তূপের ভিতর থেকে। আমি তাকালাম আমার সঙ্গী অঙ্কিত ঘোষালের দিকে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্র সে। সম্প্রতি গঙ্গা তীরের এই প্রাচীন জনপদের ওপর কিছু কাজও করেছে সে। সে বলল, ‘ওটা একটা প্রাচীন কামান। ওলন্দাজ বা পর্তুগিজদের কারওর হতে পারে। এ শহর তো একসময় ওলন্দাজ বা ডাচেদের উপনিবেশ ছিল।’

Advertisement

গঙ্গার এই পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল সার সার উপনিবেশ। পাঁচশো বছর আগে হুগলি-ব্যান্ডেলে এসে নদীর পাড়ে প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিল পতুর্গিজ বণিকরা। এই চুঁচুড়াতে হল্যান্ডের ডাচেদের আর তার পাশে চন্দননগরে ছিল ফরাসি বাণিজ্য কুঠি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কুঠির সঙ্গে ব্যবসা করত ডাচেরা। তারপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিল ওলন্দাজ-পতুর্গিজ, ফরাসি, আর্মেনিয়ানদের বাণিজ্য। চন্দননগরের ফরাসিরা অবশ্য খানিকটা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। পলাশির যুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাপতি সিলফ্রের নেতৃত্বে একদল গোলন্দাজ সিরাজ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু এই যুদ্ধের পরই ক্লাইভ অন্য বিদেশি বণিকদের বাণিজ্য কুঠিগুলি একে একে দখল করতে শুরু করেন। নানা শর্ত আরোপ করতে থাকেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক শক্তি ও বাণিজ্যিক কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ বণিকের দল এইসব অঞ্চল ত্যাগ করে নিজেদের দেশে অন্যত্র চলে যেতে থাকে। এ জায়গায় তারা পিছনে ফেলে রেখে যায় কিছু স্মৃতি। ইতিহাসের দলিলের সাক্ষী হয়ে যা উকি মারছে আবর্জনার স্তূপের আড়াল থেকে।
আমার অনুমান, এই কামান ফরাসিদের কামানও হতে পারে। কারণ পলাশির যুদ্ধের সময়কালে ফরাসিরা হুগলি নদীর এই পশ্চিম পাড়ে বহু জায়গাতে নিজেদের আত্মরক্ষার্থে কামান বসিয়েছিল। যদিও তারা শেষরক্ষা করতে সফল হয়নি। এ ধরনের একটা ফরাসি কামান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সংগ্রহশালাতে রয়েছে।
হাতের সামনে বাংলার ইতিহাসকে দেখতে পাচ্ছি দেখে একজন ইতিহাস প্রেমী হিসাবে রোমাঞ্চিত হলাম, তেমনই বেদনাহত হলাম। জঞ্জাল-আবর্জনার স্তূপের মধ্যে এ শহরের ইতিহাসের এক হতভাগ্য সাক্ষী কামানটি। চুঁচুড়া শহর শিক্ষিত-রুচিশীল মানুষের শহর হিসাবে পরিচিত। কাছেই বিখ্যাত ঘড়ির মোড়। কারও কোনও দিন চোখে পড়েনি এই কামানটা? মনে হয়নি নিজের শহরের এই স্মৃতি চিহ্নকে একটু সংরক্ষণের প্রয়োজন? হায় ইতিহাস! হায় বাঙালি সাংস্কৃতিক চেতনা! এ কামান তো শুধু এ স্থানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত নয়, ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের সাক্ষী। যখন বণিকের মানদণ্ড শাসকের শাসক দণ্ডতে রূপান্তরিত হতে চলেছিল সেই সময়কার সাক্ষী এই কামান। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তোলার পর ঠিক করলাম এ শহরে যদি সেই ঔপনিবেশিক স্মৃতি চিহ্ন থাকে তা আজ এখন ঘুরে দেখব। আর তার পাশাপাশি প্রাচীন কোন স্থানও যদি থাকে তা এই সকালে ঘুরে দেখব। আমার সঙ্গী এ শহরের সব জায়গা চেনে, সে নিজেও এসব বিষয়ে আগ্রহী। তাই আমার প্রস্তাবে সে রাজি হয়ে গেল। বাইকে উঠে আমরা রওনা হয়ে গেলাম চুঁচুড়ার প্রাচীন ডাচ সিমেট্রি’র উদ্দেশে।
