Bartaman Logo
১৩ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বেড়ালের গলা ঘণ্টাশূন্য আজও

বিজেপির বিরুদ্ধে নতুন দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। মধ্যপ্রদেশ ও দিল্লিতে তদন্ত শুরু। কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিস্তারিত পড়ুন।

বেড়ালের গলা ঘণ্টাশূন্য আজও
  • ১৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০১৪ সালে কংগ্রেসকে দিল্লির কুরসি হারাতে হয়েছিল কেন? প্রধান ইস্যু ছিল দুর্নীতি। নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অল আউট খেলার অঙ্গীকার করেছিল বিজেপি। তাদের তরফে আরও দাবি করা হয়েছিল, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজেপি এক অন্যরকম দল—পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স। মানুষ গেরুয়া শিবিরের কথা বিশ্বাস করেছিল। তাদের উপর ভরসা রেখেছে উপর্যুপরি তিনবার। মোদির এই মন্তব্যও ভাইরাল যে, ‘না খায়ুঙ্গা না খানে দুঙ্গা’। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বের এই লম্বা-চওড়া দাবির সঙ্গে অভিজ্ঞতার মিল সামান্যই। শ্রীরামচন্দ্রের কাঁধে ভর দিয়ে কেন্দ্রে এবং রাজ্যে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে গেরুয়া শিবির। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ কর্মসূচিকে সামনে রেখেই এই দলের অত্যাশ্চর্য বিস্তারলাভ। আর সেই রামমন্দিরেই পড়েছে চোর লুটেরাদের হাত! বিপুল নগদ, এমনকি রামলালার গয়নাও চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বুলডোজার বাবার রাজ্যের এই অভূতপূর্ব কেলেঙ্কারি থামার আগেই চোখ খুলে দিয়েছে পবিত্র চারধাম। এবার কেন্দ্র বদ্রীনাথ। উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথ মন্দিরেও প্রণামির অর্থ চুরি হয়েছে অযোধ্যার কায়দায়। এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় পাশাপাশি দুই রাজ্য। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে এই দুই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। অর্থাৎ ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার মাত্র মাসকয়েক আগের এই কেলেঙ্কারি নিয়ে স্বভাবতই তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি। দ্বিতীয় অভিযোগ এতটাই গুরুতর যে, সেখানেও তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়েছে। বিজেপি যেসব ধর্মস্থানের নামে ভোট চায়, ভোটে জেতে, সরকার তৈরি করে যথেচ্ছ ক্ষমতা ভোগ করে, সেখানেই এই পাপাচার বিপরীত দৃশ্য বইকি! এই ঘটনায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, বিজেপির কাছে ক্ষমতার রাজনীতিই মুখ্য। ধর্মভাব নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ বা অন্য মনীষীরা কী বলে গিয়েছেন, ভেবেছেন প্রভৃতি উপলক্ষ্য মাত্র। তাদের নেতৃত্বের এই ক্লীবতায় ভারতের ধর্মভাব এবং হিন্দুত্বের যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। 

Advertisement

কেলেঙ্কারির ধর্মস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। সামনে এসেছে বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের একাধিক কেলেঙ্কারি। মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ফেঁসে গিয়েছেন জমি দুর্নীতিতে। এছাড়া অভিযোগ উঠেছে মোদি মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভগীরথ চৌধুরীর নামেও। তিনি কৃষিমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। কৃষিমন্ত্রকের একটি প্রকল্পের ভরতুকির টাকা তিনি নিজের ফার্মকে পাইয়ে দিয়েছেন! এছাড়া তোলপাড় চলছে খোদ দিল্লিতে স্বাস্থ্যদপ্তরের মারাত্মক দুর্নীতি নিয়ে। দিল্লি সরকারের অধীনস্ত হাসপাতালগুলিতে বেড রয়েছে ১৫ হাজারের মতো। কিন্তু সেগুলির জন্য চাদর কেনা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষ! তাও আবার দেড়শো টাকার চাদর কেনা হয়েছে সাড়ে চারশোয়! অর্থাৎ চাদরে রহস্য একটি নয়, একজোড়া। রহস্যে যতি পড়েনি এখানে, আছে আরও। বাজারে এক প্যাকেট ওআরএস  যখন ১৫ টাকায় মেলে তখন এই সরকার সেটি কিনেছে ২০৫ টাকা দরে। তাও আবার ‘আইনমাফিক’ টেন্ডার ডেকে। একটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনের বাজার দর ১০ লক্ষ টাকার মতো। কিন্তু দিল্লি সরকারের সেন্ট্রাল প্রোকিয়োরমেন্ট এজেন্সি সেটাই কিনেছে ৩৩ লাখে! এমন অবশ্য এক-আধটা নয়, কেনা হয়েছে ৪৪৮টি। ফলে ৪৫ কোটির জায়গায় দাম মেটানো হয়েছে ১৪৮ কোটি টাকা। রেডিয়োলজিক্যাল যন্ত্রের বাজার দর ২৫ লক্ষ টাকা। সেটি কিনতে এই দরাজ দিল সরকার গুনেছে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা! তাহলে দিল্লি সরকার সামান্য জোড়া রহস্য উপহার দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, লম্বা হাতে গেঁথেছে রহস্যের মালা! 
নয়া দুর্নীতির কেন্দ্র মধ্যপ্রদেশ, ব্যাপম কেলেঙ্কারিখ্যাত রাজ্য। ডবল ইঞ্জিন মধ্যপ্রদেশ উপহার দিয়েছে ১২০০ কোটি টাকার চাল (৫ লক্ষ টন) কেলেঙ্কারি। ইথানল উৎপাদনের বেসরকারি কারখানায় পাচার হয়ে গিয়েছে এফসিআই গুদামের চাল। ভরতুকি মূল্যের এই খাদ্যশস্য যদিও রেশনের মাধ্যমে গরিব মানুষের খিদে মেটাতে দেওয়ার কথা। বস্তুত মোদি জমানায় দুর্নীতির নিত্যনতুন ঘটনা ফাঁস হয়েই চলেছে। খাদ্য বিপণন মন্ত্রক এই ঘটনায় এফসিআইয়ের এক বড়ো কর্তাসহ মোট পাঁচজনকে সাসপেন্ড করেছে। মধ্যপ্রদেশ পুলিশের তরফে সিট গঠন করে শুরু হয়েছে তদন্ত এবং চারজনকে নিক্ষেপ করা হয়েছে শ্রীঘরে। কিন্তু এসব মোটেই যথেষ্ট পদক্ষেপ নয়। কারণ এমন ‘পদক্ষেপ’ শুরুতে কতই তো হয়! চূড়ান্ত শাস্তির বেলা দেখা যায় —ভোঁ-ভাঁ। কেলেঙ্কারি তাই সিরিজের আকারে ঘটে যাওয়ার পরিসর পায়। সামনে যা আসে একেকটা শোরুম মাত্র, পিছনে থাকে মস্ত গোডাউন! রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, উপরতলার যোগসাজশ ছাড়া এই পাপাচার ধারাবাহিকভাবে চলতে পারে না। মানুষ সার বুঝে গিয়েছে, শাসক বা সরকার পালটায়, কিন্তু দেশের ভাগ্য পালটায় না। তার জন্য বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা যে জরুরি। তেমন দুটি শক্তপোক্ত হাত নিয়ে সত্যিই কেউ জন্মাচ্ছে না এই পোড়ার দেশে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