Bartaman Logo
১১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শমীকের বার্তা কি আদৌ নীচুতলায় পৌঁছাচ্ছে?

শমীক ভট্টাচার্যের ডিম থেরাপি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ। বিজেপির কর্মীদের উপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নেই। বিস্তারিত জানুন।

শমীকের বার্তা কি আদৌ নীচুতলায় পৌঁছাচ্ছে?
  • ১১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ‘কিছু মানুষ চার ঘণ্টায় বিজেপি হয়ে গিয়েছে। তারা মাথায় গেরুয়া আবির লাগিয়ে হাতে লাঠি নিয়ে ভাঙচুর করছে। ৩০ বছরের বিজেপি কর্মীকেও পিটিয়ে দিচ্ছে।’

Advertisement

‘কোনো মানুষকে পচা ডিম ছোড়াটা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হতে পারে না। কিন্তু, ছোড়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হবে।’
মন্তব্য দু’টি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের। বিভিন্ন সভায় ‘ডিম থেরাপি’নিয়ে নিজের উপলব্ধি ও দলীয় নীতি তিনি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্যকে উপস্থিত শ্রোতারা সমর্থন জানাচ্ছেন। কিন্তু, দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সংবিৎ ফিরছে না। উলটে ডিম ছোড়ার প্রবণতা বাড়ছে। তাই জাগছে প্রশ্ন, বিজেপি কি সত্যিই ‘ডিম থেরাপি’-র বিরুদ্ধে, নাকি সবটাই ‘স্ক্রিপটেড’? পরিকল্পিত না হলে বলতেই হবে, দলের কর্মীদের উপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নেই। আর সেটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ শাসক দলের অন্যায়কেও প্রশাসন ‘ন্যায়’বলে সিলমোহর দেয়। এটাই প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
প্রথম দিকে ‘ডিম থেরাপি’-র টার্গেট ছিলেন তৃণমূলের নেতারা। মূলত জনপ্রতিনিধি ও দাপুটে নেতারাই আক্রান্ত হচ্ছিলেন। বিজেপি নেতৃত্ব তাকে ‘জনরোষ’বলে চালায়। কারণ দেড় দশকে তৃণমূলের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি এবং দাপুটে নেতা ফুলেফেঁপে উঠেছেন। পেটোয়া লোকজনকে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দিয়েছেন। বঞ্চিত হয়েছেন যোগ্যরা। ফলে মানুষের ক্ষোভ থাকাটাই স্বাভাবিক। পালাবদলের পর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে মনে করে অনেকেই বিজেপি আমদানিকৃত এই কালচারকে প্রতিবাদের ভাষা মনে করেছিলেন। তবে, এখন শুধু রাজনৈতিক নেতাদেরই নয়, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা, অফিসার, শিক্ষকদেরও ডিম ছোড়া হচ্ছে। 
২ জুলাই পোস্তাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক বিশ্বনাথ আগরওয়ালের মাথায় ডিম ফাটানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ? বিশ্বনাথবাবু নাকি তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেন! তারই শাস্তিস্বরূপ বৃদ্ধ বিশ্বনাথবাবুকেও মারা হল একের পর এক ডিম। এমনটা হতে পারে তা কল্পনাও করেননি তিনি। চেয়ারে বসে হামলাকারীদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মওকা পেয়ে এক মহিলা তাঁর গালে সপাটে চড় কষিয়ে দেন! প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা পোস্তাবাজার বন্ধ রাখার ঘোষণা করেন। তাতে মহিলা সহ চারজন জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার হলেন, কিন্তু নেতৃত্ব নীচুতলার কর্মীদের সতর্ক করল না।
