ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিশ্ববন্দিত হইয়াছে। বর্তমানকালে ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমাদর ভারতের মধ্যে ভারতবাসীর নিকট যতটা তদপেক্ষা অনেক অধিক ভারতের বাহিরে অভারতীয়দের নিকট—একথা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না মনে হয়। অন্যান্য দেশের সভ্যতা যখন সূতিকাগৃহে তৎকালে ভারতের তপোবন সামগানে মুখরিত এবং ভারতের মনীষী ঋষিরা অধ্যাত্ম-চিন্তায় নিমগ্ন। আর্য ঋষিগণ কেবল অধ্যাত্ম-বিষয়েই চিন্তাশীল ছিলেন, কেবল পরলোকের সংবাদের গবেষণাই তাঁহাদের ধ্যানের বিষয় ছিল, এই কথা যথার্থ নহে। তাঁহারা ইহলোক ও পরলোক এই উভয়লোকের কল্যাণপ্রদ চিন্তায় মনোযোগী ছিলেন। ইহলোকের অভ্যুদয় ও সমৃদ্ধির প্রতি তাঁহারা উদাসীন ছিলেন না। তাঁহাদের ধর্ম ছিল “যতোহভ্যুদয়নিঃশ্রেয়সঃ সিদ্ধিঃ স ধর্মঃ”। ভুক্তি ও মুক্তি এই দুইটিই তাঁহাদের আলোচ্য বস্তু ছিল। তবে অন্য দেশের সহিত পার্থক্য এই যে, অন্য দেশে ভোগই সর্বস্ব কিন্তু ভারতের ভোগ মুক্তির অধীন ও অনুকূলে। ভারতে মুক্তিই মুখ্য, ভোগ গৌণ। ‘ঈশাবাস্যমিদং সর্বং…তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’ ইত্যাদি মন্ত্রই ভারতের আদর্শ। শিল্প, কলা, সঙ্গীত, কৃষি, স্থাপত্য, চিকিৎসা, জ্যোতিষ, যুদ্ধবিদ্যা এবং অন্যান্য বিবিধ বিষয়ে সুপ্রাচীন ভারতেও বিশিষ্ট উৎকর্ষের ইতিহাস দেখিয়া মুগ্ধ হইতে হয়। আজও ভারতের বহু স্থানে, বহু মন্দিরাদিতে, সমাজের আচার ব্যবহার পূজা-পার্বণে সেই সুপ্রাচীন গৌরবময় সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিদর্শন সমুজ্জ্বল হইয়া আছে। সুদীর্ঘকালের বৈদেশিক শাসন ও পরাধীনতা তাহা লোপ করিতে সমর্থ হয় নাই। আমাদের নিজেদের ঔদাসীন্য, অবহেলা, অবিশ্বাস এবং আত্মবিস্মৃতিতেই ‘মহতী বিনষ্টির’ আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। প্রতি জীবে শিবের দর্শন, নরনারায়ণ সেবা, নারীমূর্তিতে জগজ্জননী বুদ্ধি, বিশ্বাত্মবোধ এবং সমগ্র বিশ্বকে এক পরিবার রূপে চিন্তন—এই জাতীয় বহু উচ্চস্তরের তত্ত্বকথার ঘোষণা, অনুশীলন এবং অনুভব স্মরণাতীত কালে ভারত ভূমিতেই প্রথমে হইয়াছিল।
আজ পৃথিবীতে জড় বিজ্ঞানের বিস্ময়াবহ আবিষ্কারসমূহ বিশ্ববাসীকে মোহিত করিয়াছে সন্দেহ নাই। আরও সত্য কথা, প্রয়োগকর্তার অশুভ ইচ্ছায় বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা কলুষিত হওয়ায় বিজ্ঞানের উন্নতির কুফল দেখিয়াও বিশ্ববাসী আতঙ্কিত। ইহাতে বিজ্ঞানের দোষ নাই, প্রযোক্তারই দোষ। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব শক্তির বিলাস সেই সর্বশক্তিমান্ পরমেশ্বরের অঘটনঘটনপটীয়সী মায়া শক্তিরই অত্যল্প ক্রীড়ন মাত্র। আমরা যদি আমাদের ভারতবর্ষের রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণসমূহ এবং দর্শনশাস্ত্র প্রভৃতিতে অভিনিবিষ্ট হই, তাহা হইলে বেশ বুঝিতে পারিব যে আত্মবিস্মৃতির ফলেই আমাদের নিকট বর্তমান যুগের জড়বিজ্ঞান চমকপ্রদ হইয়াছে। অতি প্রাচীনকালেও ভারতীয়গণ বিজ্ঞানবলে যুদ্ধবিদ্যা, উদ্ভিদ্বিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতিতে প্রকৃষ্ট নৈপুণ্য লাভ করিয়াছিলেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আজ বিজ্ঞানী চন্দ্রলোকে গমন করিতেছেন এবং আরও বহু দুষ্কর কার্য সাধন করিতেছেন। ভারতের আর্য ঋষি ধ্যানস্থ হইয়াই যোগবলে আরও কত দুষ্কর কর্ম অনায়াসে করিতেন।
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোর্তিময় নন্দের ‘জ্যোর্তিময় রচনাঞ্জলি’ থেকে


