Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ওয়াশিংটনের ‘সুন্দর’ কাহিনি

ক্রীড়াবিশ্বে এমন অনেক খেলোয়াড়ই আছেন যাঁদের নাম শুনলে একটু অবাক হতে হয়।

ওয়াশিংটনের ‘সুন্দর’  কাহিনি
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০

সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়: ক্রীড়াবিশ্বে এমন অনেক খেলোয়াড়ই আছেন যাঁদের নাম শুনলে একটু অবাক হতে হয়। ভারতীয় ক্রিকেটের তারকা অলরাউন্ডার ওয়াশিংটন সুন্দরও তেমনই এক ব্যতিক্রমী নামের অধিকারী। তামিল পরিবারে জন্ম এক ক্রিকেটারের এমন ‘পশ্চিমি’ নাম কেন! ‘ওয়াশিংটন’ নামটা কোথা থেকে এল? এই প্রশ্নের উত্তরে লুকিয়ে তাঁর বাবার হৃদয়স্পর্শী গল্প ও অনন্য শ্রদ্ধাবোধ।

Advertisement

ওয়াশিংটনের বাবা মণি সুন্দর ছোট থেকেই ক্রিকেট পাগল। স্থানীয়স্তরে ভালো ক্রিকেটার হিসেবে বেশ পরিচিতিও ছিল। কিন্তু তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। একেবারে নুন আনতে পান্তা ফুরনো অবস্থা। খেলার সামগ্রী পর্যন্ত কিনতে পারতেন না। তবুও তিনি হার মানেননি। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েই খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন কঠিন সময়ে সুন্দরের পাশে দাঁড়ান এক স্থানীয় রাজনৈতিক ও সমাজসেবী পি ডি ওয়াশিংটন। সেই শুভানুধ্যায়ী মণি সুন্দরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন। ব্যাট, বল, জুতো, জামা কিনে দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য করেন। তামিলনাড়ুর মেরিনা গ্রাউন্ডে সুন্দরের খেলাও দেখতে যেতেন। বড় ক্রিকেটার হওয়ার জন্য তাঁকে উত্সাহও জোগাতেন। সুন্দর বলছিলেন, ‘আমার ছেলেবেলাটা খুব কষ্টে কেটেছে। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তো ছিল, কিন্তু সামর্থ্য ছিল না। তখন ওয়াশিংটন স্যার আমায় সাহায্য করেছিলেন। তিনি আমার কাছে দেবতা।’ সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই প্রথম সন্তানের নাম ‘ওয়াশিংটন’ রাখেন মণি সুন্দর। যাতে সেই মহান ব্যক্তির স্মৃতি বেঁচে থাকে। আর প্রতিজ্ঞা করেন, তাঁর স্বপ্ন পূরণ করবেন এই ছেলে। ছেলেও বাবার আস্থার মর্যাদা রেখেছেন। এখন ওয়াশিংটন সুন্দর ভারতীয় ক্রিকেটে বড় নাম।
দক্ষিণ ভারতে অনেক সময় পিতার নাম ছেলের পদবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই ওয়াশিংটন তাঁর প্রথম নাম এবং পদবি সুন্দর। এমন অনন্য নামে গর্ববোধ করেন ভারতীয় অলরাউন্ডারও। এই প্রসঙ্গে তিনি এক সাক্ষাত্কারে বলছিলেন, ‘জানি, আমার নামটা একটু আলাদা। তবে এর নেপথ্য কাহিনি আমার কাছে খুব স্পেশাল। এতে বাবার আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। যিনি তাঁকে জীবনযুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন, এই নাম তাঁর প্রতি সম্মান।’ সত্যিই, ওয়াশিংটন সুন্দর নামটা শুধুই এক ক্রিকেটারের পরিচয় নয়, ধন্যবাদ জানানোর ভাষা। একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত যেখানে একজন বাবা তাঁর সন্তানের নামের মধ্যে দিয়ে জীবনের ঋণ শোধ করেছেন। সেই কারণেই ‘সুন্দরে’র ছেলের ওয়াশিংটন হয়ে ওঠার গল্পটা এত সুন্দর।
ক্রিকেটার ওয়াশিংটনের উত্থানের গল্পটাও বেশ আকর্ষক। বাবার মতো তিনিও ছোট থেকে ক্রিকেট পাগল। শুরুতে ব্যাটার হিসেবে খেললেও পরবর্তীতে স্পিন অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ডান হাতি অফ স্পিনার ও বাঁহাতি এই ব্যাটার ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্রচারের আলো কাড়েন। তাঁর শান্ত মেজাজ, নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং নির্বাচকদের নজর কা঩ড়ে। সেই সুবাদে তামিলনাড়ুর হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে সময় নেননি তিনি। রনজি, বিজয় হাজারে, মুস্তাক আলি ট্রফিতে ধারাবাহিকভাবে পারফরম্যান্স মেলে ধরে জাতীয় নির্বাচকদের চোখে পড়ে যান। তবে ওয়াশিংটনের কেরিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ২০১৭ সালে আইপিএলে। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টসে নাম লেখান। সেবারই এলিমিনিটরে দুরন্ত পারফরম্যান্সে চমক দেন। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে চার ওভার হাত ঘুরিয়ে ১৬ রানের বিনিময়ে তুলে নেন তিনটি উইকেট। পরে তিনি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এবং বর্তমানে গুজরাত টাইটান্সের হয়ে খেলছেন। টি-২০ ক্রিকেটে পাওয়ার প্লে’তে আঁটসাঁট বোলিংয়ে অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অনন্য বানিয়েছে। জাতীয় দলে জায়গা পেতেও বিলম্ব হয়নি। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ওডিআই সিরিজে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অভিষেক হয় ওয়াশিংটনের। সেবছরই শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-২০’তে প্রথম ম্যাচ খেলেন। তবে ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে টেস্ট অভিষেকে ব্রিসবেনের ম্যাচ তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
গাব্বাতে গত ৩৪ বছরে কখনও হারেনি অস্ট্রেলিয়া। আর সেবার বর্ডার-গাভাসকর ট্রফির নির্ণায়ক ম্যাচ ছিল ব্রিসবেনেই। তারপর আবার চোট-আঘাতে ভারতীয় টিম মিনি হাসপাতালে পরিণত হয়েছিল। বিরাট কোহলি দেশে ফিরে গিয়েছেন। যশপ্রীত বুমরাহ, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, হনুমা বিহারীরা চোটের কারণে বেঞ্চে। এমন পরিস্থিতিতে অভিষেক হয় ওয়াশিংটনের। আর প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ৩৬৯-এর জবাবে ১৮৬ রানে ৬ উইকেট খুইয়ে রীতিমতো ধুঁকছিল ভারত। অনুরাগীরা তখন ভেবেই নিয়েছিলেন টিম ইন্ডিয়ার হার অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু ‘ওয়াশিংটন সুন্দরের ইস্পাত কঠিন মানসিকতার সম্পর্কে ধারণা ছিল না। কঠিন সময়ে ৬২ রানের ধ্রুপদী ইনিংস খেলে ভারতীয় দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছিলেন ওয়াশিংটন। সপ্তম উইকেটে শার্দূল ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ১২৩ রানের জুটিই ভারতকে অক্সিজেন জুগিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বল হাতেও প্রথম ইনিংসে তুলে নিয়েছিলেন তিনটি উইকেট। আর শেষ পর্যন্ত গাব্বায় অস্ট্রেলিয়ার দর্প চূর্ণ করে অবিস্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নেয় ভারত। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টানা দু’বার টেস্ট সিরিজ জয়ের নজিরও গড়ে অজিঙ্কা রাহানের দল। দেশে ফিরে এসে ওয়াশিংটন তাঁর পোষ্যের নাম রেখেছিলেন ‘গাব্বা’। যা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়ায় কম চর্চা হয়নি। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের টেস্ট সিরিজ ড্রয়েরও অন্যতম কাণ্ডারী ওয়াশিংটন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে তাঁর দুরন্ত শতরান হাঁকিয়ে ভারতের হার বাঁচানো সিরিজের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। বল হাতেও ইংরেজ ব্যাটারদের তুর্কি নাচন নাচিয়েছেন। চোটের কারণে একাধিকবার তাঁর কেরিয়ার থমকে গিয়েছে। তবে তিনি হার মানার পাত্র নন। প্রতিবারই আরও ক্ষুরধার হয়ে ফিরে এসেছেন। ওয়াশিংটন খুবই আত্মবিশ্বাসী ও বুদ্ধিমান ক্রিকেটার। নাম যেমন ব্যতিক্রমী, খেলোয়াড়ও তেমন অনন্য ওয়াশিংটন। সুনীল গাভাসকর, রবি শাস্ত্রীরা তো এই তরুণ অলরাউন্ডারকে ভবিষ্যতে রবীন্দ্র জাদেজার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন।

সম্পর্কিত সংবাদ