হিমাংশু সিংহ: অকুস্থল শীতলকুচি। মুর্হুমুর্হু ছুটে আসছে ডিম। লক্ষ্য কোলিয়ারি এলাকা থেকে উঠে আসা ৪২ বছরের এক লড়াকু মহিলা নেত্রীর গাড়ি। ‘ভয় আউট আর ভরসা ইন’-এর রাজ্যে এক বাম মহিলা যুবনেত্রীর গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ডিমের কুসুমে মাখামাখি। কাচ তুলে গাড়ির মধ্যে বসে ফেসবুক লাইভে নেত্রী প্রশ্ন করছেন তাঁর দোষটা কী? ‘কী অপরাধ করেছি’। তিনি দল বদলাননি, কারও সঙ্গে দেখা করতে নবান্নেও যাননি উন্নয়নের স্বার্থে, এই অপরাধ! পুলিশ কিন্তু আক্রমণকারী গুন্ডাদের ধরছে না, সরিয়েও দিচ্ছে না। তাঁর বেশভূষা, চটি, সফেদ ওড়নায় কোথাও মনে হচ্ছে না গত দেড়দশকে কাটমানি খেয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন, তোলাবাজি কিংবা সিন্ডিকেটের অংশ। এ তো আমার আপনার পাশের বাড়ির আটপৌরে সদস্য। ভোটের আগে হাইভোল্টেজ প্রচারে শুভেন্দু অধিকারী কিংবা শমীকবাবুরাও কোনো গুরুতর অভিযোগ করেননি তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর ৭০টা বাড়ি, বেআইনি প্রমোটারি, দেদার সম্পত্তি, দামি দশটা বিলাসবহুল গাড়ি, লক্ষাধিক টাকার খান দশেক বিদেশি ব্যাগ আছে বলেও খবর নেই বাজারে। তাহলে বাম নেত্রীর অপরাধটা কী? অমিত শাহ ভোটের আগে যে গুন্ডাদের উলটো করে ঝুলিয়ে সবক শেখানোর কথা বলেছিলেন, সেই দলে মীনাক্ষী কোনোভাবেই পড়েন না। তাহলে মাত্র দু’মাস পেরতে না পেরতেই
অনেক অপরাধীকেই খোলাছুট দিয়ে মীনাক্ষীর উপর হামলা কেন? আইনরক্ষক পুলিশ হাজির থেকেও নির্বিকার দর্শক। অভিযোগ জানাতে হলে যেতে হবে এসপির অফিসে। এই পরিবর্তন চেয়েছিল বাংলা! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর গেরুয়া পার্টির দিকে আঙুল উঠলে শমীক ভট্টাচার্য বলবেন এসবই ৪ মে দুপুর বারোটার পর গেরুয়া সাজা অতি উৎসাহীদের
কাজ? শুরুতে দু’চারবার এই ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু আড়াই মাস কেটে যাওয়ার পরও একই সাফাই কতদিন চলবে? এর উত্তরও কিন্তু মানুষ আজ নয় কাল চাইবেই। কেন চাইবে? আলিপুরদুয়ারে নির্বাচনি সভায় তৃণমূলের এক নেতাকে পাচারকারী বলে আক্রমণ শানিয়েছিল বিজেপি। তিনিই দু’দিন আগে ফুল বদলে পদ্মে আশ্রয় নিয়ে রাজ্যসভার গেরুয়া এমপি হতে চলেছেন। এখন সুকান্তবাবুরা কার বিচার করবেন!
