মৃণালকান্তি দাস: বিখ্যাত তাত্ত্বিক লিঁও ট্রটস্কি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ হল ইতিহাসের ইঞ্জিন।’ গত এক-দেড়শো বছর বাদ দিলে, মানবসভ্যতার গোটা ইতিহাসেই যুদ্ধ নির্ধারণ করত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ ও রাষ্ট্রের সীমান্ত। বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুদ্ধের সংখ্যা ও ব্যাপকতা সীমিত করার অনেক চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে যুদ্ধ থেমে নেই। যুদ্ধ এখনও অনেক ক্ষেত্রে শেষ মীমাংসাকারী।
ইরান-যুদ্ধে এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলের পিছনে প্রত্যক্ষ কারণ ছিল হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ। তবে এই অবরোধ ও অন্যান্য ফ্রন্টের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি। সমরবিশারদদের মতে, ইরান যুদ্ধ ও ইউক্রেন যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে ‘যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব’ ঘটিয়েছে।
সমরবিদ্যায় ‘যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব’ (রেভুলেশন ইন মিলিটারি এফেয়ার্স বা সংক্ষেপে আরএমএ) বলতে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি, প্রযুক্তি, রণনীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোর এমন এক গভীর ও দ্রুত রূপান্তরকে বোঝায়, যা সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ, অভিযান ও সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনে। এই প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহারকারীরা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় অপরাজেয় হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমরবিদ্যায় এই ধারণাটি একটি আবশ্যক পাঠ্য বিষয় হিসেবে যুক্ত হয়। তবে ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নিখুঁত অস্ত্রপ্রয়োগের অভাবনীয় সাফল্যের পরই বিষয়টি গবেষণার মূল কেন্দ্রে চলে আসে।
সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে এমন অসংখ্য বিপ্লব ঘটেছে যার হাত ধরে আন্তর্জাতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। ব্রোঞ্জ যুগে প্রথম অশ্বচালিত যুদ্ধরথের প্রচলন মিশরীয়, হিট্টি ও ব্যাবিলনীয়দের মতো বিস্তৃত সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিল। প্রচলিত অস্ত্র নিয়েও কেবল সুশৃঙ্খল ‘লেজিয়ন’ ভিত্তিক সেনাবাহিনীর সুবাদে রোম প্রজাতন্ত্র ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তেমনই নতুন রণনীতি ও গতিশীল অশ্বারোহী বাহিনীর কারণে চেঙ্গিস খানের মঙ্গোলরা পৃথিবীর দ্রুততম ও বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ইতিহাসে দেখা যায়, বাবর তাঁর যুদ্ধকামান ও গোলন্দাজ বাহিনীর দক্ষতায় মাত্র ১২ হাজার সেনা নিয়ে দিল্লির সুলতান লোদির পাঁচ গুণ বড়ো বাহিনীকে হারিয়ে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অটোমান বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান ও গতিশীল কামানের ব্যবহার বাবরই প্রথম শুরু করেছিলেন।
ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর উদ্ভাবিত ‘কর্পস পদ্ধতি’ ও অতুলনীয় রণকৌশলে কয়েক বছরের মধ্যে গোটা ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজ বদলে দিয়ে আধুনিক ইউরোপের ভিত্তি স্থাপন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর বছরগুলিতে জার্মানির ট্যাংক, বিমান ও বেতারের সমন্বয়ে গঠিত রণনীতি ‘ব্লিৎজক্রিগ’ বা তড়িৎযুদ্ধ আধুনিক আরএমএ ধারণার প্রধান প্রেরণা। আর মহাযুদ্ধের শেষে জাপানের উপর পারমাণবিক বোমার প্রয়োগ পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর এক বিপ্লবের জন্ম দেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, বর্তমানের ড্রোন প্রযুক্তি কি যুদ্ধক্ষেত্রে এক স্থায়ী বিপ্লব? এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী?
