Bartaman Logo
২৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রামের নামে দুর্নীতি!

শিশুপালের কতগুলি অপরাধ ক্ষমা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ? গুনে গুনে ঠিক ১০০টি। কারণ, পিসি শ্রুতশ্রবাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি।

রামের নামে দুর্নীতি!
  • ৭ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: শিশুপালের কতগুলি অপরাধ ক্ষমা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ? গুনে গুনে ঠিক ১০০টি। কারণ, পিসি শ্রুতশ্রবাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি। পাপের ঘড়া পূর্ণ হতেই ঝলসে উঠেছিল সুদর্শন চক্র। সনাতনী ধর্মের আপ্তবাক্য এটাই—পাপের ঘড়া পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ঈশ্বর সুযোগ দেন। অপেক্ষা করেন। তারপর...।

Advertisement

রামমন্দিরে ‘ডাকাতি’র একের পর এক খোসা খুলে যাওয়ায় একটাই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে—একে বিজেপির কত নম্বর অপরাধ হিসাবে ধরা যেতে পারে? মনে হতেই পারে... কয়েকজন ব্যক্তি তো চুরি করেছে। তার জন্য গোটা বিজেপিকে দায়ী করা হবে কেন? কারণ একটাই—কৃতিত্ব নিলে দায়ও নিতে হবে। আর যখন পুরো বিষয়টা স্বয়ং শ্রীরামের অযোধ্যায় হয়েছে। 
বিজেপির ‘জন্ম’, বাবরি সৌধ ধ্বংস, খাঁচা খুলে বিভাজনের রাজনীতির আত্মপ্রকাশ (সেই ব্রিটিশদের শেখানো ডিভাইড অ্যান্ড রুল), শরিকের কাঁধে ভর করে অটলবিহারী সরকারের ক্ষমতায় আসা, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নরেন্দ্র মোদির শাসনকালের সূচনা। এই পুরো ঘটনাক্রমের নেপথ্যে পুরোমাত্রায় ছিল রামমন্দির। বিজেপি আসলে অনেক দূরেরটা দেখে রাজনীতি করে। আজ থেকে পাঁচ বছর পর কী হবে, সেটা বিশ্লেষণ করে সেইমতো ঘুঁটি সাজায়। সংঘ হোক বা দল, তারা জানত... ক্ষমতায় যদি কেউ আনতে পারে, তাহলে তা মন্দির রাজনীতি। হিন্দুত্বের জিগির তুলে আম জনতাকে বোঝাতে হবে, আমরাই রামলালাকে নিয়ে আসব অযোধ্যায়। সাধারণ মানুষ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, সংসারের অশান্তির জ্বালায় এমনিতেই বার্নল হাতে নিয়ে ঘোরে। এইসব থেকে মুক্তির উপায় বলতে ঈশ্বরের শরণ। আর বিজেপি তো শ্রীরামের দূত হিসাবেই ‘প্রতিষ্ঠিত’। তাই তাদের বিশ্বাস করাই যায়! মানুষ এমনটাই ভাবল, তাদের বারবার ভোট দিল, আর আশা করে গেল... এই বছর বোধহয় আচ্ছে দিন আসবে। কিন্তু একযুগ পেরনোর পর কী দেখল? রামমন্দির দুর্নীতি। যে ভগবান রাম তাদের ভোটব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর ঘরেই চুরি! এবং দিনে ৬ থেকে ৮ লক্ষ টাকা! আর কী কী উধাও হয়েছে? সোনার রামচরিতমানস, রুপোর কাকভূষণ্ডির মূর্তি সহ প্রচুর দানসামগ্রী। অনেকে বলবেন, সবটাই অভিযোগ। আর কয়েকজন ব্যক্তির চুরির জন্য দলকে কি দায়ী করা যায়? উত্তর হল, হ্যাঁ যায়। কারণ, যাঁদের তত্ত্বাবধানে রামমন্দিরে চুরি শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, তাঁদের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারই বসিয়েছে। ট্রাস্টের ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ন’জনই কোনো না কোনোভাবে সংঘের সঙ্গে জড়িত। মারা গিয়েছেন একজন। আর অযোধ্যায় থাকার