আমাদের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো পরিহাস হচ্ছে ক্ষমতায় যে দলই থাকুক পুলিশের ‘দলদাস’
বিশেষণ ঘোচে না। ব্যবসায়ী মানেই যেমন ধনী, নেতাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতিপরায়ণ, বেইমান খেতাবের বাইরে বিকল্প সম্বোধন জোটে কালেভদ্রে। একই দোষে দুষ্ট বিবদমান দুই দলের নেতারা একে অপরকে বেমালুম চোর, মিথ্যাবাদী, দেশবিরোধী বলে গাল দেন। যাঁর শক্তি বেশি, মায় ক্ষমতাসীন তাঁর বক্তব্য ভয়ে ভক্তিতে সাময়িকভাবে মানতে বাধ্য হয় অসহায় জনগণ। দলবদলও সর্বদা ঝুঁকে থাকে শাসকেরই অনুকূলে। জমানা বদলালে আবার যে কে সেই, এই থোড় বড়ি খাড়ার জমানায় সাধারণ মানুষের দিনবদল স্রেফ কথার কথা।
ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর কেটে গিয়েছে প্রায় ৯ সপ্তাহ। তৃণমূলের বড়ো নেতারা মায় নির্বাচিত এমএলএ, এমপিরা যাঁরা পদ্মমুখী আর ডিম খাচ্ছেন না। রাঘববোয়ালরা নিরাপদ সেটিংয়ের সৌজন্যে দিল্লি থেকে কলকাতা দিব্যি শাসকের ঘরে পা তুলে বসে মজা নিচ্ছেন। ডিম আক্রমণের কেন্দ্রে ছুটকো পাড়ার নেতা থেকে গিরিগিটির মতো রং বদল না করা দাবাং মীনাক্ষীরা। এরা হাজার কোটির সম্পত্তি বানাননি, গোরু কয়লা মানুষ পাচারের সঙ্গেও জড়িত নন। আসলে বড়ো দ্রুত বদলে যায় রাজনৈতিক দলের রং। এই সেদিনও যাঁরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছিলেন, তাঁরা এই কদিনেই শাসকের আইন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যস্ত। বারুইপুরের এনকাউন্টার দিয়েই যার শুরু। ভোটের আগে লক্ষ্য ছিল তৃণমূলকে হারানো, আর এখন টার্গেট বিধানসভা ও সংসদে তৃণমূলীদের পোশাক বদলে দিয়ে বাংলাকে বিরোধীশূন্য করা! সেদিন ছিল আবেদন আর আজ কথায় কথায় কড়া ধমক, রক্তচক্ষু। দু’মাসেই শাসক কত বদলে যায়!
তারাতলায় যেমন পুলিশ ও প্রশাসনের গাফিলতি সামনে এসেছে, তেমনি বারুইপুরেও। পুলিশ এধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার করে শাস্তি দেবে এটাই কাম্য। পুলিশ যাই সাফাই দিক, মধ্যরাতে পানাপুকুরের ধারে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় আত্মরক্ষার্থে এনকাউন্টার! সাক্ষী পর্যন্ত রাখা হয়নি, ঘটনার ভিডিয়োগ্রাফির ব্যবস্থাও ছিল না। হাতে গরম বিচারের পক্ষে একদল দাঁড়ালেও অভিযুক্তকে এভাবে খতমের রীতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কতদূর সমর্থনযোগ্য তা নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। এরকম চললে কোর্টকাছারির প্রয়োজনই তো ফুরবে! তর্কের খাতিরে যদি মেনেওনি যে, প্রভাস মণ্ডল সেই রাতে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে এক রাউন্ড গুলি করতেই আর কিছু করার ছিল না। সেক্ষেত্রে বাহিনীর দক্ষতা নিয়েই সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। অভিযুক্ত যে গুলি ছুড়েছিল তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কোথায় গেল, তার হিসাব দেবে কে? ভোটের আগেই পুষ্পা দমনে উত্তরপ্রদেশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট অজয় পাল শর্মাকে এরাজ্যে এনেছিল নির্বাচন কমিশন। কমিশনের সৌজন্যে তখন থেকেই বাংলাকে ‘ইউপি টু’ করার প্রস্তুতি টের পাওয়া যাচ্ছিল। গত ৯ বছরে যোগী রাজ্যে ১৭ হাজার এনকাউন্টারে প্রায় ৩০০ সমাজবিরোধীকে (পড়ুন বিরোধী গুন্ডা!) নিকেশ করা হয়েছে। কিন্তু অপরাধ, ধর্ষণ, খুনখারাপি কি সেখানে বন্ধ হয়েছে চিরতরে, কী বলছে এনসিআরবি’র রিপোর্ট? হাতরাস, উন্নাও বাংলার কোনো জনপদের নাম নয়! রোজ মিডিয়ায় অপরাধের শীর্ষে যোগীরাজ্য!
এরাজ্যে গুন্ডা দমনে নয়া আইন পাশ হয়েছে বিধানসভায়। কাল থেকে তা কার্যকর হবে। এরপর থেকে ধর্ষণে অভিযুক্তকে ‘এবেলা জমা, ওবেলা খালাস’ ফরমুলায় খতম করে দেওয়ার রীতিই কি প্রতিষ্ঠিত হবে? না গুন্ডা দমনের নামে বেছে বেছে প্রতিবাদীদের জেলে পোরা হবে? প্রশ্ন অনেক, উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু গত ৯ সপ্তাহে গরিব খেটেখাওয়া মানুষের দিনবদলের ইঙ্গিত কি মিলেছে কিছু? দাম কমেছে, চাকরি বেড়েছে, অপরাধ কমেছে! অন্নপূর্ণার টাকা সবার অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে? উলটে স্টেশনে, ফুটপাতে, রাজপথের দু’ধারে হকার ভাইদের জীবনযন্ত্রণা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। কার তাতে এল গেল!
আসলে পিঠ বাঁচাতে আর জেলযাত্রা ঠেকাতে তৃণমূল যত ভাঙছে, ততই তার রকমও বদলে যাচ্ছে। একদল মায় ঋতব্রত তৃণমূল আলাদা ব্লক গড়ে শুভেন্দু অধিকারীর ছত্রছায়ায়। সংসদীয় তৃণমূল ভেঙে অচেনা অজানা নতুন এক দলের ছাতার তলায়। সংসদ বসলেই তাঁরাও পদ্মেই মিশে যাবেন বলে খবর। সবটাই হচ্ছে বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে। আর তৃতীয় ভাগ মানে সুখেন্দুশেখর, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশচিকদের মতো বিদগ্ধ জোড়াফুলের সদস্যরা সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিয়ে আবার রাজ্যসভার এমপি হওয়ার অপেক্ষায়। মানুষ একই রইল, শুধু রং বদল আর ফুল বদল! সঙ্গে একটা ফ্রি ওয়াশিং মেশিন, এতদিনের জমে থাকা কাদা গা থেকে ধুয়ে ফেলতে। কী বলবেন? মানুষের আবেগের সঙ্গে এটা নির্মম ধোঁকাদারি নয়!
ইতিহাসের শিক্ষা একটাই, রাজা বদলায়, পোশাক পালটায়, কিন্তু রাজ্যপাট একই থাকে। এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। শিবের মাথায় কন্ডোম পরানোর কথা বলা নেত্রীও আজ কথায় কথায় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ পালনের কথা বলে নিজের চারদিকে আরও একটু নিরাপদ ঘেরাটোপ তৈরি করছেন। ৯ বছর আগে সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তৃণমূলে আশ্রয় নেওয়া নেতার হাবভাবটা এমন যেন কোনোদিন কালীঘাটের ছায়া পর্যন্ত মাড়াননি, সোজা আলিমুদ্দিন থেকে বিজেপির আশ্রয়ে চলে এসেছেন। তৃণমূল যত ডুববে, প্রাসঙ্গিকতা হারাবে, ততই বিজেপির টার্গেট হবে মীনাক্ষী, শতরূপ, দীপ্সিতা, সৃজন, কলতানরা। কারণ এরা রং বদলাবে না। সাধারণ মানুষের কথা বলবে। বাইনারি ভেঙে যাচ্ছে। রাজ্যের খেটে খাওয়া শ্রমিক, মজদুর, হকার, সংখ্যালঘু মানুষ বুঝছে তাঁদের পাশে কারা আছে। বাংলার রাজনীতিতে যে দুর্নীতি, পয়সার আস্ফালন সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং পাঁকে ডুবে যাওয়া সংস্কৃতির আমদানি হয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরোধীদের সস্তায় কিনে নেওয়ার কুনাট্য। তাই সিপিএম ও আইএসএফের দু’জন বিধায়কই বর্তমান বিধানসভায় প্রকৃত বিরোধী মুখ। বাকি অনেকেই নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত।
ভারতীয় রাজনীতি আজ বিজেপি নামক এক বিরাট শিশুর খেলার পিংপং বল। প্রতিবাদীরা ছত্রভঙ্গ। কিন্তু বিকশিত ভারতে যদি বিরোধীই না থাকে তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের মৃত্যু অনিবার্য। একদলীয় ভারতকে বিশ্ব কিন্তু বিকশিত রাষ্ট্রর মর্যাদা দেবে না। সংবিধান গুরুত্ব হারালে নরেন্দ্র মোদির ২০৪৭’র শ্রেষ্ঠ ভারতের স্বপ্নও ধাক্কা খেতে বাধ্য।