সমৃদ্ধ দত্ত: বঙ্গসমাজ এবং রাজনীতিতে সবথেকে দ্রুতহারে বিগত কয়েক দশক ধরে বেড়েছে দম্ভ, হিংসা এবং আইনভঙ্গ। এই তিনটিই ছোঁয়াচে এবং নিয়ন্ত্রণহীন। ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া জরুরি অবস্থার সময় ট্রেন সঠিক সময়ে চলছিল। সরকারি দপ্তরে কাজ হচ্ছিল নিয়মমতো। অপরাধ কমে গিয়েছিল। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এসব তো সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ারই কথা। অথচ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জরুরি অবস্থা জারির কারিগর ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর দলকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল জনগণ।
পরাজিত হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী নিজে এবং তাঁর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী। কেন? কারণ, সবকিছু ছাপিয়ে যে বার্তা প্রকটভাবে জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটি হল ঔদ্ধত্য। ইন্দিরা গান্ধী, সঞ্জয় গান্ধী এবং তাঁদের অনুগামী বশংবদ নেতৃবৃন্দর অপরিসীম দম্ভ এবং ঔদ্ধত্যের শিকার হয়েছিলেন নিজেদের অজান্তে। একে বলা হয় ক্ষমতার দম্ভ। সেই দম্ভে ‘গণতন্ত্রকেও আমরা নিয়ন্ত্রণ করব’, এই ফাঁদের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন মাতা-পুত্র।
১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় বঙ্গে কংগ্রেস রাজত্বেও পাড়ায় পাড়ায় জোর করে চাঁদা আদায়, বিরোধীদের হত্যা, রিগিং করে নির্বাচনে জয় ইত্যাদি কারণে মানুষ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। তাই বঙ্গে সেই পরিবর্তন ছিল প্রত্যাশিত। কারণ ছিল, দম্ভ, হিংসা ও আইনভঙ্গ।
৩৪ বছরের রাজত্বকালে সিপিএমের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না। বরং ভূমিসংস্কার, সফল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এসবই ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। অথচ সিপিএমকে সবথেকে বেশি ক্ষতি করেছে সেই ঔদ্ধত্য, দাদাগিরি এবং আইনকে ছাপিয়ে লোকাল কমিটির আইন সমান্তরালভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে যাওয়া। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের তিনটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। যা তাঁর কাছে প্রত্যাশাই করা যায় না। অথচ ক্ষমতার দম্ভে তাঁর মুখ থেকেও বেরিয়ে গিয়েছিল ওই মন্তব্যগুলি।
তিনি বর্তমান সংবাদপত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, বর্তমানকে ছুঁচোর মতো টিপে মেরে ফেলতে পারি। বিরোধীদের গুরুত্ব না দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমরা ২৩৫ ওরা ৩০। ওদের কথা কেন শুনব?’ নন্দীগ্রামের একটি হত্যাকাণ্ডের জেরে তিনি বলেছিলেন, দে হ্যাভ বিন পেইড ব্যাক বাই দেওয়ার ওন কয়েন। জনগণ ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়েছিল ওই ঔদ্ধত্যে।
পাড়ায় পাড়ায় এবং রাইটার্সে অসংখ্য মুখ্যমন্ত্রীর জন্ম হয়েছিল। ঠিক সেই কারণেই সিপিএমকে মানুষ হারিয়ে দেয়। কার্যত সুযোগটি নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজও সিপিএম আত্মবিশ্লেষণ করে দেখতে পারে যে, বুদ্ধদেববাবুর ওই মন্তব্যগুলি অথবা পাড়ার উদ্ধত নেতাদের প্রশ্রয় দেওয়া তাদের রাজনৈতিকভাবে আদৌ কি কোনো লাভ দিয়েছে? নাকি দীর্ঘকালীন ক্ষতি করেছে?