সুবাদে পুরো নিয়ন্ত্রণই হাতে ছিল চম্পত রাই, ধীরেন্দ্র দাস ও অনিল মিশ্রর হাতে। চেয়ারম্যান নিত্যগোপাল দাস অযোধ্যায় থাকেন ঠিকই। কিন্তু তিনি শয্যাশায়ী। আরও কয়েকটা সমীকরণ আছে। যেমন, রামমন্দির নির্মাণ কমিটির প্রধান হিসাবে পিএমও’র সচিব নৃপেন্দ্র মিশ্রের ট্রাস্টে থেকে যাওয়া, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি প্রশান্ত লোখাণ্ডের উপস্থিতি (তিনি আবার অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিবও)। এরপরও কি বলা যাবে না যে, চুরির দায় বিজেপির? সরকারের? সংঘের? দিনের পর দিন এভাবে দানসামগ্রী চুরি হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা মানুষের কষ্টার্জিত, তিল তিল করে জমানো... শ্রীরামের পায়ের কাছে রেখে গরিব-প্রান্তিক মানুষরাও শান্তি পেয়েছেন। আজ তাঁরা দেখছেন, সেই প্রণামি চলে গিয়েছে গেরুয়া বেশধারী কয়েকজন ভণ্ড, কয়েকজন চোরের পকেটে। ১২ হাজার টাকা বেতনে কেউ ২৫ লক্ষ টাকার বাড়ি কিনেছে। কেউ স্রেফ নগদ জমিয়েছে। কারও বাড়িতে মিলেছে দানবাক্সও। তারা সমাজবাদী পার্টির কর্মী নিশ্চয়ই নন! বিজেপি বা সংঘের ঘনিষ্ঠ না হলে রামমন্দিরে ‘সেবা’র দায়িত্ব পাওয়া যায় না। আর এই অঘোষিত শর্ত ভারতের যে কোনো শিশুও জানে। তাহলে চুরির দায় কেন বিজেপি নেবে না? কেন স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঝাঁপিয়ে পড়বেন না? কেন মোহন ভাগবত শুধু দায় এড়ানোর মতো ‘দোষীরা শাস্তি পাক’ বলে চুপ করে যাবেন? 
ভারতের ‘গণতন্ত্রে’ ভোটারদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল, তারা ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার পর শাসকে এমনই আপ্লুত হয়ে যায় যে, তাকে পারলে শ্রীকৃষ্ণের আসনে বসিয়ে ফেলে। অথচ, শিশুপালের বেশি তার ভূমিকা তার হওয়ার কথা নয়। রাজনৈতিক দল আমাদের কাছে আসে ভোটভিক্ষা করতে। প্রতিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে বিষ ঢালে, তারা ক্ষমতায় এলে কী কী করবে, সেই সবের আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দেয়, তারপর কুর্সিতে বসে নিজেদের আখের গোছাতে থাকে। আমরাও এসব দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু গোনার কাজটাও কি ভুলে মেরে দিয়েছি? এখনও কি শিশুপালের আসনে বসানো যায় না শাসককে? পাপের ঘড়ায় উঁকি দেওয়া যায় না? সবচেয়ে বড়ো অপরাধ, ঔদ্ধত্য। ‘আমরা রামলালাকে অযোধ্যায় নিয়ে এসেছি’। শ্রীরাম এই ভূভারতের সর্বত্র আছেন। তাঁকে অযোধ্যায় নিয়ে আসা আর সূর্যকে টর্চ দেখানো ব্যাপারটা একই। বরং বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছেন শ্রীরাম। তাঁকে সামনে রেখে চালিয়ে যাওয়া প্ল্যানড রাজনীতি। আর এখন? প্ল্যানড দুর্নীতি। মাত্র দু’বছরে এই পরিমাণ চুরি! জন্মগত অধিকার তো নয়! শ্রীরামের দেওয়া অধিকারও নয়। তাহলে এই সাহস কে দিল? আজ পর্যন্ত কেদার-বদ্রীনাথে চুরির অভিযোগ ওঠেনি। এবার সেটাও উঠে গিয়েছে। বিজেপির শাসনকালে। মোদি জমানায়। উত্তরপ্রদেশে রামমন্দির হোক বা উত্তরাখণ্ডে চারধাম... সরকার তো বিজেপিরই। ভাবটা কী তাদের? ঈশ্বরে ‘কপিরাইট’ নিয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, এখনও রামমন্দির দুর্নীতি নিয়ে এত শাকের