আদালতে বিচারের আগেই অভিযুক্তর শাস্তি হয়ে যাচ্ছে গণআদালতে। মানুষের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের সাধারণ মানুষ শাস্তি দিচ্ছে। এভাবে কি শাস্তি দেওয়া যায়? কেউ দুর্নীতি করেছে কি না, তা ঠিক করবে আদালত। কিন্তু, দু’চারজন ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ছোকরা রাতারাতি বিজেপি হয়ে গিয়েছে। তারাই অভিযুক্তদের কাউকে জুতোর মালা পরিয়ে উঠবস করাচ্ছে, কাউকে গরম পিচ রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটাচ্ছে। চড়, থাপ্পড় মারছে। কান ধরে উঠবসও করাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, আক্রান্তরা প্রত্যেকেই পরিবারের প্রধান। তাঁদের সন্তান আছে। তারা স্কুল-কলেজে পড়ে, কেউ হয়তো জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে শুধু অভিযুক্তই নয়, পরিবারের সদস্যরাও অসম্মানিত হচ্ছেন।  
এতদিন আক্রান্তরা সমস্ত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেছেন। কিন্তু, ডিম থেরাপির নামে নোংরামি এবার অনেক সাধারণ মানুষেরও অসহ্য লাগছে। তাই শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। অভিযোগ, পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর-২ পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ ৭০ বছরের মানস দাসের মাথায় ডিম ফাটিয়েছেন বিজেপি নেতা সুব্রত জানা। একজন বৃদ্ধকে এভাবে অপমান করায় রুখে দাঁড়ান স্থানীয় লোকজন। সুব্রতবাবুর দাবি, ‘সরকারি অর্ডারে ডিম মারছেন।’ তাতে মানুষ আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে পিঠটান দেন সুব্রতবাবু। সুব্রতবাবু পঞ্চায়েত সমিতির বিজেপির দলনেতা। তিনি যদি ‘ডিম থেরাপি’কে সরকারি অর্ডার বলে দাবি করেন তাহলে সাধারণ মানুষ তো বিভ্রান্ত হবেই।
শুধু দুর্নীতিগ্রস্তরাই কি বিজেপির টার্গেট? তাহলে সিপিএমের মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের গাড়িতে কেন ডিম ছোড়া হল? তাঁর বিরুদ্ধে তো সরকারি টাকা আত্মসাতের কোনো অভিযোগ নেই। তিনি শীতলকুচি গিয়েছিলেন মৃত দলীয় কর্মী মন্টু মিঞার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে। মৃত কর্মীর পরিবারকে সমবেদনা জানানো নেত্রীর কর্তব্য। তা সত্ত্বেও ডিম ছোড়া হয়েছে। কারণ মণ্টু মিঞার মৃত্যু রহস্যজনক। সিপিএমের অভিযোগ, ‘মন্টুবাবু হাট থেকে গোরু নিয়ে আসছিলেন। গোরক্ষকরা তাঁকে খুন করেছে।’ অর্থাৎ ঘুরিয়ে বিজেপিকেই দায়ী করেছে সিপিএম। তাই কি ডিম ছুড়ে সিপিএমকে সমঝে দেওয়া হল, বাড়াবাড়ি করো না। ডিম থেরাপির উদ্দেশ্য বদলে যাচ্ছে? যা ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার, সেটাই হয়ে গেল কণ্ঠরোধের অস্ত্র? 
