


মৃণালকান্তি দাস:রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ওয়াগ দ্য ডগ’বা ‘ডাইভারশনরি থিওরি অব ওয়ার’হল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এক অতি পরিচিত ও ভয়ংকর হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের শাসক অভ্যন্তরীণ সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো কেলেঙ্কারির চাপে নাজেহাল হয়ে পড়েন, একেবারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তিনি জনরোষ থেকে বাঁচতে বিদেশের মাটিতে এক কৃত্রিম ‘শত্রু’খাড়া করেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখলে সে কথাই মনে পড়ে! যৌন কেলেঙ্কারি থেকে মুখ ঘোরাতে একদিকে দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্ল্যাকমেল করে চলেছেন। আর এই গোটা প্লটের কেন্দ্রে রয়েছে একটাই নাম— কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইন!
সম্প্রতি আমেরিকার বিচার দপ্তর এপস্টাইন ফাইলের ৩০ লক্ষ পাতা প্রকাশ্যে এনেছে। তার মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ভিডিয়ো। ১ লক্ষ ৮০ হাজার ছবি। সেই ফাইলের ছত্রে ছত্রে রয়েছে নানা গল্প। অনেক ভুক্তভোগী, নির্যাতিতার কাহিনি। কীভাবে তাঁরা প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়তেন, তার বিস্তারিত বয়ান রয়েছে ওই ফাইলে। আদালতের নির্দেশে সেই ফাইল খোলা শুরু হতেই কাঁপুনি ধরে গিয়েছে আমেরিকা সহ গোটা দুনিয়ার ‘উচ্চ মহলে’। এপস্টাইনের নথি প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে বিশ্বের তাবড় ব্যক্তিত্বের চরিত্রের নিকষ কালো দিক। সেই তালিকায় কার নাম নেই! ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন থেকে স্টিফেন হকিং, মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ল্যারি পেজ, ইলন মাস্ক...। এপস্টাইনের নথি অনুযায়ী, এঁরা প্রত্যেকেই তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় যৌনাচারে যুক্ত ছিলেন।
এপস্টাইন কেলেঙ্কারি এখন আমেরিকার অভিজাত শ্রেণির বিস্তৃত অংশকে জড়িয়ে ফেলেছে। জেফ্রি এপস্টাইনের পরিচয় শুধু একজন ভয়ংকর যৌন অপরাধী হিসেবেই নয়, তিনি এ কালের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও প্রভাবের অন্ধকার জগতের প্রতীকও হয়ে উঠেছেন। সদ্য প্রকাশিত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি এই অন্ধকারকে আরও গভীর করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন ছাড়াও অনেক বিলিয়নিয়ার ও রাজপরিবারের সদস্যের সঙ্গে এপস্টাইনের সম্পর্কের বিষয়টি আগেই নথিভুক্ত হয়েছে। তবে সদ্য প্রকাশিত নতুন নথিপত্র ইজরায়েলের রাজনৈতিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে তাঁর অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন করে রহস্য তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।
এপস্টাইনের নথি জানাচ্ছে, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এহুদ বারাক ও তাঁর স্ত্রী নিলি প্রিয়েল একাধিকবার নিউ ইয়র্কে এপস্টাইনের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে থেকেছেন। এহুদ বারাক ২০০৩ সাল থেকে এপস্টাইনকে চেনেন বলে স্বীকার করেছেন। এমনকি ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে এপস্টাইন দণ্ডিত হওয়ার পরও
তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা বারবার অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এপস্টাইনের সঙ্গে ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর এত ঘনিষ্ঠতার কারণ কী? ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে সম্পর্কই কি তাঁর অপরাধ বহুদিন আড়াল করে রেখেছিল?
১৯ অক্টোবর, ২০২০ সালের একটি এফবিআই রিপোর্টে বিস্ফোরক তথ্য পাওয়া গিয়েছে। মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব নিয়ে তদন্তের সময় তৈরি করা ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এপস্টাইন ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন এবং ধারণা করা হয় মোসাদের একজন নিয়োগ করা এজেন্টও ছিলেন। এপস্টাইন ও বারাকের মধ্যে ইমেল চালাচালিতেও মোসাদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এফবিআই নথি থেকে জানা যায়, বারাকের অধীনেই গোয়েন্দা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এপস্টাইন। এপস্টাইনের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক অন্য সব প্রভাবশালীর তুলনায় আলাদা। কয়েক দশকের ধারাবাহিক সম্পর্ক। যদিও কোনো আদালত এখনও প্রমাণ করতে পারেনি, এপস্টাইন ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেছেন। তবে নথিপত্র, ইমেলের স্তূপ একটি সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিত করে— এপস্টাইন ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সুরক্ষিত বলয়ের ভিতরে ছিলেন। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এপস্টাইন কি তবে মোসাদের হয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেল করার রসদ জোগাতেন?
এফবিআইয়ের নথিতে হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক অ্যালান ডারশোভিটজের সঙ্গে এপস্টাইনের একাধিক ফোনালাপের বিবরণ রয়েছে। সেখানে এপস্টাইনের সঙ্গে কথা বলার পরই বিস্তারিত জানার জন্য ডারশোভিটজের কাছে মোসাদের ফোন আসত। গোটা বিষয়টি ছিল একটি গোয়েন্দা অপারেশনের অংশ। ডারশোভিটজ নিজেই একসময় বলেছিলেন, বয়স কম হলে তিনি মোসাদে যোগ দিতেন। এফবিআইয়ের সেই গোপন নথিতে লেখা রয়েছে, ডারশোভিটজকে মোসাদ তাদের মিশনে ‘নিযুক্ত’করেছিল। এপস্টাইন ছিলেন মোসাদের ‘কো-অপ্টেড এজেন্ট’। এপস্টাইন ইজরায়েলকে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই নয়, বরং ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও দেখতেন। যেমন— এপস্টাইন ২০১৭-র ৯ জুলাই একটি ইমেলে লিখেছিলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পরামর্শ নিয়েই ৪-৬ জুলাই ইজরায়েল সফরে গিয়েছিলেন। যদিও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এসব ‘ভিত্তিহীন গুজব’বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে, বিরোধীদের দাবি,‘একদিকে নরেন্দ্র মোদির আর্থিক কাঠামো, অন্যদিকে তাঁর ভাবমূর্তি, এই দুই চাপে প্রধানমন্ত্রী আতঙ্কিত। যারা ওঁর ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল, তারাই এখন সেই ভাবমূর্তি ভাঙতে শুরু করেছে।’
২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া ওই যৌন অপরাধীর কথোপকথনের টুকরো তথ্য আজ নতুন করে একটি বড়ো প্রশ্ন সামনে আনছে। জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে কি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল? এটা ঠিক, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত লাখ লাখ নথিতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমন কিছু নেই, যা দেখিয়ে বলা যাবে— এপস্টাইন নিয়মিত সিআইএ, এমআই সিক্স বা মোসাদের দপ্তরে যেতেন। আসলে এপস্টাইনের সেই প্রয়োজনও ছিল না। প্রাক্তন ও বর্তমান রাষ্ট্রদূত, বিশ্বনেতা ও ধনকুবেররাই তাঁর কাছে যেতেন। ক্যারিবীয় অঞ্চলে এপস্টাইনের ব্যক্তিগত যে দ্বীপে অল্প বয়সি মেয়েদের পাচার করে যৌন নিপীড়ন চালানো হতো, সেখানেই গড়ে উঠেছিল এক অভিজাত, অদৃশ্য ও ক্ষমতাবান নেটওয়ার্ক।
তবে এপস্টাইনের গোয়েন্দা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক যোগাযোগের ইতিহাস আরও আগের। এই সংযোগের প্রথম সূত্র পাওয়া যায় ডোনাল্ড বারের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ওএসএসের সদস্য ছিলেন ডোনাল্ড বার। অবসরে অশ্লীল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখতেন। ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তিনিই এপস্টাইনকে নিউ ইয়র্কের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। তাঁর ছেলে বিল বার তখন সিআইএতে কর্মরত। বিল বার পরে রেগান ও জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল হন। ১৯৭৬ সালে ডাল্টন স্কুল ছাড়ার পর এপস্টাইন যোগ দেন বেয়ার স্টার্নস বিনিয়োগ ব্যাংকে। তাঁর প্রকৃত উত্থান শুরু হয় ১৯৮১ সালে, ব্রিটেনের এক সফরে। সেখানে তিনি পরিচিত হন ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবসায়ী ডগলাস লিসের সঙ্গে। এই লিসই তাঁকে ইজরায়েলি ব্যবসায়ী রবার্ট ম্যাক্সওয়েল এবং সৌদি অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
লিস ছিলেন সৌদি আরবের কাছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান বিক্রির ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্যস্থতাকারী। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, ডগলাস লিস এপস্টাইনকে অভিজাত বৈঠকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং এক অভিজাত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেন। এই সময়েই ঘটে ইরান কনট্রা কেলেঙ্কারি। জানা যায়, রেগান প্রশাসন গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে এবং সেই অর্থ নিকারাগুয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির সহায়তায় ব্যবহার করা হয়। এই গোটা লেনদেনে ইজরায়েল ছিল গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী। এই পর্বে এপস্টাইন যুক্ত হন প্রাক্তন মার্কিন বিচার বিভাগীয় কর্তা জে স্ট্যানলি পটিঞ্জারের সঙ্গে। ইরানে অস্ত্র সরবরাহসংক্রান্ত নানা তৎপরতায় তাঁরা জড়িত ছিল। এই সময় সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি হয়ে ওঠেন এপস্টাইনের অন্যতম বড়ো ক্লায়েন্ট। এপস্টাইনের নিউ ইয়র্কের বাসভবন থেকে একটি ভুয়ো অস্ট্রিয়ান পাসপোর্ট উদ্ধার হয়, যেখানে তাঁর ঠিকানা হিসেবে সৌদি আরবের নাম লেখা ছিল।
এপস্টাইনের জীবনে সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আসে ম্যাক্সওয়েল পরিবারের মাধ্যমে। এপস্টাইনের সঙ্গিনী গিসলেন ছিলেন রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মেয়ে। রবার্ট একসময়ের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম মালিক। ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা অফিসারও। ইরানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নিজের ইয়ট থেকে পড়ে রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এর কিছুদিন আগেই গিসলেনের সঙ্গে এপস্টাইনের পরিচয় ঘটে। একটি ইমেলে এপস্টাইন দাবি করেন, রবার্ট মোসাদের হয়ে কাজ করতেন এবং অর্থ না দিলে তিনি গোপন তথ্য ফাঁসের হুমকি দিয়েছিলেন। এপস্টাইনের জীবনের আরেক কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন মার্কিন ধনকুবের লেস ওয়েক্সনার। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটসহ একাধিক বড়ো ব্র্যান্ডের মালিক এই ব্যবসায়ীর প্রায় গোটা সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিল এপস্টাইনের হাতে। তথ্য বলছে, ইরান কনট্রা কেলেঙ্কারিতে ব্যবহৃত কিছু বিমান পরে ওয়েক্সনারের পোশাক পরিবহণে ব্যবহার করা হয়। শিশু পাচারের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পরও এপস্টাইনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থেমে থাকেনি। তিনি ইজরায়েল ও মঙ্গোলিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে
কাজ করেন। এহুদ বারাকের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করেন। এমনকি রাশিয়ার সঙ্গেও গোপন যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন।
এত গোপন তথ্য পাওয়ার পরও আসল রহস্যের জট খোলেনি— জেফ্রি এপস্টাইন কীভাবে নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে বিশ্বরাজনীতির বড়ো বড়ো শক্তি ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। কেন রাষ্ট্র, ধনকুবের আর ক্ষমতাশালীরা ভাবলেন— এই এপস্টাইনকে ছাড়া কাজ চলবে না? নাকি গোটা ঘটনাটাই আসলে মোসাদের খেলা!