আয়োজন কেন? কী ঢাকতে? কয়েকজন সাধারণ সিকিওরিটি গার্ডের রোজ লক্ষ লক্ষ টাকা সরানোর সাহস হবে? উত্তর জানার জন্য আইপিএস অফিসার হওয়ার প্রয়োজন নেই। নজর করার মতো বিষয় হল, এই এক রামমন্দির ইস্যু কিন্তু আরএসএসের যাবতীয় এজেন্ডাকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। উপরন্তু বাংলায় সরকারে আসা এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে দেশজুড়ে যে আলোচনার ঝড় উঠেছিল, তাও হঠাৎ অন্ধকারে চলে গিয়েছে। এমনকি লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ নিয়েও দিল্লির দরবারে আর আলোচনা নেই। এই প্রবণতা বিজেপির তো বটেই, সংঘের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্যও ক্ষতিকারক। বিরোধীদের ‘হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাস’ বা দেশবিরোধী কার্যকলাপের যাবতীয় অভিযোগ যোজনখানেক দূরে ফেলে একটা আলাদা ইমেজ জনমানসে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এবার তাতেও কালির দাগ পড়েছে। রামমন্দির আন্দোলনের পুরোভাগে সবসময় থেকেছে সংঘ পরিবার... বিশেষত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা এখন রীতিমতো ব্যাকফুটে। সংঘের একটা অংশ তো এমনও বলছে, ‘এর থেকে সন্ত্রাসের অভিযোগ ভালো। কারণ, সাধারণ মানুষ ওই অভিযোগ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এটা তো চোখের সামনে দেখা গিয়েছে। প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। শেষপর্যন্ত এই কয়েকজনের জন্য চোর তকমা বইতে হবে!’ সংঘ এখন উত্তরপ্রদেশ সরকারের গড়ে দেওয়া সিটের উপর আস্থা রাখছে। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার পথে। যে রামরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতার শিখরে পৌঁছানো, সেই রামের নামেই দুর্নীতির প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছে। আম জনতাও গুনছে। শিশুপালের সুবিধা ছিল, কারণ শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে অপরাধের সংখ্যা গুনে দিয়েছিলেন। ভারতবাসী কিন্তু গুনে দেয়নি। বরং ঈশ্বরের বরপুত্রের আসন থেকে সরিয়ে শিশুপালের জায়গায় ইতিমধ্যে বসিয়ে দিয়েছে কি না, সেটাও জানা নেই। আর হ্যাঁ, ভারতবাসী এতদিনে স্বামী বিবেকানন্দের সেই চিরসত্যটি আজ আবার খুঁজে পেয়েছে—সনাতন ধর্ম নিজেই এতটা মহান যে তাকে তুলে ধরার জন্য কোনো সাধারণ কাঁধ প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দুত্বের ছত্রধরের চাকরিটা যে মোটামুটি যাওয়ার পথে, সেটা নিশ্চিত। এই প্রসঙ্গে আর একটি মন্দিরের কথা বলতেই হয়। গোরক্ষনাথ। যোগী আদিত্যনাথ যার মহন্ত। মন্দির ছাড়াও এর অধীনে চলে বহু স্বাস্থ্যশিবির, হাসপাতাল, পাঠশালা, যাত্রী বিশ্রামাগার, সেবাশ্রম। কিন্তু এক পয়সার চুরি গোরক্ষনাথ মন্দিরে হয় না। দান হোক বা খরচ, ব্যালান্স শিট পরিষ্কার। এই মন্দিরের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হিসাবের দায়িত্ব কার? ইয়াসিন আনসারি। প্রায় ৫০ দশক ধরে তিনি যুক্ত গোরক্ষনাথের সঙ্গে। মহন্ত বদলেছে। বদলাননি ইয়াসিন আনসারি। হয়নি দুর্নীতিও।
শাসন হোক বা দুর্নীতি। প্রশ্ন তাই মানসিকতার। ধর্মের নয়।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