Bartaman Logo
১২ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আ‌ইনের শাসন, না শাসকের আইন?

রাজ্যে গুন্ডাদমন আইন কার্যকর হতে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানালেন, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে কঠোর পদক্ষেপ। বিস্তারিত পড়ুন।

আ‌ইনের শাসন, না শাসকের আইন?
  • ১২ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, রাত পোহালেই সোমবার থেকে রাজ্যে লাগু হচ্ছে গুন্ডাদমন আইন। গুজরাত, উত্তরপ্রদেশের অনুসরণে সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর আইন তৈরি করতে গত ২৯ জুন বিধানসভায় এই সংক্রান্ত বিল পাস হয়েছিল। রাজ্যপালের সইয়ের পর দু’ সপ্তাহের মধ্যেই সেই আইন কার্যকর হতে চলেছে। সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায়সংহিতার বিভিন্ন ধারায় বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বলা আছে। তবু দু’টি বিশেষ ব্যবস্থা, যা এই আইনটিকে আলাদা করেছে। এক, কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক বলে মনে হলে এই আইনে তাকে একবছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক করে রাখা যাবে। দুই, এই আইনে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরকারী, সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে সরকার। বহু মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা হল, শাসক দলের পরোক্ষ মদতে বহুক্ষেত্রে তোলা আদায়, জমি দখল, বেআইনি খাদান থেকে কয়লা-বালি পাচার, বিভিন্ন অপরাধচক্র চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে আবার আন্দোলনের নামে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করাও হয়েছে। এসবই এরাজ্যের দীর্ঘদিনের চেনা ছবি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, পূর্ববর্তী সরকারগুলি এই সমস্ত অপরাধের প্রশ্রয় দেওয়ায় তার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। এই সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই নতুন সরকারের লক্ষ্য। সেই কারণেই নতুন গুন্ডাদমন আইন। একথা ঠিক, আম জনতা চায়, এরাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। গুন্ডাগিরি বন্ধ হোক। গুন্ডা দমনে কঠোর পদক্ষেপ করুক সরকার। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করলে শাস্তিও হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হল, দোষীদের ক্ষেত্রে দলমতনির্বিশেষে রং না দেখে সকলের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে তো? 

Advertisement

কিন্তু দেখা যায়, একটা সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এদেশে যত আইন আছে, তার অপপ্রয়োগের হারও কয়েকশো গুণ বেশি। অতীতে এও দেখা গিয়েছে, অপরাধী আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অপকর্ম চালিয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে রাষ্ট্রের শাসন বা শাসকের আইন প্রতিষ্ঠার ভূরি ভূরি নজির তৈরি হয়ে চলেছে প্রতিদিন। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, একই অপরাধের অভিযোগে রাষ্ট্র কোথাও চোখ বুজে থাকছে, কোথাও আবার সে অতিসক্রিয়। এমন ঘটনাও একেবারেই বিরল নয়, যেখানে মিথ্যা মামলায় কঠোর আইনের ধারা প্রয়োগ করে নির্দোষ ব্যক্তিকে ফাঁসানো হয়েছে। পরে আদালতের বিচারে সেই ব্যক্তি ‘ক্লিনচিট’ পেয়ে মুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও নতুন বিজেপি সরকারের দু’মাসের শাসনকালে আদালতের নির্দেশ কিংবা আইনের প্রয়োগ নিয়ে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। যেমন, আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও রাজ্যে পালাবদলের পর সরকার বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের একাংশের উদ্দেশে ইটবৃষ্টির মতো ডিম ছোড়া হচ্ছে এবং তা পুলিশের সামনেই! এই আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাননি মহিলা সাংসদও। রাজ্যজুড়ে এই নতুন সংস্কৃতি ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়লেও কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তা হাতে গুনে বলা যায়। শাসকের আইন প্রতিষ্ঠার আরেক নজির হল, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে ঘোরানো, যার উৎপত্তি এই নতুন আমলেই। 
আইন কিংবা আদালতের নির্দেশকে প্রকাশ্যে এমন অবজ্ঞার মধ্যেই নতুন গুন্ডাদমন আইন নিয়ে বহু মানুষের মনে অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রতিরোধমূলক আটক বা ‘প্রিভেনটিভ’ গ্রেপ্তারের সংস্থান। সাধারণ ফৌজদারি আইনে কাউকে গ্রেপ্তারের পর অপরাধের পুলিশি তদন্ত হয়। তার ভিত্তিতে আদালতে বিচারপর্ব চলে, দোষী হলে শাস্তি হয়। কিন্তু গুন্ডাদমন আইনে প্রশাসন, মানে সরকারের বিচারে কেউ ভবিষ্যতে ‘জনগণের পক্ষে’ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে হলেই তাকে এক বছরের জন্য আটকে রাখতে পারে। তার মানে, কারও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা এবং এর থেকে জনসাধারণের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ার প্রশ্ন, সবই প্রশাসনের বিবেচনার উপর নির্ভরশীল। এককথায়, প্রশাসনিক ক্ষমতাবৃদ্ধি, যা অপপ্রয়োগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছে বিরোধীরা। কারণ, এরাজ্যে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ধরনা আন্দোলন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। পুলিশি বাধায় সেই আন্দোলন বিশৃঙ্খল চেহারা নেওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। সুতরাং বিরোধীস্বর বা প্রতিবাদী আন্দোলন দমন করতে গুন্ডাদমন আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিরোধীদের একাংশ। এই প্রসঙ্গেই উঠে আসছে ইন্দিরা গান্ধীর জমানায় কুখ্যাত ‘মিসা’ আইনের কথা। শুধু তাই নয়, এই আইনের বলে পুলিশের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তো হামেশাই ওঠে। পুলিশ সরকারের দলদাসে পরিণত হচ্ছে— এ অভিযোগও নতুন নয়। তাই বিরোধী কণ্ঠরোধের জন্য এই আইনের প্রয়োগ হলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। আশার কথা, মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, এই আইন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হবে না। কিন্তু আইনে সরকারের হাতে বল্গাহীন ক্ষমতা দেওয়া হলে কখনো, কোনোদিন তার অপপ্রয়োগ হবে না—এই গ্যারান্টি কি সত্যিই শুভেন্দুবাবুর সরকার দিতে পারবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