নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: দীর্ঘ চার বছরের ‘নির্বাসন’ কাটিয়ে ফের পরীক্ষা কেন্দ্রের তকমা ফিরে পেল বীরভূমের ঐতিহ্যবাহী হেতমপুর কৃষ্ণচন্দ্র কলেজ। কিন্তু ফের সিট পড়তেই স্বমহিমায় অবতীর্ণ কলেজ কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার স্নাতকের তৃতীয় সেমেস্টারের পরীক্ষা শুরু হতেই দেখা গেল সেই চেনা ছবি। কলেজের প্রবেশদ্বারেই টাঙানো চুরির বিরুদ্ধে ‘নীতিবাক্য’ লেখা পোস্টার। সেইসঙ্গে বজ্রকঠিন নজরদারি গণ টোকাটুকির পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াল। নজরদারির এমন কড়াকড়ি যে, টুঁ শব্দ করার জো নেই। আর এই কড়া গার্ডের গেরোয় পড়ে কার্যত নাজেহাল অবস্থা বাইরের কলেজ থেকে পরীক্ষা দিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের একাংশের। টোকাটুকির অভিযোগে এদিন চারজন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।
এদিন সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজ এবং খয়রাশোল শৈলজানন্দ ফাল্গুনী স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের ১০৮৪জন পরীক্ষার্থীর আসন পড়েছিল এই কলেজে। কিন্তু কেন গত চার বছর এখানে সিট পড়া বন্ধ ছিল? কলেজের অলিন্দে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, এই কলেজের ‘অতিরিক্ত’ কড়াকড়িই ছিল কাল। টোকাটুকি করতে বাধা দেওয়ায় এবং নকলের সুযোগ না মেলায় চরম ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ছাত্রনেতাদের একাংশ। তাঁরাই প্রভাবশালীদের মাধ্যমে উপরমহলে দরবার করেছিলেন। সেই কলকাঠিতেই দীর্ঘ চার বছর এই কলেজকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। যদিও কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য তথা স্থানীয় তৃণমূল নেতা সাগর কুণ্ডু বলেন, সিট না পড়ার কারণ মূলত যাতায়াতের সমস্যা। হেতমপুর কলেজটি এক প্রান্তে হওয়ায় নিয়মিত বাস পাওয়া যায় না। যাতায়াতের সমস্যার কারণেই সম্ভবত সিট পড়া বন্ধ ছিল। যদিও এদিনের কড়া মেজাজ বুঝিয়ে দিল, আসল কারণ ছিল কলেজের আপসহীন মনোভাব।
এদিন শুধু কড়া গার্ডই নয়, হলের বাইরে বড়বড় পোস্টার টাঙিয়ে রীতিমতো চুরির কুফল নিয়ে ক্লাস নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পোস্টারে স্পষ্ট লেখা-‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে অস্ত্রসস্ত্র বা যুদ্ধের দরকার হয় না। যদি সেই জাতিকে পরীক্ষায় চুরি করতে দেন, তাহলে সেই জাতি নিজেকেই নিজে ধ্বংস করে দেবে। দুর্বল ডাক্তার তৈরি হবে, রোগী মারবে। দুর্বল ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে। সব নির্মাণ ভেঙে পড়বে। দুর্বল শিক্ষক-শিক্ষিকা তৈরি হবে, অসাধু ছাত্রছাত্রী তৈরি করবে।’ অধ্যক্ষ গৌতম চট্টোপাধ্যায় সাফ বলেন, আমরা কোনও চৌর্যবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিই না। চুরি করে পাশ করা মানে জাতিকে দুর্বল করা। আমরা জাতিকে ভালোবাসি, তাই চুরির সুযোগ দেব না।’ এই কড়া মনোভাবের প্রমাণ মিলল হাতেকলমে। চারজন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। অবশ্য কড়াকড়ির পাশাপাশি অধ্যক্ষের মানবিক রূপও ধরা পড়েছে। বাইরে থেকে আসা পরীক্ষার্থীরা যাতে সিট খুঁজতে সমস্যায় না পড়েন তারজন্য অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে খোদ অধ্যক্ষকেও দেখা গিয়েছে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘর চিনিয়ে দিতে। একদিকে শৃঙ্খলার শাসন আর অন্যদিকে অভিভাবকসুলভ সহায়তা। কলেজের বার্তা স্পষ্ট, পাশ করতে হলে পড়াশোনা করেই আসতে হবে। ‘অন্য পথে’ পার পাওয়া অসম্ভব। এক প্রাক্তন অধ্যাপক বলেন, বাম আমল হোক বা বর্তমান সময়, অবিভক্ত বাংলার পঞ্চম প্রাচীনতম এই কলেজ কখনো মাথা নোয়ায়নি। ঐতিহ্য রক্ষায় আপস না করার মাশুল গুণতে হয়েছিল কলেজকে। -নিজস্ব চিত্র