Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পাওয়াপুরীর জলমন্দির

প্রাচীনকালের মগধ (এখন বিহার) এমন একটি জায়গা যার উত্থান-পতনের নানা ঘটনা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে। কখনও তা পরাক্রমশালী রাজাদের শৌর্যবীর্যের কীর্তি-কাহিনি হয়ে, কখনও বা কোনও ধ্বংসাত্মক ঘটনা হিসেবে।

পাওয়াপুরীর জলমন্দির
  • ২৬ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রাচীনকালের মগধ (এখন বিহার) এমন একটি জায়গা যার উত্থান-পতনের নানা ঘটনা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে। কখনও তা পরাক্রমশালী রাজাদের শৌর্যবীর্যের কীর্তি-কাহিনি হয়ে, কখনও বা কোনও ধ্বংসাত্মক ঘটনা হিসেবে। অথচ এখানেই আবার মহাত্মার আবির্ভাবও ঘটেছে। এ যেন ঠিক, ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’-র মতোই। বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বোধগয়া হয়ে সোজা চলে এসেছি রাজগীর। কয়েকদিন ধরে এখানকার অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের খোঁজে ছুটে বেড়িয়েছি এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। সন্ধান পেয়েছি রাজা বিম্বিসার, সম্রাট অশোক, অজাতশত্রু, গৌতম বুদ্ধ, তাঁর চিকিৎসক এমনকী পৌরাণিক কাহিনির জরাসন্ধের মতো চরিত্রেরও। জানতে পেরেছি জনশ্রুতি সোনভাণ্ডারের মতো গুপ্তধনের কাহিনি। ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ে বিশিষ্ট স্থান দখল করে থাকা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা দেখে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এখান থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে চলেছি সামনের রাস্তা ধরে। কিছুটা গিয়ে দূর থেকেই দেখতে পাই এক অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত শ্বেতপাথরের মন্দির। এখানে এসে সম্পূর্ণ এক অন্য জগতের সন্ধান পেলাম। নালন্দা জেলারই অন্তর্গত পাওয়াপুরী জৈন ধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত পবিত্র জায়গা। তাঁরা এই জায়গাকে ‘আপাপুরী’-ও বলেন। যার অর্থ ‘পাপহীন নগরী’। চারদিকে জলাশয়ের মাঝে শ্বেতপাথরের সুন্দর মন্দিরটি জলমন্দির বলে পরিচিত। মন্দিরশৈলীতে জৈন স্থাপত্যের 

Advertisement

চিহ্ন সুস্পষ্ট। 
কড়া সিকিউরিটি পেরিয়ে জলমন্দিরে প্রবেশ করলাম। মন্দিরের ভিতরে চতুর্দিক ঝকঝকে, তকতকে। এমন পরিবেশে এসে স্বভাবতই মন ভালো হয়ে যায়। দিনান্তের নিভে আসা আলোয় শ্বেতপাথরের মন্দিরকে মনে হচ্ছে যেন এক কল্পলোকের স্থান। এক অদ্ভুত দ্যুতিময় আভা ফুটে উঠছে সমগ্র মন্দির চত্বর থেকে। এমন অপার্থিব পরিবেশে মনের সব হতাশা, সব গ্লানি যেন নিমেষে দূরীভূত হয়ে যায়। 
মন্দিরের একটু নিরিবিলি জায়গায় বসে স্থানীয় পুরোহিতের মুখে শুনতে থাকি বিগত দিনের কিছু কাহিনি। পণ্ডিতজি জানালেন পাওয়াপুরী একসময় মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল এবং এটি শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যকলাপের কেন্দ্রও ছিল। সম্রাট বিম্বিসার যখন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করছিলেন, তখন তাঁরই পুত্র অজাতশত্রু জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। অজাতশত্রু ছিলেন মহাবীর জৈনের একজন কট্টর অনুসারী এবং তিনি মহাবীরের বার্তা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। মনে মনে ভাবলাম দু’জনেই ‘অহিংসা’-র পূজারি হওয়া সত্ত্বেও পিতা-পুত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে আর তার বলি হতে হল সাধারণ মানুষকে। পণ্ডিতজির কাছেই শুনলাম এই মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই। গর্ভগৃহে তিনটি চরণপাদুকা রাখা আছে। মাঝেরটি ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের এবং বাকি দুটো তাঁর দুই শিষ্যের। পাওয়াপুরী সেই জায়গা যেখানে ভগবান মহাবীর নির্বাণে যাওয়ার আগে তাঁর শিষ্যদের কাছে শেষ উপদেশ দিয়েছিলেন। 
এখানেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল। জীবিত থাকাকালীনই মহাবীর একজন জীবন্ত কিংবদন্তি  হয়ে উঠেছিলেন এবং জনসাধারণের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তাই তাঁর শেষকৃত্যের পর ভক্তগণ এই স্থানের মাটি নিয়ে যান। হাজার হাজার ভক্ত মাটি নিয়ে যাওয়ার ফলে এখানে বিরাট একটি গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে বর্ষার জলে সরোবর তৈরি। পণ্ডিতজি আরও বললেন মে-জুন মাসে এই সরোবরে যখন হাজার হাজার পদ্মফুল ফোটে তখন এর প্রকৃত সৌন্দর্য বোঝা যায়। দীপাবলির রাতে অসংখ্য প্রদীপের আলোয় সেজে ওঠে এই জলমন্দির। নির্বাণ উৎসবে ভগবান মহাবীরকে প্রসাদ হিসেবে যে লাড্ডু দেওয়া হয় তা খাঁটি ঘি, বেসন এবং শুকনো ফল দিয়ে তৈরি করা হয়। সারা পৃথিবী থেকে তখন এখানে ভক্তরা আসেন। ইতিমধ্যেই রাতের আলো জ্বলে উঠেছে। তাতে এই মন্দিরকে আরও অপরূপ লাগছিল। পণ্ডিতজির কাছে গল্প শুনতে শুনতেই মন্দির বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে দেখে বাধ্য হয়ে এই মনোরম স্থান থেকে উঠে দাঁড়াতে হল। যাওয়ার আগে তিনি বললেন দীপাবলিতে মহানির্বাণ উৎসবের সময় একবার ঘুরে যেতে। ঈশ্বরই জানেন আমার সেই ইচ্ছে পূরণ হবে কি না! এ কথা ভাবতে ভাবতেই রাজগীরের হোটেলের দিকে রওনা হই।
কীভাবে যাবেন: নালন্দা থেকে পাওয়াপুরী মাত্র ২০ কিমি। পাটনাগামী যে কোনও ট্রেনে গিয়ে বখতিয়ারপুর নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে রাজগীর। একই দিনে নালন্দা ও পাওয়াপুরী ঘোরা যায়। থাকার জায়গা হিসেবে রাজগীরই ভালো, কারণ এখানে নানা মানের ও দামের হোটেল আছে।
নন্দিতা মিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