এই শীতে গরম জলে স্নান করে হালকা রোদ পোহানোর থেকে শান্তির বোধহয় কিছু হয় না। বাড়ির বাথরুমে থাকা গিজারটি এই প্রয়োজনের সবচেয়ে সহজ সমাধান। ‘গিজার’ শব্দটি এসেছে আইসল্যান্ডের শব্দ ‘গেইজা’ (দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বা গড়িয়ে পড়া) থেকে। ভূতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় গিজার বলতে বোঝায়, একটি প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ। ১৮৬৮ সালে লন্ডনে বেঞ্জামিন ওয়াডি মোয়ান প্রথম সলিড ফুয়েল-মুক্ত ওয়াটার হিটার তৈরি করেন এবং এর নামকরণ করেন ‘গিজার’। এই মেশিন আজ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আধুনিক। বাড়িতে গিজার থাকলে সারাদিনের কাজে বেশ খানিকটা সময় বাঁচতে পারে। বারবার গরম জল করার জন্য গ্যাস খরচও কম হয়। গিজার সাধারণত দু’রকমের হয়। ১) স্টোরেজ গিজার ও ইনস্ট্যান্ট গিজার। স্টোরেজ গিজার জল গরম করে ট্যাঙ্কে জমা রাখে। সাধারণত স্নানঘরে এমন গিজার প্রয়োজন হয়। ইনস্ট্যান্ট গিজারে প্রয়োজন মতো জল গরম করে নেওয়া যায়। রান্নাঘর বা বেসিনের পক্ষে উপযোগী।
গিজার নেওয়ার সুবিধা
• ইনস্ট্যান্ট (তাৎক্ষণিক) গিজারগুলি অবিরাম গরম জল সরবরাহ করে। তাই জল ফুরিয়ে যাওয়ার চিন্তা থাকে না। স্টোরেজ গিজারেও জল অনেকটা ধরে ও অনেকক্ষণ গরম থাকে।
• ওয়াল-মাউন্টেড মডেলগুলি খুব কম জায়গা নেয়। এই ধরনের গিজার শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির জন্য আদর্শ। শুধু একটি সুইচ অন করলেই যন্ত্রটি চালু হয়ে যায়। জল গরম হয়। গ্যাস লাইনের প্রয়োজন হয় না, তাই এটি সহজেই যে কোনও জায়গায় বসানো যায়। বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণেরও প্রয়োজন হয় না।
• আধুনিক মডেলগুলি অত্যন্ত শক্তি সাশ্রয়ী এবং কম বিদ্যুতে বেশি কাজ করে। ফলে তাপ অপচয় কম হয়।
• কোনও দহন প্রক্রিয়া না থাকায় গ্যাস লিক বা কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে না। গিজার চালু হলে কোনও কার্বনও নিঃসরণ করে না। যার ফলে এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক নয়।
• ভালো প্রযুক্তির কারণে এগুলি বেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রায়শই ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরেও চলে।
এত সুবিধাযুক্ত একটি গ্যাজেট কেনার পর তার যত্নও প্রয়োজন। বাড়ির গিজারে ঠিক কীভাবে যত্ন নিলে গিজারের আয়ু হবে দীর্ঘ? রইল কিছু তথ্য।
পাওয়ার অফ: জল গরম হয়ে গেলে গিজারের পাওয়ার অবশ্যই বন্ধ রাখুন। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। দীর্ঘক্ষণ গিজার চালিয়ে রাখলে যন্ত্র গরম হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তাপ রাখুন নিয়ন্ত্রণে: গিজারের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে রাখুন। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় বিদ্যুৎ অপচয় বেশি হয়, গিজারের ভিতরের রডে গোলযোগও দেখা দিতে পারে।
