এই সংসারে সকলেই বড় হইবার আশা পোষণ করে। ধনে সহস্র মুদ্রায় পতি লক্ষপতি হইতে অভিলাষী হন, আবার লক্ষপতি কোটীপতি হইবার আশা করেন। বিদ্যায়ও এইরূপ যিনি কিছু যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি অধিকতর যোগ্যতা লাভের প্রয়াসী হন। যশঃ, সম্মান, শরীরের সামর্থ্য– এইরূপ জাগতিক যে কোনও বিষয়ে অল্পের অধিকারী অধিক পাওয়ার জন্য উৎকণ্ঠিত। প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা ধনে, মানে, বিদ্যায় বা শক্তিতে বড় হইয়া কাহারও কখনও আশা পূর্ণ হয় না। “আশাবধিং কো গত?” পার্থিব বিষয় সমূহের যে কোনটিতে খুব বড় হইলেও যে অবস্থা চিরস্থায়ী নহে তাহা আমরা জানিয়াও সাময়িক সুখে মোহিত হইয়া নিজেদের অবস্থায় গর্বিত হই।
আমাদের শাস্ত্র সাবধান করিতেছেন—“সর্বে ক্ষয়ান্তা নিচয়াঃ পতনান্তাঃ সমুচ্ছ্রয়াঃ। সংযোগাশ্চ বিয়োগান্তা মরণান্তং হি জীবিতম্” অর্থাৎ পুঞ্জীভূত বস্তুরও একদিন শেষ হইয়া যায়, অত্যুচ্চ পদ হইতেও একদিন পতন অবশ্যম্ভাবী, সংযোগের পরই বিয়োগ আসিবে এবং জন্মের পরবর্তী মরণ। সংসারের কোনও অবস্থাই নিত্য নহে, সমস্তই নশ্বর। মহাকবি কালিদাস বলিয়াছেন—“নীচৈর্গচ্ছত্যুপরি চ দশা চক্রনেমি-ক্রমেণ”। মনুষ্যের অবস্থা চক্রধারার ন্যায় একবার নীচের দিকে নামে তারপর আবার উপরের দিকে উঠে তারপর আবার নামে এইরূপ চলে। শাস্ত্র সতর্ক করিতেছে—“আবিরিঞ্চমমঙ্গলম্” ব্রহ্মপদও যথার্থ কল্যাণের উপায় নহে সেখান হইতে ভ্রষ্ট হইতে হয়। বৈষ্ণব কবি গাহিয়াছেন—“কত চতুরানন মরি মরি আওত।”
এখন প্রশ্ন— মানুষ-মাত্রেরই বড় হইবার আকাঙ্ক্ষা থাকে সেই আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করিতে গেলে ধন, বিদ্যা, সামর্থ্য, সম্মান যাহাই জগতে লভ্য তাহা যখন অনিত্য ও পদ্মপত্রস্থ বারিবিন্দুর মত চঞ্চল বলিয়া হেয় তবে মানুষ কিসের দ্বারা বড় হইতে আশা করিবে? পৃথিবীর অনেক মনীষী উত্তর দিয়াছেন—ধন ও সামর্থ্য বিনাশশীল ঠিকই তবে জ্ঞানী গুণী ও নীতিপরায়ণ হইতে পারিলেই বড় হওয়া যায়। কিন্তু ভারতবর্ষের আর্যঋষিরা উক্ত প্রশ্নের অন্য প্রকার উত্তর দিয়াছেন। তাঁহাদের মত এই যে জ্ঞান, গুণ, নীতি যাহার দ্বারাই হোক যদি মহত্ত্বকে স্থির রাখিতে হয় উহাদের স্থির ও সনাতন পরমাত্মতত্ত্বের সহিত যোগ রাখিতেই হইবে। নীতিবাদের প্রতিষ্ঠা অধ্যাত্মবাদ। আত্মতত্ত্বকে বাদ দিলে নীতি স্থায়িত্ব লাভ করে না, স্বার্থলাভের জন্য সাময়িক প্রকাশ পায় মাত্র। ঈশ্বর সম্পর্করহিত মনুষ্যগণ গীতার ভাষায় “মোঘাশা মোঘকর্মাণো মোঘজ্ঞানা বিচেতসঃ। রাক্ষসীমাসুরীঞ্চৈব প্রকৃতিং মোহিনীং শ্রিতাঃ।।”
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোর্তিময় নন্দের ‘জ্যোর্তিময় রচনাঞ্জলি’ থেকে