এরপর ঠাকুর পণ্ডিত আর সাধুর পার্থক্য বলছেন। ‘শুধু পণ্ডিত যে, তার কামিনী কাঞ্চনে, মন আছে। সাধুর মন হরিপাদপদ্মে। পণ্ডিত বলে এক, আর করে এক। যাদের হরিপাদপদ্মে মন তাদের কাজ, কথা সব আলাদা।’ কাশীর নানকপন্থী এক সাধুর কথায় বলছেন, এরা একদিকে বেদান্তী আবার অন্যদিকে ভক্ত, দুই ভাবেরই সমন্বয় তাঁদের ভিতর দেখা যায়। যাঁরা বেদান্তবাদী তাঁরা অনেকে ভক্তি মানেন না। ভক্তিযোগীদের বেদান্তধর্মে নিম্ন অধিকারী বলে মনে করা হয়। আমরা তোতাপুরীর ব্যবহারে এর দৃষ্টান্ত দেখেছি। ঠাকুর হাততালি দিয়ে হরিনাম করছেন, তোতাপুরী বলছেন, ‘কেঁও রোটি ঠোক্তে হো?’ অর্থাৎ হাত চাপড়ে রুটি তৈরী করছ কেন? কট্টর বেদান্তীদের দৃষ্টিভঙ্গি এমনি। দোষ দেওয়ার কিছু নেই কারণ তাঁদের সংস্কারই এইরকম। তাঁরাও কম নন, তাঁরা জ্ঞানী, তীব্র বৈরাগ্য নিয়ে সাধনপথে চলেছেন কিন্তু ভক্তিযোগ সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা নেই। আর ভগবানের বিভিন্ন রূপকে তাঁরা মায়ার কার্য বলে বলেন। তাঁরা শুধু দুটি জিনিস বোঝেন, ব্রহ্ম আর মায়া। বলেন, জীব আর ঈশ্বর, দুই-ই মায়ার সন্তান। অর্থাৎ মায়ার দ্বারা জীবত্ব, মায়ার দৃষ্টিতে ঈশ্বরত্ব। এইরকম বেদান্তী হয়েও নানকপন্থীরা ভক্তিযোগকে উচ্চ স্থান দিয়েছেন। আমরা এই সম্প্রদায়ের অনেক সাধুদের দেখেছি, খুব ভক্তিমান। এইটিই ওঁদের বৈশিষ্ট্য।
ঠাকুরের কথা আলাদা। কোন বাদই তাঁর দৃষ্টি থেকে বাদ পড়েনি। তিনি একাধারে যোগী, ভক্ত, জ্ঞানী, কর্মী সব। তাঁর তুলনা হয়তো মিলবে না। সাধারণত সাধকেরা একে অন্যের পথকে বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চেষ্টা করেন না, ফলে একে অন্যের প্রতি দ্বেষভাব পোষণ করেন। ঠাকুর একেবারে বিপরীত কথা বলছেন, তুমি তোমার মতে নিষ্ঠা রাখ কিন্তু অন্য মতের সমালোচনা করার অধিকার তোমার নেই। তুমি কি সেইসব মতের অনুশীলন করে তাদের নিষ্ফলতা বুঝেছ? তোমার নিজের মতের সম্বন্ধেই বা তোমার কতদূর দৃঢ়তা আছে? নিজের মতবাদ সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট না থাকলে অপরের সঙ্গে নিজের তুলনা করবে কি করে? এইটি বিশেষ করে ভাববার জিনিস। আমরা কোনো বিষয়ে অজ্ঞ হলে সেই বিষয়কে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখি। যদি সত্যি সত্যি নিজেদের বিশ্লেষণ করে দেখি তাহলে বুঝতে পারব কত ক্ষুদ্র আমরা, কত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন। এই একছটাক জ্ঞান নিয়ে আমরা অপরের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে যাই যখন তখন তা আমাদের কত যে উপহাসাস্পদ করে তোলে একথা আমরা ভাবতেই পারি না।
আদর্শ ধর্ম
পূর্বোক্ত সেই নানকপন্থী সাধুর কথা বলতে গিয়ে ঠাকুর বলছেন, সাধুটি গীতাপাঠকালে বিষয়ী লোকের দিকে না চেয়ে আমার দিকে চেয়ে পড়তে লাগল। এই যে নিজের মতে আঁট, এই কঠোর বৈরাগ্য এর পরিণামে সংসারীদের প্রতি একটা উপেক্ষার দৃষ্টি এসে পড়ে। বিষয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা রাখতে গিয়ে বিষয়ীর প্রতি বিতৃষ্ণা এসে পড়ে।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে