সোমবার রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন অমিত শাহ। তাঁর সন্তুষ্টির কারণ সবকিছু কেন্দ্র ও গেরুয়া দলের এজেন্ডা মেনেই এগোচ্ছে। উলটো ঝোলানো থেকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পর্যন্ত। সিএএতে নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজও দ্রুত শেষ হবে, এমনই আশ্বাস। নাগরিকত্ব ইস্যুতে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। সেই জটিলতাও কেটে যাওয়ার বার্তাই এদিন দিয়েছেন শাহ। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার লক্ষ্যে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। গুন্ডা দমনকে আইনে পরিণত করতে বিল পাশ হয়েছে বিধানসভায়। কিন্তু গরিব খেটেখাওয়া মানুষের দিনবদলের ইঙ্গিত কি মিলেছে কিছু এই দু’মাসে? তারাতলা থেকে বারুইপুর গাফিলতির দায় কার? পুলিশের চরিত্র, প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার কিছুমাত্র বদল হচ্ছে না কেন? রং না দেখে শাস্তি দিতে হবে। তবেই এই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হবে বিজেপি সরকার।
পুরোনো শাসকের দুর্নীতি ও কলঙ্ক বিচারে অদ্ভুত শাস্তিবিধান! একই অপরাধে কেউ ডিম থেরাপির শিকার, গারদের ভাত খাচ্ছেন, বাকিরা দিব্যি সেটিং করে কামাইয়ের নতুন পথ খুঁজছেন! দিল্লি গিয়ে স্পিকারের ঘর আলো করে বসছেন। কেউ আবার হোটেলে গেরুয়া নেতার সঙ্গে দেখা করে নিজেকে নিরাপদ করে নিচ্ছেন অনায়াসে। তৃণমূল ভাঙতে পারলেই, সংসদে পক্ষে ভোট দিলেই সাতখুন মাফ! এর নিট ফল রাজ্যের বিরোধীরা আজ কার্যত সাজানো পুতুল। শুভেন্দুবাবুর অনুমতি ছাড়া স্পিকটি নট! এই কি পরিবর্তন? না মানুষের আবেগের সঙ্গে নির্মম ধোঁকাদারি! এঁদেরই কারও ৭০টা বাড়ি, বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা ঝুলছে। সন্দেহটা সেই কারণেই। আর জি কর হাসপাতালে গভীর রাতে এক মহিলা ডাক্তারের উপর পাশবিক নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় দেশ বিদেশ কেঁপে গিয়েছিল। ভরসার জমানাতেও তার কিছু কি বদলালো বিশেষ? বারুইপুরের নৃশংস ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, শাসক বদলায়, স্লোগান পাল্টায়, রঙের রকমফের হয়, বাকি সব এক থাকে। থমথমে বারুইপুরে এখন ভয়ের রাজত্ব। তারাতলায় চাপা পড়ে গিয়েছে আমাদের অন্তরাত্মা। ইতিহাসের শিক্ষা একটাই, রাজা বদলায়, পোশাক পালটায়, কিন্তু রাজ্যপাট একই থাকে। এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। শুভেন্দুবাবু মহিলাদের উপর অত্যাচার রুখতে কমিটি গড়ার কাজ করেছেন অল্প সময়েই। সমস্যা দেখলেই গড়া হচ্ছে সিট। ভরসার স্লোগান দিলেই কি সমাজ বদলায়, নাকি বদলায় শুধু ভাষা? স্থান পরিবর্তন করে শাসক আর বিরোধী। বাকি সব দাঁড়িয়ে থাকে একই জায়গায়। বিচারবোধ, নৈতিকতা মূল্যবোধ। এমনকি প্রতিবাদও ক্রমশ ‘সিলেকটিভ’ হয়ে উঠছে আজকের সমাজে। অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখার আগে আমরা বিচার করি, তার পিছনে কোন রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে! আমার অবস্থানটাই বা কী? কী বললে ফায়দা আর ব্যক্তিগত সুরক্ষা! গ্রেফতার, বিচার এবং শাস্তি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সমাজের চরিত্র যদি একই থেকে যায়, যদি রাজনৈতিক প্রভাবের সামনে সমাধান বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে, তাহলে শুধু আইন করলেই কি পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে?
মঙ্গলবার বারুইপুরে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আশ্বাসও দিয়েছেন সুবিচারের। কিন্তু প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তবায়িত হয়। এটাই তাঁর পরীক্ষা। জনগণ কিন্তু সব দেখছে। দু’বছর আগে ‘জাস্টিস’, ‘রাতদখল’ শব্দগুলো যেন শেল হয়ে বিঁধত। শুনলেই মেজাজ হারাতেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৪ সালে আর জি করের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের সুবিচার চেয়ে পথে নামা আন্দোলনকে ‘হুজুগ’ বলে মনে করতেন। আন্দোলনকারীদের কাউকে নকশাল, কাউকে অতি বাম বলে দাগিয়ে দিতে পিছপা হননি। ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ স্লোগান শুনলে সপাটে জবাব দিতেন, জাস্টিস তো পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যিখানে কেটে গিয়েছে দু’টো বছর। বিধানসভা ভোটে গোহারা হেরে রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্ব হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু সেদিনের সেই ‘জাস্টিস’ সুরই এখন মমতার গলায়! ‘তোমার আমার এক সুর/ জাস্টিস ফর বারুইপুর।’ আর সেদিনের বিরোধীরাই আজকের শাসক। রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়েছে গুন্ডাদমন বিল। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে আগস্টেই বিধানসভায় বিল পেশ হতে চলেছে। রাজ্যে পালাবদলের পর কেটেছে দু’মাস। আর এই কয়েকদিনের মধ্যেই একাধিক কাজ করেছেন শুভেন্দুবাবু। ইতিমধ্যেই অন্নপূর্ণা যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, লাখপতি দিদি-সহ বিভিন্ন প্রকল্প রাজ্যে চালু হয়েছে। দুর্নীতির তদন্তের জন্য কমিটি গড়েছেন। এবিষয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘যাঁরা দুর্নীতি করেছিলেন তাঁরা তৈরি থাকুন। কমিটির রিপোর্ট এলেই হিসাব হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীও বারুইপুরে বলেছেন, কাউকে ছাড়া হবে না। নিঃসন্দেহে সাধু পদক্ষেপ। বিচার যেন রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। বারুইপুরেও রং না দেখেই যেন দোষী শাস্তি পায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে তদন্ত করে দেখতে হবে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল? কেন ১২ কিলোমিটার যেতে বাহিনীর কর্তাদের তিনঘণ্টা লাগল? এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলবে না। এটাই নতুন সরকারের অগ্নিপরীক্ষা। শুভেন্দুবাবু, আপনাকে কথা রাখতে হবে।