এই দম্ভ, ঔদ্ধত্যের সঙ্গে আবার দুর্নীতিকেও আমদানি করেছে তৃণমূল সরকার। অতএব সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা হারানোর প্রবণতা শুরু হয়ে যায়। যা নিপুণ প্রশাসনিক দক্ষতায় প্রতিহত করা সম্ভব ছিল। যেহেতু সিপিএমের উদাহরণ মনে রয়েছে। সেটি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করতে সচেষ্ট হননি। বরং একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসা থেকে রাজ্যকে বিরোধীশূন্য করে দেওয়ার অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি। তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাস্তাঘাটে মানুষের সবথেকে বড়ো অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় সেটি কিন্তু ওই দম্ভ, আইনভঙ্গ ও হিংসা। সঙ্গে দুর্নীতি।
অথচ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসংখ্য প্রকল্প সত্যিকারের জনমুখী। নিম্নবর্গের মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার নানাবিধ পন্থায় বাজারে অর্থের জোগান অব্যাহত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আবার সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ। বিরোধীদের উপর আক্রমণ ও হিংসার রাজনীতি।
সিপিএম এবং তৃণমূলের নেতামন্ত্রীরা যে অসুখে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই একই অসুখ এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিজেপির কিছু নেতামন্ত্রীর মধ্যে। সেটি হল হুমকি, হুঁশিয়ারি, দম্ভের ভঙ্গিতে কথা বলা। বিনয়ী, ভদ্রোচিত, নম্র শব্দোচ্চারণ কার্যত যেন অন্তর্হিত হয়েছে বঙ্গরাজনীতি থেকে। সংবাদমাধ্যমে অথবা সভা সমাবেশে কিংবা কর্মিসভায় লক্ষ্য করা যায় বিজেপির নেতামন্ত্রী একাংশের মধ্যে কঠোর বাক্য, বিরোধীদের অপমান, অসম্মান করার লক্ষ্য নিয়ে শব্দচয়ন এবং হুঁশিয়ারির ভঙ্গি।
রাজনীতি হল সমাজের দর্পণ। সমাজেই এই প্রবণতাটি আজকাল অনেক বেড়ে গিয়েছে। ‘ভদ্রলোক বাঙালি’ নামক একটি শব্দবন্ধের আইডেনটিটি ভারতের বাইরে প্রচলিত। এই আইডেনটিটি ফিরিয়ে আনতে পারে একমাত্র রাজনীতি। কারণ সাধারণ মানুষ সবথেকে বেশি মননগতভাবে নিমজ্জিত থাকে রাজনীতির চর্চায়। বঙ্গের রাজনৈতিক তথা সামাজিক পরিবেশ ও চরিত্রকে যদি আবার ফিরিয়ে আনতে হয় সুস্থ স্বাভাবিকতায়, তাহলে সেই দায়িত্ব পালন
করতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক দল ও শাসক। কারণ এই রাজনৈতিক সম্প্রদায়কে যদি জনতা দেখে গঠনমূলক কথা বলতে, বিরোধিতার মধ্যে থাকছে ভাষার উপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা অপশব্দের ব্যবহার কেউ করছে না, তাহলে ধীরে ধীরে হলেও তার প্রভাব পড়বে সমাজে।
কিন্তু ঠিক উলটো ঘটছে। আজকাল সকলেই কেমন যেন ধমকে কথা বলে। নেতামন্ত্রীদের মধ্যেও এই ছায়া। আবার মনে রাখতে হবে ঔদ্ধত্য এবং দম্ভ গণতন্ত্রে সবথেকে বড়ো ক্ষতিকর। বিজেপির মন্ত্রীদের একাংশ এখনও নেতা হয়ে রয়েছেন। মন্ত্রী হওয়ার গুরুত্ব ও ভাবমূর্তি সম্পর্কে তাঁরা এখনও অবগত হতে পারছেন না। অবিলম্বে সেই নতুন ইমেজ আত্মস্থ করা শিখতে হবে তাঁদের।
এই যে দু মাস কেটে গেলেও বিরোধীদের উপর ডিম ছোড়া হচ্ছে, এটা কিন্তু শাসক ঠেকাতে পারছে না। বিজেপি ও সরকারের কাছে সবথেকে বড়ো উদ্বেগের হল, সর্বোচ্চ স্তরের নেতাদের কথা তাঁদের অনুগামীরা গ্রাহ্য করছে না। আর তাই সর্বোচ্চ স্তরের নেতামন্ত্রীরা যতই বিরোধীদের উপর ডিম নিক্ষেপ অথবা মারধরের নিন্দা করুন, তাঁদের কথার যেন কোনো মূল্যই নেই নীচুতলায়। এই বার্তাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পুলিশকে দর্শক সাজিয়ে যখন বিরোধীদের উপর চরম অত্যাচার করা হয়, তখন সর্বাগ্রে যে প্রশ্নটি নীরবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সেটি হল, এই জনতার উপর আসলে সরকার অথবা নেতাদের নিয়ন্ত্রণই নেই। সুতরাং তাঁরা কী বললেন না বললেন, এই জনতা সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনেই করে না। জনতা একবার যখন আইন নিজের হাতে নেওয়া এবং আইনভঙ্গের মজা পেয়ে গিয়েছে, তখন সেটি একটি নেশায় পর্যবসিত হয়েছে। যা তাদের কাছে উপভোগ্য। একজন বিরোধীপক্ষের মানুষকে সম্মিলিতভাবে প্রকাশ্যে ঢিল, পাথর, ডিম ছুড়ে ফেলা হবে, জামাকাপড় খুলে দেওয়া হবে, মোবাইলে ভিডিয়ো তোলা ইত্যাদি করতে ও দেখতে ভালো লাগছে। আর সেই ভালো লাগা ক্রমেই হয়ে উঠছে মজা ও বিনোদনের এক নেশা।
এই যে মাত্র দু’মাসেই সাধারণ গ্রাম্য ও শহুরে মানুষ পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে পাত্তা না দিয়ে নিজেরাই শাস্তি দিচ্ছে মনের মতো করে, এটা হল শাসকের কাছে উদ্বেগের। বিরোধীদের উপর আক্রমণ যারা করছে, তাদের তুলনায় দীর্ঘকালীন ক্ষতি হচ্ছে শাসকের। কারণ, আইনের শাসন নেই এটা বারংবার বলার সুযোগ পাচ্ছে বিরোধীরা। সরকার সম্পর্কে প্রশাসনিক অক্ষমতার বার্তা যাচ্ছে। এটা কি উপলব্ধি করা খুব কঠিন?
যে নেতামন্ত্রীরা এই কাজগুলিকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সমর্থন করছেন অথবা নিজেরাও আনন্দ পাচ্ছেন, তাঁদের দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে। সামাজিক মন বোঝারও ব্যর্থতা আছে। কারণ, এক শ্রেণির মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে, মারধর করছে, পোস্টে বেঁধে রাখছে একজনকে, এই দৃশ্যটি এক লহমায় ‘একজনকে ঘিরে ধরে অনেকে মারছে’ এই তকমা পেয়ে যায়। আর সেটা কেন মারছে? কারণ যারা মারছে তারা শাসক দলের। সুতরাং এই দুয়ে মিলে একটি বিরুদ্ধ অভিমতের জন্ম হয়।
এই সুযোগটি শাসক গোষ্ঠী বিরোধীদের দিচ্ছে কেন? তাদের লাভ কী? বরং আমাদের শাসনকালে আইন কঠোরভাবে বলবৎ, কেউ আইনভঙ্গ করতে পারবে না ইত্যাদি বার্তা গেলে, দীর্ঘকালীন অনেক লাভ হবে বিজেপি ও শাসকের। বিরোধীরা এমনিতেই ছত্রভঙ্গ। তৃণমূল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই মরিয়া। কেউ জানে না তৃণমূলের প্রতীক ও নাম কাদের হাতে থাকবে। সিপিএম এখনও সাংগঠনিকভাবে গোছানো নয়।
তাহলে এহেন বিরোধীদের উপর বারংবার আক্রমণ করে তাদেরই অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিজেপি প্রতিষ্ঠিত করে দিচ্ছে। প্রশ্ন হল, কেন? বিজেপি অথবা সরকারের কী লাভ হচ্ছে? নেতামন্ত্রীদের একাংশ দাম্ভিক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলছেন এবং নীচুতলার কর্মীদের কিয়দংশ সরাসরি হিংসার আশ্রয় নিচ্ছে। এই দুয়ে মিলে কার ক্ষতি? শাসক ও দলের।