ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: একটা সময় ছিল, যখন দার্জিলিং শহরের হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনে চাইলেই দেখা মিলত কাঞ্চনজঙ্ঘার। সূর্যের আলোর ছটা ঠিকরে বেরচ্ছে শায়িত বুদ্ধর গোটা শরীর থেকে। এখন অবশ্য শহরের মধ্যে ম্যাল রোডের কাছে কোনো হোটেলে থাকলে, একেবারে টপ ফ্লোরে না গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই অপরূপ শোভা আর নজরে পড়ে না। সকালবেলা কফির মাগ হাতে হোটেলের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে চোখের সামনে রাস্তার উলটোদিকের হোটেলের ব্যালকনি। হয় সেখানে বসে কেউ চা খাচ্ছেন, নয়তো বারান্দার উপর সাজানো রঙিন সব আলোর রোশনাই, যেগুলো রাতে জ্বলে ওঠার পর সকালে আর বন্ধ করা হয়নি। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা নেই। অবশ্যই এর পিছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ আপনার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই হোটেলটা। বিলাসী পর্যটনপ্রেমী মানুষকে উপহার দিতে গিয়ে মনোরম শৈলশহর হয়ে উঠেছে ঘিঞ্জি উপনগরি। হারিয়ে গিয়েছে দার্জিলিংয়ের প্রাচীন ঐতিহ্য, তার টান। অনেকে বলবেন, শুধু দার্জিলিং কেন, উন্নয়নকে যদি আহ্বান করতে হয়, তাহলে ঐতিহ্যকে তো একটু মাথা নিচু করতেই হবে। তা না হলে, কোনো এক জায়গা বছরের পর বছর একইরকম থেকে যায়। পর্যটকের আকর্ষণ বাড়বে কীভাবে? আর সেই আকর্ষণ না বাড়লে, থাকা-খাওয়া, মনোরঞ্জনের সুযোগ না বাড়লে মানুষ সেই জায়গাকে একইভাবে বেছে নেবে কেন? নতুনকেই তো আমরা বার বার কাছে পেতে চাই, তাকে দেখতে চাই।
দার্জিলিংয়ের মতোই দেশের নানা প্রান্তের হিল ডেস্টিনেশনের একই দশা। দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে হয়তো সেখানে মানুষ ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে হারিয়ে গিয়েছে ঐতিহ্য, হারিয়ে গিয়েছে সেখানকার সবুজে ঘেরা প্রকৃতি। পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে, একের পর হোটেল, রাস্তা। পর্যটকরা যাতে সেখানে গিয়ে নতুন কিছুর অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। অথচ প্রকৃতিকে কৃত্রিম আভিজাত্যের গেরোয় ধ্বংস করার ফলে সে হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ। গত বছর তিনেক ধরে সিকিমের হাল সেরকমই। নগরায়ণের কোপে পাহাড়ের শক্ত পাথর হয়ে গিয়েছে ক্ষয়িষ্ণু। বর্ষার মরশুম এলেই তিস্তার ঝাপটায় ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে পাহাড়ি রাস্তা, ঘরবাড়ি, সেতু। প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্যকে মুছে দিয়ে যেখানে যেখানে মানুষ নগর সভ্যতাকে আহ্বান জানিয়েছে, সেখানে গোটা সভ্যতাকেই যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে পাহাড়, জঙ্গল, নদী, ঝরনা।
তাহলে কি হিলস্টেশনে মানুষ বেড়াতে যাবে না? প্রকৃতিকে বাঁচাতে তা শুধুই কি সংরক্ষণ করা জরুরি। এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে তাকে তার মতোই তো থাকতে দিতে হবে। যদিও পর্যটন, আর পরিবেশ দু’টিকেই রক্ষা করতে হলে গোয়া সরকার যে পন্থা অবলম্বন করেছে, সেটায় অনেকটা হলেও সুরাহা মিলবে। কী করেছে গোয়া সরকার?
মান্ডভি ও জুয়ারি নদী তীরবর্তী ৮২ লক্ষ বর্গমিটার জমিকে তারা ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ বলে ঘোষণা করেছে। মাজোরদা, গোনসুয়া থেকে শুরু করে ওই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সংরক্ষণ করা হবে প্রকৃতিকে। নিয়মবহির্ভূত নির্মাণকাজ, অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন সেখানে চলবে না। জীববৈচিত্রের সামঞ্জস্য রক্ষার স্বার্থেই সে রাজ্যের সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। নগরায়ণ মানেই তো উন্নয়ন। তাই নদীঘেরা ওই বিশাল এলাকায় কোনো উন্নয়ন আর করা যাবে না। সেটি যেমন আছে, সেরকমই থাকবে। প্রকৃতি আর তার সম্পদ সেখানে নিজের মতোই বিচরণ করবে। ওই বিস্তীর্ণ এলাকার পাহাড়, উপত্যকা, উপকূল আর তা ঘিরে থাকা গাছ-গাছালি আর পাখ-পাখালিকে বাঁচাতে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে নাগরিক মহল থেকে পরিবেশবিদ সকলেই স্বাগত জানিয়েছেন। পর্যটকপ্রিয় গোয়ার মতো রাজ্যও যে জীবসম্পদের জন্য এহেন কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে তা গোটা দেশের কাছে এক ঐতিহাসিক উদাহরণ।
আসলে উন্নয়ন যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক হয়, তাহলে সরকারকে এহেন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। তবে গোয়া হোক বা দার্জিলিং, সিকিম হোক বা কাশ্মীর দেশের নানা প্রান্তে পর্যটন শিল্পের ধুয়ো তুলে দেদারে তৈরি হচ্ছে হোটেল, রিসর্ট। আর সেখানে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে রাস্তা। সবটাই পাহাড় এবং জঙ্গল সাফ করে। কারণ পর্যটকদের নতুনকিছু দিতে হবে। এই জন্যই এখন একটি ডেস্টিনেশন খুব টানে — ‘অফবিট’। অনেককেই বলতে শুনবেন আমি অফবিট ছাড়া যাই না। আসলে, যেকোনো বেড়ানোর জায়গাতেই মূল অংশটিতে পর্যটকের আনাগোনা বেশি। তাই একটু নিভৃতে সময় কাটাতে হলে বেছে নিতে হবে নির্জন জায়গা। পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝে ছোটো একটি কটেজ। সেখানে ভিড় কম। তাই কোলাহলও কম। কিন্তু সেই যে নির্জন জায়গা আমরা বেছে নিচ্ছি, গভীরে ভাবলে বুঝবেন সেটি আপনাদের পৌঁছানোর এবং তারপর থাকার উপযুক্ত করে তোলার জন্য কোপ পড়েছে প্রকতির উপর। পাহাড়ের অফবিটে পাথর কেটে তৈরি হয়েছে রাস্তা। আর ঘন জঙ্গল কেটে তৈরি হয়েছে কটেজ। তাই সেগুলি করতে যে খরচ তা বিত্তশালী পর্যটকদের কাছ থেকে সেইসব হোটেল, কটেজ, রিসর্ট মালিকরা তুলে নেন। আর র্পটকদেরও কোনো সমস্যা হয় না। কারণ তাঁরা জানেন যেখানে ভিড় কম, আর সব মানুষ যায় না, সেখানে গিয়ে তাঁরা নয়া অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন। এইভাবেই উন্নয়নের গেরোয় প্রকৃতির উপর যে কোপ তা আমাদের ভাবনার অন্তরায় হিসাবেই থেকে যায়।
পাহাড় বা জঙ্গলের মতোই প্রকৃতির আর এক সম্পদ সমুদ্র। কিন্তু ভয়াল ভয়ঙ্কর সমুদ্রের সেই দাপটকেও তুচ্ছ করে দিতে পিছপা হয়নি মানুষ। উত্তাল ঢেউকে সহজলভ্য করতে সেখানে পড়েছে বোল্ডার। সমুদ্রতীরবর্তী ঝাউবন কেটে তৈরি হয়েছে হোটেল, রিসর্ট, মন্দির, পার্ক। হয়তো অনেক পরে সরকারের টনক নড়ায় সমুদ্র তীরবর্তী পার্ককে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, জঙ্গল কেটে সমুদ্রতটকে পার্ক বানানোর পরিকল্পনা পরিণতি পাওয়ার আগেই আটকানো হল না কেন? আসলে সবটাই ওই অফবিট-এর খেলা। দীঘায় এসে সমুদ্র আর কত মানুষ দেখবেন। আর আকর্ষণ কমতে থাকলে তো ব্যবসার ক্ষতি। তাই নতুন কোনো ডেস্টিনেশন বানিয়ে দেওয়া হোক। যা দেখার জন্য সবাই ছুটে আসবে। আর তা ঘিরে তৈরি হবে বড়ো বড়ো হোটেল, রিসর্ট। দেশের যেকোনো বিচ ডেস্টিনেশনে গেলেই আমরা দেখি, সমুদ্রতটে