Bartaman Logo
৯ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গণতন্ত্রে কোনো রাজা নেই

জগৎপ্রকাশ নাড্ডার মন্তব্যে গণতন্ত্রের সংকট স্পষ্ট। ক্ষমতায় থাকা দল কি জনগণের প্রতিনিধি? বিস্তারিত পড়ুন।

গণতন্ত্রে কোনো রাজা নেই
  • ৯ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ক্ষমতা মানুষের চরিত্রের পরীক্ষা নেয়। বিরোধী দলে থাকাকালীন যে নেতা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক মর্যাদার কথা বলেন, ক্ষমতায় এসে তিনিই যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার উল্লাসে নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করেন, তবে গণতন্ত্রের জন্য সেটিই সবচেয়ে বড়ো সতর্কবার্তা। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা সগর্বে জানিয়েছেন যে, বিজেপি ও এনডিএ আজ ভারতের প্রায় ৭৮ শতাংশ জনসংখ্যাকে শাসন করে এবং দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা তাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে। আপাত দৃষ্টিতে একথা সত্য। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু গণতন্ত্রে প্রশ্ন কেবল সংখ্যা নিয়ে নয়; প্রশ্ন থাকে সেই সংখ্যার ভাষা ও মানসিকতা নিয়েও। সংখ্যা শক্তি দেয়, কিন্তু গণতন্ত্রের অর্থ কেবল শক্তির প্রদর্শন নয়। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। স্বাভাবিক কারণেই তাই বিরোধীরা নাড্ডাজির মন্তব্যে দাম্ভিকতা ও স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখছেন। রাজনৈতিক নেতাদের স্মরণে রাখা উচিত সংবিধান সরকারকে ক্ষমতা দেয়, আবার সেই ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণও আরোপ করে। কারণ, সংবিধান প্রণেতারা জানতেন—অসীম ক্ষমতা মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এমন এক মনোভাব তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্র, সরকার এবং দল—তিনটি একাকার হয়ে যায়। সেই মুহূর্তেই গণতন্ত্রের ভিত নড়তে শুরু করে।

Advertisement

ভারতবর্ষ কখনো রাজতন্ত্রের পুনর্জন্মের জন্য স্বাধীনতা অর্জন করেনি। স্বাধীনতার সংগ্রামের মূল চেতনাই ছিল, রাষ্ট্রের প্রকৃত অধিপতি হবেন দেশের নাগরিক। সরকার কেবল জনগণের অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। তাই গণতন্ত্রে ‘আমি শাসন করি’-র থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ—‘আমি জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি।’ আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো সরকারকে প্রশাসনিক বৈধতা দেয়; কিন্তু নৈতিক বৈধতা আসে বিনয়, সহনশীলতা ও আত্মসংযম থেকে। যে সরকার বিরোধী মতকে সম্মান করে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেয়, বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে এবং সমালোচনাকে শত্রুতা বলে মনে করে না, সেই সরকারই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী। বিপরীতে, যে সরকার নিজের রাজনৈতিক বিস্তারকেই গণতন্ত্রের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ক্ষমতার আত্মবিশ্বাস কি ধীরে ধীরে ক্ষমতার অহংকারে পরিণত হচ্ছে?
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। স্বাধীনতার পরে দীর্ঘদিন কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তখনও অনেকের মনে হয়েছিল, এই রাজনৈতিক সমীকরণ কখনো বদলাবে না। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো—কোনো ক্ষমতা স্থায়ী নয়। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর জনগণ সরকার বদলেছে। ২০১৪ সালে আবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গেও হয়েছে। আজ যারা ক্ষমতায়, আগামীকাল তারা বিরোধী আসনে বসতে পারেন— গণতন্ত্রের এই চক্রই তাকে জীবন্ত রাখে। অতএব, সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিসংখ্যান রাজনৈতিক সাফল্যের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু তা কখনো গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। গণতন্ত্রের পরিচয় বিরোধী মতের মর্যাদায়। যে নেতা তাঁর রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনের তুলনায় সাংবিধানিক দায়িত্বের প্রতি বেশি উপলব্ধি করেন, তিনিই প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক। আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন কোনো দল কতটি রাজ্যে ক্ষমতায় আছে, তা নয়। বড়ো প্রশ্ন হল—ক্ষমতায় থাকা দল কি নিজেকে জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দেখছে, নাকি শাসক হিসাবে? নাগরিকদের দুঃখ, দুর্দশা, যন্ত্রণায় সমব্যথী হয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে নাকি আগে তার ধর্মীয় সামাজিক রাজনৈতিক পরিচয় দেখছে? প্রশ্ন হল মোদি সরকার কি সবার নাকি শুধু ভোট ব্যাংকের? আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, সরকার —গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, পর দ্য পিপল। ‘সবার উপরে সরকার সত্য’— একথা সেখানে লেখা নেই। এই পার্থক্যটুকুই গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মৌলিক ব্যবধান। সংখ্যা পরিবর্তিত হয়, সরকার পরিবর্তিত হয়, ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়। কিন্তু গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন ক্ষমতাসীনরা মনে রাখেন—ভারতে কোনো রাজা নেই। আছেন কেবল জনগণের সাময়িক প্রতিনিধি। যেদিন এই বোধ হারিয়ে যায়, সেদিন গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও তার আত্মা ক্ষয় হতে শুরু করে। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার বানাতে পারে, ক্ষমতা মানুষকে শাসক বানাতে পারে; কিন্তু গণতন্ত্র তাকে নিছক এক প্রতিনিধি হতে শেখায়। যেদিন সেই প্রতিনিধি নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করেন, সেদিন থেকেই গণতন্ত্রের ক্ষয় শুরু।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