Bartaman Logo
১১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভালো বিজ্ঞাপন নয়

অন্নপূর্ণা যোজনায় সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে হতাশ রাজ্যের মানুষ। কী ঘটছে? বিস্তারিত পড়ুন।

ভালো বিজ্ঞাপন নয়
  • ১১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কথার খেলাপ করছে সরকার। অভিযোগের এই তর্জনী উঠেছে রাজ্যে অন্নপূর্ণা যোজনা রূপায়ণ নিয়ে। কথার খেলাপে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। তাঁর তরফে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের খতিয়ান সুদীর্ঘ এবং সর্বজনবিদিত। এজন্য কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বেশিরভাগ বিরোধী নেতা তাঁর প্রতিটি প্রতিশ্রুতিকে জুমলা ‘আখ্যা’ দিয়ে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দুর্ভাগ্য যে, রাজ্যের প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকারও পা গলিয়ে দিয়েছে মোদিজির ছেঁড়া জুতোতেই। এই ব্যাপারে মোদি সরকার তবু কিছুটা সময় নিয়েছিল, শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কথার খেলাপ অনুশীলনে মনোনিবেশ করেছে শুরুতেই। রাজ্যের পূর্বতন সরকারের সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি সারা দেশে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে ফলপ্রসূ ছিল নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রকল্পগুলি—কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রভৃতি। সকলে ধন্য ধন্য করলেও কেন্দ্রের শাসক দল, এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত প্রকল্পগুলির নিন্দায় সরব হন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এগুলি ‘রেউড়ি’ বা ‘খয়রাতি’। কিছু মানুষকে বিনাশ্রমে অর্থ পাইয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি করে দিচ্ছে। মোদি এবং তাঁর পার্টি ভোল বদলাতে অবশ্য খুব দেরি করেননি। নির্বাচনি রাজনীতিতে এসব প্রকল্প ও কর্মসূচির প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করে তাঁরা সুর নরম করে ফেলেন। উলটে তাঁদেরই সরকার এবং নেতানেত্রীদের মুখে শোনা গেল এই প্রকল্পগুলিই চালু করার অঙ্গীকার। তবে শরম বলে একটা জিনিস তো আছে। তাই একটু নাম বদলে নেওয়া হল। অতঃপর বাংলার জনমুখী প্রকল্পগুলি বিভিন্ন রাজ্যে, এমনকি কেন্দ্রীয় পরিসরেও উপহার দেওয়া হল। বলা বাহুল্য, সাড়া জাগানো প্রকল্পগুলির প্রতিটিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত। 

Advertisement

তবে এসব প্রকল্প বিহার, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি প্রভৃতি জায়গায় বাস্তবায়নের খতিয়ান মোটেই ইতিবাচক নয়। বিজেপির দখলদারি কায়েম করার জন্য সংকল্পপত্রে এবং ময়দানি ভাষণে যা-সব দাবি করা হয়েছিল তার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া গিয়েছে কমই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, মাসে মাসে আর্থিক অনুদান মহিলাদের হাতে প্রতিশ্রুতিমতো পৌঁছায়নি। এনিয়ে গুঞ্জন ছিল সর্বত্রই। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির কলেবর বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। এই প্রকল্পে অনুদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির ঘোষণা করতেই রাজ্যবাসী তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে থাকে। অমনি প্রমাদ গোনে ক্ষমতালোভী বিজেপি। তাদের নির্বাচনি সংকল্পপত্রে (ইস্তাহারে) দাবি করা হয়, রাজ্যে তারা সরকার গড়তে পারলে মহিলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হবে দ্বিগুণ অর্থ অর্থাৎ তিন হাজার টাকা! তখন অবশ্য বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ক্ষুদ্র অক্ষরের কোনো কারসাজি সামনে আনা হয়নি। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারীদের কথায় বিশ্বাস করে পদ্ম চিহ্নে ঢেলে ভোট দিয়েছিলেন মহিলারা। 
এমনকি ভোটে জেতার পরও নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ‘পূর্বতন সরকারের কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প আমরা বন্ধ করছি না। যথারীতি চালু থাকবে, বরং নতুন কিছু যোগ করব আমরা।’ শুভেন্দু অধিকারী এমনও বলেছিলেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নাম বদলে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ হলেও টাকা ঢুকবে আগের নিয়মে—শুধু অঙ্কটা বেড়ে হবে তিন হাজার! সবাই আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে কেউই টাকা পেলেন না। পরে অনুষ্ঠান করে কিছু মহিলাকে টাকা দেওয়া হল বটে—ওইসঙ্গে শোনানো হল ভয়ের কাহিনিও। প্রথমে বলা হল—যারা ‘বিদেশি’, তাঁরা এই টাকা পাওয়ার যোগ্য নন। ভালো কথা। এরপর ধাপে ধাপে যোগ হচ্ছে ‘সাব-ক্লজ’—সোজা কথায়—অন্নপূর্ণার লিস্ট যতটা সম্ভব ছোটো করার কৌশল। স্বভাবতই একটি প্রশ্নই বড়ো হয়ে উঠল—কারা পাবেন অন্নপূর্ণার টাকা? এই সংক্রান্ত এক পর্যালোচনা বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে বুধবার জানা গেল, বিজ্ঞপ্তিতে একাধিক শর্ত আছেই—ওইসঙ্গে মুখের উপর ‘না’ বলে দেওয়া হল পুরানো কয়েকটি শ্রেণিকে। তাঁদের মধ্যে আছেন—আশাকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, পার্শ্বশিক্ষক, সিভিক ভলান্টিয়ার প্রভৃতি। মূল বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য সরকারি চাকরিজীবী মহিলা এবং আয়করদাতা পরিবারগুলিকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা ছিল। বাদের পরিসর ক্রমশ চওড়া হওয়ায় রাজ্যের অসংখ্য মানুষ এখন বেশ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। নতুন নির্দেশিকা অন্যভাবেও বিপদে ফেলেছে অঙ্গনওয়াড়ি ও আশাকর্মীদের। যাঁদের অ্যাকাউন্টে ইতিমধ্যেই ‘ভুলবশত’ অন্নপূর্ণার টাকা ক্রেডিট হয়ে গিয়েছে এবার সেই টাকা তাঁদের ফেরতই দিতে হবে! উল্লেখ্য, রাজ্যে আশাকর্মী প্রায় ৭৫ হাজার। কেবলমাত্র প্রকৃত প্রান্তিক এবং অভাবী পরিবারের মহিলাদের অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করার নীতি নিয়েছে সরকার। এই নীতিই যদি আঁকড়ে থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী তবে ঝেড়ে কাশেননি কেন গোড়া থেকেই? নবান্নের নয়া তরিকায় লক্ষ লক্ষ মহিলা একইসঙ্গে ‘বঞ্চিত’ এবং ‘প্রতারিত’ বোধ করছেন। এ কোনো ভালো বিজ্ঞাপন নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