গত এক দশকে সামরিক ও বাণিজ্যিক খাতে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছিল। কিন্তু কিছু নতুন প্রযুক্তির বিকাশের ফলে ড্রোনের খরচ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে এখন মাত্র কয়েকশো ডলারে নেমে এসেছে। এর পিছনে রয়েছে হালকা কিন্তু শক্তিশালী ব্যাটারি, ক্ষুদ্র ক্যামেরা, উন্নত মাইক্রোচিপ, জিপিএস, ক্ষুদ্র সেন্সর এবং ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) প্রিন্টিং প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিগুলির বেশিরভাগই বাজারে সহজলভ্য। বিশেষ করে চীন থেকে বাণিজ্যিক ড্রোনের বিশাল বাজার সৃষ্টি হওয়ায়, দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও প্রোগ্রামারদের কাছে প্রযুক্তিগুলিকে অস্ত্রে রূপান্তর করতে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধে যে ড্রোনটি সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন এনেছে, তা হল দূরপাল্লার ‘আত্মঘাতী ড্রোন’। ১০-১২ ফুট লম্বা, ছোটো বিমানের মতো দেখতে এই ড্রোনগুলি ৫০ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে দেড় থেকে দুই হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে পারে। এগুলি খুব নীচু দিয়ে উড়ে যায় বলে রাডারে ধরা পড়া কঠিন। এই ড্রোনে ব্যবহৃত ইঞ্জিনগুলি ঘাস কাটার গাড়ি বা স্কুটারের ইঞ্জিনের মতোই সাধারণ ও সস্তা। এতে বাজারে সহজলভ্য গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম রিসিভার ব্যবহার করা হয়, যা মার্কিন জিপিএস, রুশ গ্লোনাস, ইউরোপীয় গ্যালিলিও কিংবা চীনা বাইডু উপগ্রহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে এর যাত্রাপথ নির্ধারণ করা হয়। একেকটি ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার।
২০২২ সালে ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ ‘শাহিদ’ ড্রোন আমদানি করে ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছিল রাশিয়া। পরে রাশিয়া তার নিজস্ব সংস্করণ ‘গেরান’ তৈরি শুরু করে। এখন ইউক্রেন নিজেও ‘বোবার’ নামে নিজস্ব দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে মস্কো, লেলিনগ্রাদসহ দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরানও মূলত এই শাহিদ ড্রোন দিয়েই মার্কিন ঘাঁটি ও আরব রাষ্ট্রগুলিতে আক্রমণ চালিয়েছে।
দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে মূলত এর ‘বিনিময় খরচের’ কারণে। যেখানে একটি ড্রোনের খরচ মাত্র ২০ হাজার ডলার, সেখানে তা ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ কয়েক লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে রয়েছে নীচু দিয়ে ওড়া ড্রোন শনাক্তকরণের জন্য বিস্তৃত রাডার ব্যবস্থার বিশাল খরচ। ইরান যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকটের চেয়ে বড়ো শঙ্কা তৈরি হয়েছিল অন্য জায়গায়। ইজরায়েল, মার্কিন বাহিনী ও উপসাগরীয় দেশগুলির আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল, যা যুদ্ধ থামানোর অন্যতম বড়ো কারণ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন ঠেকাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের ভারী মেশিনগান ব্যবহার করতে হয়েছে।
এই সময়ে আরেকটি অস্ত্র হল ‘ফার্স্ট-পারসন ভিউ’ বা এফপিভি ড্রোন। বর্তমানে ক্যামেরাবাহী ড্রোনের ভিডিও যেভাবে সরাসরি স্মার্টফোনে দেখা যায়, এটি তারই সামরিক রূপ। তবে প্রচলিত ড্রোনের বেতার সংকেত সহজেই জ্যাম বা অকার্যকর করা সম্ভব। তাই এফপিভি ড্রোনে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত পাতলা ফাইবার অপটিক তার, যা ড্রোনের ক্যামেরাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণকারীর সঙ্গে যুক্ত রাখে। তারের ব্যবহারের কারণে এর পাল্লা ২০ কিলোমিটারের মতো সীমিত হলেও, একে জ্যাম করা অত্যন্ত কঠিন। সর্বত্র ‘গেম চেঞ্জার’-এর ভূমিকা নিয়েছে এই ড্রোন।
সস্তা উৎপাদন খরচ ও নিখুঁতভাবে আঘাত হানার ক্ষমতার কারণে আত্মঘাতী ড্রোন এখন তুলনামূলক দুর্বল শক্তির এক অমোঘ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা প্রচলিত সামরিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়া জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে বহুগুণ এগিয়ে আর ইরানের তুলনায় তার প্রতিপক্ষদের সম্মিলিত শক্তির কোনো তুলনাই হয় না। ইতিহাসের প্রতিটি সামরিক বিপ্লব কখনো আক্রমণকারীকে শক্তিশালী করেছে, কখনো প্রতিরক্ষাকারীকে। বর্তমানের ড্রোন প্রযুক্তি মূলত প্রতিরক্ষাকেই বেশি শক্তিশালী করেছে। শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়ে দুর্বলের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার এই ক্ষমতার কারণেই ড্রোন আজ যুদ্ধক্ষেত্রের এক নতুন বিপ্লব।
ড্রোনযুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুব দ্রুতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘এজ কম্পিউটিং’ যুক্ত হয়ে ড্রোনকে আরও ভয়ংকর করে তুলবে। এজ কম্পিউটিং হল কোনো কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক বা জিপিএস ছাড়াই ড্রোনের নিজস্ব সিস্টেমের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়া এবং নিখুঁতভাবে আক্রমণ করার পদ্ধতি।
‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং তাকে কেন্দ্র করে চলা পাকিস্তানের সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে ভারতীয় ড্রোন। সেগুলির কোনোটি ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি, কোনোটি আবার সরাসরি ইহুদিভূমি থেকে আমদানি করেছে নয়াদিল্লি। শুধু তা-ই নয়, উড়ন্ত মারণাস্ত্রে শান দিতে মানববিহীন যানগুলিকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতের একাধিক প্রতিরক্ষা সংস্থাও। আসলে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটি বিপ্লব প্রযুক্তি, সংগঠন ও কৌশলের মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। আধুনিক যুগে এই প্রতিযোগিতার চক্র অত্যন্ত দ্রুতগতির। নিজের সার্বভৌমত্ব, অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য সব রাষ্ট্রের জন্যই যুদ্ধক্ষেত্রের এই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সজাগ থাকা এখন সময়ের দাবি।