চৈতন্যলীলা থিয়েটার দেখতে যাওয়ার কথা উঠল। কথা হচ্ছে চৈতন্যলীলার অভিনেত্রীরা বেশ্যা। কিন্তু ঠাকুর বলছেন, ‘আমি তাদের মা আনন্দময়ী দেখবো।’ আরও বলছেন, ‘শোলার আতা দেখলে সত্যকার আতার উদ্দীপন হয়।’ এরপর উদ্দীপনার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিলেন। এই যে, association of ideas—এর থেকে একটি জিনিস অন্য জিনিসের উদ্দীপনা এনে দেয়। ঠিক ভক্ত যিনি তাঁর কোনো কামনা নেই শুধু শুদ্ধা ভক্তি প্রার্থনা করেন।
সিদ্ধাই-ঈশ্বরলাভের পথে বিঘ্ন
এরপর সিদ্ধাই-এর অসার্থকতার কথা বলছেন। সিদ্ধাই-এর সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের কোনো সম্বন্ধই নেই। এগুলি অগ্রসর তো করায়ই না বরং সাধকের জীবনে বিঘ্ন ঘটায়। ভগবান বলছেন, অষ্টসিদ্ধির একটা থাকলেও আমাকে পাবে না। তাই ঠাকুর বার বার সিদ্ধাই-এর ব্যাপারে সাবধান করে দিচ্ছেন। এরা ক্রমে ভগবানকে ভুলিয়ে দেয়, বিপথে চালিত করে। সাধারণ লোকের ধারণা সাধুরা হাত দেখতে জানেন, ওষুধ দিতে জানেন, চাকরী করে দিতে পারেন—এইরকম অলৌকিক শক্তির অধিকারী। সাধুর কাছে এসে লোকে তাই এইসব প্রার্থনা করে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একবার আমি এক ধনীগৃহের অতিথি হয়েছি। তাঁর এক আত্মীয়া এসে আমাকে বললেন, আপনি হাত দেখতে জানেন? বললাম, না। আপনি কোষ্ঠী বিচার করতে জানেন? বললাম, না। তাহলে আপনি কি জানেন? আমিও ভাবছি কি জানি! তখন গৃহস্বামী ভদ্রলোক খুব লজ্জা পেয়ে বললেন, ওঁরা ওসব করেন না, ওঁদের ওসব বলবেন না। লোকে এইরকম আশা করে। তবে এর একটা কারণও আছে। বৌদ্ধযুগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা অনেকে রোগের ওষুধপত্র জানতেন এবং লোকের মঙ্গলের জন্য সেই ওষুধ বয়ে নিয়ে বেড়াতেন। তাঁদের কাছে চাইলে তাঁরা ওষুধ দিতেন। তাই লোকের ধারণা সাধু হলেই বুঝি ওষুধ জানবেন, আমরা জানি না বললেও তা লোকে বিশ্বাস করে না। তারপর বলছেন, সরল হতে হয় আর বিনয়ী হতে হয়। ‘আমি বুঝেছি, আর সব বোকা—এ বুদ্ধি ক’রো না। সকলকে ভালবাসতে হয়। কেউ পর নয়।’ শ্রীশ্রীমাও বলেছেন, জেন, কেউ পর নয়, সবাই আপনার। প্রহ্লাদের কাহিনীর ভিতর দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, ‘হরি একরূপে কষ্ট দিলেন। সেই লোকদের কষ্ট দিলে হরির কষ্ট হয়।’ কারণ সর্বভূতে সেই এক হরিই বিরাজমান।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে