Bartaman Logo
১০ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মধ্যরাতের ‘দৈববিচার’!

বারুইপুরে নাবালিকাকে গণধর্ষণের পর পুলিশের এনকাউন্টার নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন।

মধ্যরাতের ‘দৈববিচার’!
  • ১০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বারুইপুরে নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনাটি পৈশাচিক, জঘন্য এবং ক্ষমার অযোগ্য। এই ধরনের অপরাধীর চরমতম শাস্তিই কাম্য, তা নিয়ে এ দেশের কোনো সুস্থ নাগরিকের মনে দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু অপরাধের শাস্তি দেওয়ার নামে মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ হেফাজতে থাকা মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের যে ‘এনকাউন্টার’ বা বিচারবহির্ভূত মৃত্যু হল, তা কি আদৌ ন্যায়বিচার? ভারতীয় ন্যায়সংহিতা কি একে মান্যতা দেয়? নাকি বিচারের নামে এ এক চরম বিপজ্জনক প্রহসন? এই প্রশ্ন ঘিরেই তোলপাড় গোটা বাংলা। পুলিশের দাবি অত্যন্ত চেনা এবং ছকে বাঁধা—রাত পৌনে একটা নাগাদ অভিযুক্তকে নিয়ে ‘ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন’ বা ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে সে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এক রাউন্ড গুলিও চালায়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পালটা গুলি চালায়। অনেকেই বলবেন, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালিয়ে অন্যায় কিছু করেনি। ঠিক কথা। কিন্তু প্রশ্ন হল, এমন জঘন্যতম আসামিকে ক্রাইম সিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিসের কি প্রপার ট্রেনিং ছিল না? একজন আসামি, কিন্তু পুলিসের সংখ্যা ছিল একাধিক। তাহলে কী করে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিতে পারল অভিযুক্ত? পালাবদলের পরে দেখা গিয়েছে তোলাবাজ অভিযুক্ত অনেককে কোমড়ে দড়ি পরিয়ে ঘোরাচ্ছে পুলিশ! এ ছবি দেখেছে বঙ্গবাসী। প্রশ্ন হল, এক্ষেত্রে কি সেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? আরও প্রশ্ন, মাঝরাতে এমন কোন জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হল যে ফরেনসিক রিপোর্ট আসার আগেই, ন্যূনতম চার্জশিট পেশ করার আগে আসামিকে নিয়ে অন্ধকারে ‘ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন’ করতে ছুটতে হল? আজকের দিনে যেখানে ফিল্ড রিকনস্ট্রাকশনে সিসি ক্যামেরা বা বডি ক্যাম থাকা স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস, সেখানে এই অভিযানের কোনো ভিডিয়ো রেকর্ড কেন নেই? ‘এনকাউন্টার সংস্কৃতি’ একবার প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পেয়ে গেলে কোনো নিরপরাধকে যে আগামী দিনে এর শিকার হতে হবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?

Advertisement

শাসক শিবির একে ‘দৈববিচার’ বলে হাততালি দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের একাংশও ক্ষণিকের আবেগে উল্লাস করছেন। তাঁদের যুক্তি, কামদুনির মতো একাধিক স্পর্শকাতর মামলায় আইনি বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা দেখতে দেখতে অপরাধীদের মনে একটা ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব জন্ম নিয়েছে। সেখানে এই ধরনের পদক্ষেপ একটি বড়ো ধাক্কা। অপরাধীদের মনে ভয় থাকা জরুরি। কিন্তু এই ‘শর্টকাট’ বিচার যে সমাজব্যবস্থার জন্য কতটা ভয়ঙ্কর, তা অনেকেই বুঝতে পারছেন না। দশ বছরে উত্তরপ্রদেশে পুলিশি এনকাউন্টারে প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। তার পরেও কি অপরাধ বন্ধ হয়েছে? অতীতে এ রাজ্যেও ‘অপরাজিতা বিল’ নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে। সেখানে সহজেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান লিখে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কঠোর আইন বা এনকাউন্টার করে অপরাধী মনস্তত্ত্ব রাতারাতি বদলে দেওয়া যায় না। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রিফর্মেশন ছাড়া এই ক্রাইম কমানো অসম্ভব। আজ যদি মুখ্যমন্ত্রীর কথামতো ‘সকালে জমা, রাতে খরচ’—এটাই প্রশাসনের দস্তুর হয়ে দাঁড়ায়, তবে মেনে নিতে হবে যে আমাদের সাংবিধানিক বিচার প্রক্রিয়া আর কাজ করছে না। যখন রাজ্যে নারী নির্যাতনের একের পর এক ঘটনা ঘটে, তখন পুলিশের টিকি দেখা যায় না। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গুলি হেলনে প্রতিবাদীদের মুখ বন্ধ করতে পুলিশ রাতারাতি অতি-সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার এই বিচারবহির্ভূত আস্ফালন নতুন কিছু নয়। পাঞ্জাবের রক্তক্ষয়ী পটভূমিতে তৈরি হওয়া ২০২২ সালের ‘সাতলুজ’ সিনেমার কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। পরিচালক হানি ত্রেহানের সেই ছবিতে দেখানো হয়েছিল, কীভাবে মানবাধিকার কর্মী যশবন্ত সিংহ নয়ের দশকে পঁচিশ হাজারেরও বেশি শিখ যুবকের নিখোঁজ ও ভুয়ো এনকাউন্টারের সত্য সামনে এনেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে তাঁকেও পুলিশি অপহরণ ও হত্যার শিকার হতে হয়েছিল। সেই ছবির ১২৭টি দৃশ্য ছেঁটে ফেলার নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সেন্সর বোর্ড। আজ বারুইপুরেও যখন এই তথাকথিত এনকাউন্টারের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মীরা সরব হতে যাচ্ছেন, তাঁদের পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে। বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই অভ্যাসগুলি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেউ চুরি করে ধরা পড়লে তার হাত কেটে দেওয়া বা খুন-ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে মাঝরাস্তায় গুলি করা—এ তো মধ্যযুগীয় খাপ পঞ্চায়েতের লক্ষণ। গণতন্ত্রে পুলিশই যখন একাধারে তদন্তকারী, বিচারক এবং দণ্ডদাতা হয়ে ওঠে, তখন ন্যায়বিচার পাওয়ার আশালতাও এ জন্মের মতো নির্মূল হয়ে যায়। বাংলা কোনো জঙ্গলরাজ বা ছদ্ম-আইনের মডেল চায় না। বাংলা চায় নিখুঁত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের আইনি উপায়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