স্টেবিলাইজারের ব্যবহার: বাড়িতে যদি মাঝে মধ্যে কারেন্টের ভোল্টেজ ওঠানামা করে তবে প্রথমেই সেদিকে নজর রাখুন। প্রয়োজনে বিদ্যুতের কারিগরদের সাহায্য নিন। ভোল্টেজের সমস্যা থেকে গিজারকে রক্ষা করতে, গিজারের হিটিং এলিমেন্ট ও থার্মোস্ট্যাট বাঁচাতে সার্জ প্রোটেক্টর বা ভোল্টেজ স্টেবিলাইজার ব্যবহার করুন।
জলের ব্যবহার: অনেক বাড়িতেই জলে আয়রনের পরিমাণ বেশি হয়। কিন্তু খনিজমুক্ত জলই গিজারের জন্য বেশি উপযোগী। তাই জল গরম হয়ে গেলে গিজার থেকে সম্পূর্ণ জল বের করে দিন। এতে গিজার ভালো থাকে এবং খনিজ জমা হওয়া কমায়।
সার্ভিসিং: সারা বছরে অন্তত একবার গিজার ফ্লাশ করুন। গিজারের সেফটি ভালভ ও তার পরীক্ষা করান। পেশাদার সার্ভিসিং করানো ভালো। নিয়মিত গিজার ব্যবহার না করলেও মেশিনটি ভিতর এবং বাইরে থেকে ঠিক আছে জানা প্রয়োজন। প্রতি ৬ মাস অন্তর একজন পেশাদার ক্লিনার দিয়ে ট্যাঙ্ক এবং হিটিং ইউনিট পরিষ্কার করান। পাওয়ার কর্ড ও প্লাগ পরীক্ষা করিয়ে রাখুন। গিজারের রড, তার সঙ্গে যুক্ত কলে মাঝেমধ্যেই কাঠের হাতলযুক্ত লোহার স্ক্রু ছুঁইয়ে দেখে নিন আর্থিং-এর কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না।
ট্যাঙ্ক পরিষ্কার: বছরে একবার জলের ট্যাঙ্ক খালি করে নরম ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করুন।
সতর্কতা
গিজার পরিষ্কার বা মেরামতির আগে অবশ্যই গিজারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নেবেন। নাহলেই প্রাণের ঝুঁকি। এছাড়া, জল ও বিদ্যুৎ যেন একে অপরের সংস্পর্শে কোনওভাবেই না আসে। প্রয়োজনে পেশাদার কারিগরদের সাহায্য নিন।
কেনার আগে খেয়াল রাখুন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা ও ব্যবহারের উপর নির্ভর করে গিজার নেওয়া উচিত। ২-৩ জনের জন্য ১০-১৫ লিটার উপযুক্ত। ছোট গিজার দ্রুত গরম হয় কিন্তু ট্যাঙ্কি তাড়াতাড়ি খালি হয়। বড় গিজার বেশি সময় নেয় কিন্তু বেশি জল ধরে। এছাড়া মডেলটির ব্যুরো অব এনার্জি এফিসিয়েন্সি স্টার রেটিং দেখে নিন। বেশি স্টার মানে কম বিদ্যুৎ খরচ। যন্ত্রের ওয়াট পরীক্ষা করে নিন। কম ওয়াট মানে কম বিদ্যুৎ খরচ। তবে কম ওয়াটের গ্যাজেট গরম হতে বেশি সময় লাগতে পারে।
মডেলটিতে থার্মাল কাট অফ-এর সুবিধা আছে কি না দেখে নেবেন। এতে যন্ত্র অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। প্রেশার রিলিফ ভালভ ও অ্যান্টি-করোশন কোটিং রয়েছে কি না দেখতে হবে। দুর্ঘটনা এড়াতে চাপ বের করে দেওয়া ও ট্যাঙ্ককে মরচে পড়ার হাত থেকে এই দুই প্রযুক্তি বাঁচায়। হিটিং এলিমেন্ট ও ট্যাঙ্কের ওয়ারেন্টি দেখাও প্রয়োজন।