বসে গিয়েছে অজস্র পসরা। একেবারে বাঁধা দোকান বানিয়ে চলছে খাবার-দাবার থেকে শুরু করে সবরকমের সরঞ্জাম। তার জন্য খোদ সমুদ্রের গতিই যদি আটকে দিতে হয়, তাতেও পরোয়া নেহি। আর সেইসঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দূষণ। খাবার খেয়ে সেই প্যাকেট বোল্ডারের খাঁজেই ফেলে দিচ্ছেন পর্যটকদের কেউ কেউ। পরে তা আবার গিয়ে মিশছে সমুদ্রে। তাই গোয়ার মতোই কঠোর পদক্ষেপ হয়তো জরুরি। যেখানে প্রকৃতিকে তার মতোই থাকতে দিতে হবে। একেবারে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’। তাতে কিছু শ্রেণির অবাধ্য পর্যটককেও আটকানো যাবে। যাঁরা দীঘার উদয়পুর বিচকে গোয়ার বাগা বা অঞ্জুনা ভেবে ফেলে সৈকতের উপরই ভাড়া করা সাউন্ড বক্স বাজিয়ে ডিস্কো থেকের আমেজ নিচ্ছেন। আর সেই নিজেদের বানানো ডিস্কোয় নাচের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকের গ্লাসে করে মদ্যপান করে তা ছুড়ে ফেলছেন সমুদ্রের জলে। এটা ভুলে যাচ্ছেন যে, মনোরম সৈকতকে নোংরা করে আপনারা সস্তার আনন্দকে আগলাচ্ছেন। আপনাদের ফেলে দেওয়া সেই বর্জ্য সমুদ্রের জলকে দূষিত তো করছেই, একইসঙ্গে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফিরে এসে উলটে দীঘারই নানা সৈকতকে বর্জ্যাগারে পরিণত করছে। হয়তো এই ধরনের ‘অজ্ঞানতা’কে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ করেই রোখা সম্ভব।
পর্যটক টানতে আমরা ঐতিহ্যকেই ভুলে যেতে বসেছি। এই প্রসঙ্গে বাঙালির খুব প্রিয় এক জায়গার কথা না বললেই নয়। বেনারস। যে বেনারস সেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় থেকে আজও বাঙালিদের কাছে বাবা বিশ্বনাথের থান হিসাবে মণিকোঠায় জায়গায় করে আছে। বিশ্বনাথের মন্দির, বেনারসের বাঙালি টোলা, বাড়ির গা দিয়ে অন্ধকার সর্পিল সব গলি আর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ষাঁড়ের দল। গঙ্গার ঘাটে গেলে সাধুদের আনাগোনা আর সংকটমোচনে বাঁদরের কিচকিচি। বাঙালির মননে তো ঠাঁই পেয়েছে এই বেনারস। কিন্তু উন্নয়নের কোপে কাশী বিশ্বনাথের সেই আমেজও আজ যেন স্মৃতির অতলেই চলে গিয়েছে। মন্দির পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পুরানো সেই বাবা বিশ্বনাথের থান এখন বিশাল বড়ো কমপ্লেক্স। বছর পঁচিশেক আগেও যেখানে আপামর সাধারণ মানুষ শিবলিঙ্গকে ছুঁয়ে প্রণাম করতে পারতেন, আজ সেখানে নিরাপত্তার বজ্রআঁটুনি। খাঁচাবন্দি শিবের মাথায় শ্রদ্ধালু জল বা দুধ ঢালতে হবে বাইরে থেকেই। আর ভক্তদের আনাগোনার জন্য ধাঁধার ব্যারিকেড। আমার-আপনার বাবা বিশ্বনাথের মন্দির আজ যেন ঝাঁ চকচকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান! হয়েছে আকর্ষণীয় মন্দির কমপ্লেক্স। তার জেরে দশাশ্বমেধ ঘাটে সাধুদের চিহ্নই প্রায় মেলে না। সরু গলি থাকলেও সেখানে ষাঁড়ের বিচরণ নেই। আশ্চর্যের বিষয় সংকটমোচন মন্দিরে ঢুকলে সেখানে বাঁদরের দল এসে আপনার হাত থেকে প্রসাদি ডালা বা ব্যাগ ধরে টানাটানিও করে না। আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে মন্দির ও তার সংলগ্ন এলাকা। হয়তো হারিয়ে গিয়েছে সেই বেনারস। হারিয়ে গিয়েছে গঙ্গার ঘাটের প্রাচীনতা।
মন্দির হোক বা সমুদ্র, পাহাড় হোক বা জঙ্গল। প্রকৃতি আর সাবেকিয়ানাকে রক্ষা করতে হলে উন্নয়ন হতে হবে পরিশীলিত, পরিকল্পিত। তার পরিধি বিস্তীর্ণ আর লাগামছাড়া না হয়ে একটা সীমারেখা তো জরুরি। সেটাই করে দেখিয়েছে গোয়ার বনদপ্তর। এইটাই হয়তো গোটা দেশের কাছে একটা শিক্ষা। আগামী দিনে পর্যটনশিল্পকে বাহবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির নিজস্বতাকেও বাহবা দিতে হবে। তখনই তা হবে সর্বমঙ্গলময়।