একটা শান্ত জনবসতির মধ্যে বেশ কয়েক একর নিয়ে প্রাচীর ঘেরা ওলন্দাজ কবরখানা। ওবেলিঙ্কের মতো দেখতে কবরের ওপর নির্মিত প্রাচীন স্মৃতি সৌধগুলো বাইরে থেকেই দেখা যায়। প্রবেশ পথের বাইরে লেখা আছে এই ডাচ সিমেট্রি ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। সিমেট্রির প্রবেশ মুখে লোহার তৈরি ছোট রিভলবিং গেটে তালা দিয়ে চেন বাঁধা আছে। কোনও দ্বাররক্ষীর সন্ধান না পাওয়াতে খানিক কসরত করে সেই গেটের ফাঁক গলে প্রবেশ করলাম সমাধি ক্ষেত্রের ভিতর। তবে এই প্রাচীন সমাধিস্থলের ভিতরটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দেখলে বোঝা যায় এ স্থান নিয়মিতভাবে পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ভিতরে প্রবেশ করলেই একটি সুন্দর পাথরের ফলকে ওলন্দাজদের এই সমাধি ক্ষেত্রের পরিচয় জানা যায়।—‘এই সমাধিক্ষেত্রটি অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে চুঁচুড়ায় বসবাসকারী ওলন্দাজগণ তৈরি করেন, যেটি উঁচু প্রাচীর বেষ্টিত। এই সমাধিক্ষেত্রটি ডাচ গভর্নর তিন্নি ফোর্ট তৈরি করেন। সবচেয়ে প্রাচীন সমাধিটি হল স্যার কর্নওয়ালিস জং-এর। রয়েছে ডাচ নৌবাহিনীর প্রধান সেনাপতি লুকাস জুডল্যান্ডের সমাধি। চুঁচুড়ার ডাচ গভর্নর জেনারেল ড্যনিয়েল অ্যান্টনি ও ভারবেকও এখানে শায়িত আছেন।
শীতের সকালের আলো ছড়িয়ে আছে সমাধিক্ষেত্রের স্মৃতিস্মারকগুলোতে। কোথায় সেই সাগর পাড়ের দেশ হল্যান্ড, আর কোথায় এই হুগলি নদীর দেশ! সাগর পাড়ি দিয়ে হল্যান্ড থেকে তাঁরা এ দেশে এসেছিলেন বাণিজ্য করতে। নদীর পাড়ে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন বাণিজ্য কুঠি, দুর্গ। প্রায় দুশো বছর ধরে এখানে বসবাস করেছিলেন তাঁরা। এ জায়গাকে সে সময় তাঁরা ডাকতেন ‘হল্যান্ড অব ইন্ডিয়া’ নামে। তাদের মধ্যে যাঁদের আর নিজের দেশে ফেরা হয়নি তাঁদের অনেকেই ঘুমিয়ে আছেন কবরগুলোর নীচে। ঘুরে দেখতে শুরু করলাম জায়গাটা। কিছু কবর সাদা-মাটা, আবার কিছু কবর ওলন্দাজ স্থাপত্যে নির্মিত কক্ষ দিয়ে আবৃত। কিছু কবরের ওপর আবার তিরিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু ওবেলিক্স আকৃতির বা লম্বা ত্রিভুজ আকৃতির সৌধ নির্মাণ করা। সম্ভবত সেগুলি ডাচ গভর্নর বা অভিজাত ওলন্দাজ ব্যবসায়ীদের কবর। কিছু স্মারকের গায়ে এক সময় নাম খোদাই করা ছিল। তবে সে সব নাম আজ পড়া যায় না। সময় ঝাপসা করে দিয়েছে সেসব নাম। শুধু কর্নওয়ালিসের প্রাচীনতম কবরের ওপরে ওবেলিক্সের গায়ে তার নাম খোদাই করা ফলক বসানো আছে। সম্ভবত ওই ফলকটি সৌধ নির্মাণের অনেক পরে বসানো হয়েছিল। যদিও সেই ফলকটিও শতাব্দী প্রাচীন। সেই ফলকে নামের সঙ্গে রোমান হরফে ‘হায়ার রাস্ট’ কথাটা লেখা আছে। ওলন্দাজ ভাষাতে ‘হায়ার রাস্ট’-এর অর্থ ‘এখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন।’