প্রতিরোধের মুখে পড়েও মীনাক্ষী দমেননি। তিনি গাড়িতে বসেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করেছেন। দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। প্রতিটি মুহূর্তের বিবরণ দিয়েছেন। তাতে বিক্ষোভকারীদের ছোড়া একের পর এক ডিম কীভাবে গাড়ির উইন্ড স্ক্রিনে আছড়ে পড়ছিল, সেটা রাজ্যের মানুষ দেখেছে। মীনাক্ষী রণে ভঙ্গ না দিয়ে ধরনায় বসে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পুলিশ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে জানানোর পর তিনি এলাকা ছেড়েছেন।
‘ডিম ছোড়ার সঙ্গে দলের কেউ যুক্ত নয়’কিংবা ‘তৃণমূলের এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ডিম মারছে’এই জাতীয় কথা বলে বিজেপি দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া গেল, ডিম ছুড়ছে তৃণমূল। তাহলে ডিম মারার সময় পুলিশ কেন তাদের হাতেনাতে ধরছে না? হামলাকারীরা তো ডিম ছুড়েই পালিয়ে যাচ্ছে না। তারা সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পুলিশ কঠোর হলে ‘ডিম্বাস্ত্র’ প্রয়োগে উৎসাহী বীরপুরুষদের কী হাল হয়, সেটা শ্রীরামপুর ও ডানকুনি থানার আইসি দেখিয়ে দিয়েছেন। তৃণমূল নেতাকে হেনস্তা করার আশায় বিজেপির লোকজন ডিম নিয়ে জড়ো হতেই অফিসারের হুঁশিয়ারি, ‘ডিম ছুড়লেই গ্রেপ্তার করব।’ হুমকি দিতেই কেউ ডিম পকেটে পুরে, কেউ আঁচলে বেঁধে কেটে পড়েন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুই পুলিশ অফিসারের কড়া মনোভাব বহুজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে। 
রামনগরের বিজেপি নেতা সুব্রতবাবুর সরকারি অর্ডারে ডিম ছোড়ার দাবি সত্যি হলে ওই দুই অফিসার এতদিনে শাস্তির মুখে পড়তেন। কিন্তু, সেটা হয়নি। এখন দেখার, সরকারকে সামনে রেখে মিথ্যে দাবি করায় বিজেপি সুব্রতবাবুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না! তবে, একটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে, স্ক্রিনিং করে কি ডিম থেরাপি প্রয়োগ হচ্ছে? এখনও পর্যন্ত সরকার পোষিত ‘ভালো তৃণমূল’ শিবিরের কেউ ডিম থেরাপির শিকার হননি। তাই উঠছে প্রশ্ন, কাদের উপর ডিম্বাস্ত্র প্রয়োগ করা হবে, কারা ছাড় পাবেন, সেটা কীসের ভিত্তিতে ঠিক হচ্ছে? 
এর সঠিক উত্তর একমাত্র যাঁরা ডিম ছুড়ছেন তাঁরাই দিতে পারবেন। তবে, সম্প্রতি একটা ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বাঁশবেড়িয়া পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার কেশব দাস বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। কেশববাবুর অভিযোগ, ‘তাঁর কাছে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করেছেন বিজেপির এক বিধায়ক ঘনিষ্ঠ কর্মী। টাকা না দিলে মারা হবে ডিম। পাশাপাশি কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হবে।’ এটাই যদি ডিম্বাস্ত্র থেকে মুক্তির পথ হয় তাহলে বলতেই হবে, পরিস্থিতি অতীব ভয়ঙ্কর।
বাংলায় নতুন বিজেপি সরকারের কাছে এটা ‘স্টার্ট আপে’-র সময়। এসআইআর ও নির্বাচনের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল উন্নয়নের কাজ। ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হওয়ায় ব্যাপক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান হবে, এটাই রাজ্যবাসীর আশা। অথচ, আমরা মেতে আছি অথবা আমাদের মাতিয়ে রাখা হয়েছে ডিম থেরাপি নিয়ে। উন্নয়ন, সরকারি শূন্যপদ পূরণ, শিল্প, এমনকি মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও কোনো আলোচনা নেই। 
বিজেপি সরকারের বয়স দু’মাস। এরই মধ্যে কিছু মণ্ডল সভাপতি, বিধায়ক ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, টাকা চেয়ে হুমকির অভিযোগ সামনে আসছে। দল কয়েকজনকে শোকজ করেছে। কিন্তু, অভিযোগ যে হারে বাড়ছে তাতে নেতৃত্বের কপালে ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। সেই উপলব্ধি থেকেই কি শমীকবাবুর এই সতর্কবাণী, ‘পচা ডিম কেউ দীর্ঘদিন সহ্য করবে না। এই ডিম একদিন আপনাদের দিকেও ঘুরে আসতে পারে।’ শমীকের এই বার্তা নীচতলায় যত দ্রুত পৌঁছায় ততই মঙ্গল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