বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে মহিলাদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব হতে দেখা গিয়েছে বিজেপিকে। শোনা গিয়েছে, ‘ভরসা ইন, ভয় আউট’-এর নিশ্চিত প্রতিশ্রুতির কথা। সেই ভরসার আশ্বাসে আস্থা রেখে রাজ্যে প্রথম গেরুয়া সরকার গড়তে বিজেপিকে দু’হাত ভরে ভোট দিয়েছে জনতা-জনার্দন। কিন্তু টাটকা স্মৃতি হাতড়ে দেখা যাচ্ছে, গত দু’ মাসে শাসক ও বিরোধীর নাম-গোত্র বদলেছে ঠিকই, কিন্তু অপরাধ ও শাসকের দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা কিছু মানুষের চেহারায় বিশেষ বদল হয়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, নয়া জমানায় ভগবানপুর, মেদিনীপুর, পটাশপুর, কোচবিহার, দুর্গাপুর, বেহালা, দিনহাটা, পানিহাটিতে শ্লীলতাহানি-সহ একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিকতম উদাহরণ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর। সেখানে যৌন নির্যাতন করে খুন করা হয়েছে এক কিশোরীকে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগের পাহাড়। চিত্রনাট্য প্রায় এক। কোথাও শাসক দলের যোগ, কোথাও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, কোথাও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ! বারুইপুরের ঘটনায় এক সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে উন্মত্ত জনতা! রবিবার কোচবিহারের শীতলকুচিতে গোরক্ষক বাহিনীর হাতে এক ব্যক্তি খুন হয়েছেন বলেও অভিযোগ। ফলে নতুন সরকারের আমলে শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বারুইপুরের ঘটনার অভিযোগ গুরুতর। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী, বছর বারোর এক নাবালিকা শনিবার বান্ধবীর জন্য উপহার কিনতে বেরিয়েছিল। সে রাত পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় পরিবার পুলিশে সেকথা জানায়। অভিযোগ, পুলিশ সে সময় নিষ্ক্রিয় থাকে। অগত্যা পাড়ার লোকজনই বিভিন্ন দোকানের সিসিটিভি খতিয়ে দেখে অনুসন্ধান চালান। বস্তাবন্দি অবস্থায় একটি পুকুর থেকে মেয়েটির নিথর দেহ উদ্ধার হয়। পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করে তাঁরাই পুলিশের হাতে তুলে দেন। গোটা ঘটনায় চার পাঁচজন অভিযুক্ত বলে পুলিশের কাছে অভিযোগও জানান স্থানীয়রা। কার্যত যে কাজ পুলিশের করার কথা সেই কাজ সম্পন্ন করেন স্থানীয়রা। এখানেই শেষ নয়, অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় এক বিজেপি নেতা থানায় প্রভাব খাটিয়ে অভিযুক্তদের নাকি ছাড়িয়েও আনেন। এতেই ক্ষোভের আগুন জ্বলে। স্থানীয় ওই বিজেপি নেতা ও পুলিশের এই ভূমিকার প্রতিবাদে রবিবার প্রায় দিনভর রেল-রাস্তা অবরোধ হয়, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর হয়, একাধিক পুলিশ জখম হন। বিক্ষোভকারীদের হটাতে পুলিশ পালটা টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, লাঠিচার্জ করে। যে সরকার রাজ্যে আইনের শাসন কায়েম করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেখানে জনতা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিয়ে একজন সন্দেহভাজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে! যথাসময়ে পুলিশ তৎপর হলে ওই নাবালিকা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত, একথাও বলেছেন অনেকে। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর যথোচিত আশ্বাসে অবরোধ ওঠে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। পুলিশি সক্রিয়তাও বাড়ে। ইতিমধ্যে মূল অভিযুক্ত সহ কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে, যা সঠিক উদ্যোগ। তবে বারুইপুরের ঘটনার পর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাহারানো পরিবারের কাছে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে কালীঘাটের বাড়িতেই ‘নজরবন্দি’ করে রাখা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। এক্ষেত্রে অবশ্য পুলিশি তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কোনো দোষী ছাড় পাবে না, কড়া শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তদন্তে ৬ সদস্যের সিটও গঠিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিহত নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে কথাও বলেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযুক্ত ও তার মদতদাতা কেউ শাসকদলের ঘনিষ্ঠ বলেই কি পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত গা ঘামানোর চেষ্টাই করেনি পুলিশ? পুলিশের সামনেই একজনকে পিটিয়ে মারার ঘটনাকে কোনোভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দাবি করা যায় না। ঘটনা পরম্পরায় দেখা যাচ্ছে, পালাবদলের পর থেকে গোটা রাজ্যে যেভাবে ডিম ছুড়ে আক্রমণ করার সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা থামার কোনো লক্ষণ নেই। অথচ এই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছে আদালত। বিজেপির রাজ্য সভাপতিও মনে করেন, এতে গোটা দেশের কাছে এরাজ্যের ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে। তবু পুলিশের নাকের ডগায় কোথাও বিজেপির পতাকা উড়িয়ে ডিম ছোড়ার সংস্কৃতি অব্যাহত, যার হাত থেকে রেহাই পাননি মহিলা সাংসদও। বিজেপি নেতারা একে ‘জনরোষ’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও পুলিশ-প্রশাসনের নীরব দর্শকের ভূমিকা কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকেই আঙুল তুলবে। প্রশ্ন হল, পালাবদল হলেও পুলিশের চরিত্র কি বদলাবে না? নাকি সেই দলদাসের তকমা নিয়েই চলবে পুলিশ? সন্দেহ নেই, ডিম ছোড়া কিংবা পিটিয়ে হত্যা— এসবই আইনশৃঙ্খলার অবনতিকেই ইঙ্গিত করে। নির্বাচনের আগে কিংবা ক্ষমতায় আসার পরও শাসক দলের মুখে আইনের শাসন, ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা শোনা যাচ্ছে মুহুর্মুহু। ইতিমধ্যে আরও কঠোর গুন্ডাদমন আইন তৈরির বিলও পাসও হয়েছে বিধানসভায়। সরকার বলেছে, নারী নির্যাতনের ঘটনা যাতে না হয় সেক্ষেত্রেও তারা জিরো টলারেন্স। কিন্তু গত দু’মাসে বিভিন্ন ঘটনায় চরিত্র বুঝে আইনরক্ষকদের কোথাও অতি সক্রিয়তা, কোথাও নিষ্ক্রিয়তার যে চেহারাটা দেখা গিয়েছে তা কাম্য নয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, কথায় ও কাজে এক থাকার অঙ্গীকার করেই কিন্তু তারা ক্ষমতায় এসেছে।