সুন্দরভাবে সাজানো ওলন্দাজদের পুরনো সমাধি ক্ষেত্র দেখার পর আমরা রওনা হলাম বিশেষ একজনের সমাধি মন্দির দেখব বলে। সেই সমাধি ক্ষেত্র অবশ্য বাইরের লোকের কাছে বেশ খানিকটা পরিচিত। কারণ, সেখানে যিনি ঘুমিয়ে আছেন, তাঁর জীবন কাহিনি নিয়ে একটি বলিউড চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। যার স্ক্রিপ্ট রচনা করেছিলেন বিখ্যাত লেখক রাসকিন বন্ড। চুঁচুড়ার খাদিনা মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে গেলেই বড় রাস্তার বাঁ পাশে রাস্তা থেকেই দেখা যায় মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দুধ সাদা সেই সমাধি মন্দির। যা সহজেই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মাঠের মধ্যে একপাশে ছোট বাগিচা ঘেরা জায়গায় মধ্যে সেই স্মৃতি সৌধের অবস্থান। ছোট সাঁকো পেরিয়ে প্রবেশ করলাম অনুচ্চ প্রাকার ঘেরা সেই স্মৃতি সৌধের মধ্যে। এ সৌধটিও একজন ডাচ মহিলার কবরের ওপর নির্মিত। তাঁর নাম, ‘সুমান আল্লা মারিয়া’। দর্শনার্থীদের জন্য একটি সাইন বোর্ডে তাঁর এই স্মৃতিসৌধ সম্পর্কে লেখা আছে—‘এই সুন্দর জমকালো সমাধিটি একজন ওলন্দাজ মহিলার, যিনি থমাস ইয়েটস নামে একজন ব্রিটিশ নাগরিককে বিয়ে করেছিলেন। থমাস ইয়েটসের আগে তিনি পিটার ব্রাইটসকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর দুই স্বামীর মৃত্যুর আগে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচুর ধনসম্পত্তি ও আয়েসাবাগ নামে এখটি বাগান প্রাপ্ত হন। এই বাগানে তাঁর দেহ শায়িত আছে। এই সমাধিটি অষ্টকোণ বিশিষ্ট উন্নীত সমতলের উপর তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ির মাধ্যমে চারটি প্রধান কোণ থেকে উন্নীত সমতলে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। বাহ্যিকভাবে দ্বিতল এই জমকালো সমাধিটি ফরাসি ও ভেনিসের ব্যারক রীতি মনে করায়। এটি শৈলশিরা যুক্ত গোলাকার গম্বুজ দ্বারা ঢাকা। গম্বুজটির শীর্ষদেশ একটি লণ্ঠন যুক্ত সেটি সমাধিটির অবিকল প্রতিরূপ। ব্রোঞ্চের ঘণ্টাটি যেটি ছাদ থেকে ঝোলানো ছিল সেটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই সমাধিটি ১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্তম্ভ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
কেউ কেউ এই কবরটিকে ‘সাত সাহেবের বিবির কবর’ নামেও ডেকে থাকেন। প্রচলিত লোক কথা অনুসারে দু’জন নয়, সাতজন ধনী ব্যক্তিকে নাকি সম্পত্তির লোভে বিবাহ করেছিলেন ডাচ সুন্দরী রমণী সুমান মারিয়া! তাঁদের প্রত্যেকের মৃত্যুর জন্য নাকি তিনিই দায়ী। এ বক্তব্যর পক্ষে-বিপক্ষে ইতিহাস রচয়িতাদের কোনও প্রামাণ্য সাক্ষ্য মেলে না। তবে এই ওলন্দাজ নারী নাকি তার সাত স্বামীর অর্থ নানা জনহিতকর কাজে দান করেছিলেন। তাই মানুষ তাঁর অপরাধকে মনে রাখেনি। রাসকিন বন্ড এই রহস্যময় বৈভবশালী নারীর জীবনের ওপর ভিত্তি করেই রচনা করেছিলেন ‘সুজানাস সেভেন হাজব্যান্ডস’ উপন্যাস। সেটির অবলম্বনেই বলিউডের তৈরি হয় ‘সাত খুন মাফ’ নামক ছবিটি। 
জুতো খুলে সিঁড়ি বেয়ে সাদা সৌধটির এক তলার কক্ষে উঠে এলাম। কিছুটা দূরেই ব্যস্ত জিটি রোড। তবে তার কোলাহল, যানবাহনের শব্দ এ জায়গা পর্যন্ত এসে পৌঁছচ্ছে না। চারপাশ উন্মুক্ত এক কক্ষ। যার মাটির গভীরে ঘুমিয়ে আছেন এক ডাচ রমণী। হল্যান্ড থেকে কলকাতা বন্দর হয়ে জলপথে একদিন তিনি এসে উপস্থিত হয়েছিলেন ওলন্দাজদের হুগলি তীরের উপনিবেশ চুঁচুড়াতে। প্রথমে বিবাহ করেছিলেন বাংলার প্রথম ডাচ ডিরেক্টর পিটার ব্রাইটসকে। রহস্যময়, বিতর্কিত এই নারীর মৃত্যুর পর তার উইল ও গচ্ছিত অর্থর সাহায্যে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দ তার কবরের ওপর নির্মিত হয় দৃষ্টি নন্দন এই স্মৃতি সৌধটি। অর্থাৎ দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে সুমান মারিয়া বিশ্রাম নিচ্ছেন এ স্থানে।
এরপর আমরা রওনা হলাম আমাদের শেষ গন্তব্য গঙ্গা পাড়ের ষণ্ডেশ্বর মন্দিরের দিকে। ষণ্ডেশ্বর অর্থাৎ শিবের মন্দির হলেও তা ডাচ শাসিত চুঁচুড়ার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মূল মন্দিরের কাঠামোটি বেশ উঁচু ও সুগঠিত। সেটিকে ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু দেবদেবীর উপমন্দির। মূল মন্দিরের গা বেয়ে প্রশস্ত সিঁড়ির ধাপ নেমে গিয়েছে নদী বক্ষে। বলা যেতে পারে ষণ্ডেশ্বর মন্দিরের এই ঘাটই চুঁচুড়া শহরের প্রধান স্নান ঘাট। বহু কিংবদন্তি প্রচলিত আছে এ মন্দির প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তার মধ্যে একটি হল পাঁচশো বছর আগে দীপঙ্কর হালদার নামে এক ব্যক্তি স্বপ্নাদেশ পেয়ে গঙ্গাবক্ষ থেকে উদ্ধার করেন ষণ্ডেশ্বর বা মহাদেবের প্রতীক শিবলিঙ্গটি। সেই ধনাঢ্য ব্যক্তি এ স্থানে মন্দির নির্মাণ করে স্থাপন করেন বাবা ষণ্ডেশ্বরকে। শিবলিঙ্গের সঙ্গে নাকি উদ্ধার হয়েছিল একটি তাম্র শাসন। কোনও কোনও ইতিহাস গবেষকের মতে, বাংলার শাসক হুসেন শাহের আমলে তাঁর এক হিন্দু রাজ কর্মচারী গোপীনাথ এ স্থানে এই দেবতাকে আনেন এবং মন্দির নির্মাণ করান। এ মন্দিরকে ঘিরে গড়ে ওঠা নানা অলৌকিক কাহিনি প্রভাব বিস্তার করেছিল খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ওলন্দাজদের মনেও। মন্দিরে উৎসবের সময় যে ঢাক দু’টি বাজানো হয়, তার একটি উপহার দিয়েছিলেন ডাচ গভর্নর ব্রিচ। আর অন্যটি উপহার দিয়েছিলেন আর এক ডাচ গভর্নর বিক। মন্দিরে ঢুকে বাবা ষণ্ডেশ্বরকে দর্শন করার পর তাকে ঘিরে থাকা উপমন্দিরগুলোও দেখলাম। এক সময় খেয়াল হল ঘুরতে ঘুরতে বেশ বেলা হয়ে গেছে। রওনা হলাম ফেরার জন্য। যে দিক দিয়ে ফেরার পথ ধরলাম সে পথে আবার চোখে পড়ল সেই কামানটা। বাবা ষণ্ডেশ্বরের এক বাহন সেখানে দাঁড়িয়ে ফেলে দেওয়া এঁটো কলাপাতা, বাসি ফুলের মালা চিবুচ্ছে। আর সেই জঞ্জালের স্তূপের ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ওলন্দাজ, পতুর্গিজ অথবা ফরাসি কামানটা। যেন বলার চেষ্টা করছে ‘হে অতীত, কথা কও।’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