প্রীতম দাশগুপ্ত: একটি কাল্পনিক চিত্র। ন’বছরের মেয়ে তিন্নি স্কুলে যাবে। বেশ সকালেই তনিমা মেয়েকে ছাড়তে এসেছে। স্কুল বাস এল। মেয়েকে বাসে তুলে দিলেন তনিমা। মেয়ে হাত নেড়ে টাটা করল। মেয়ে বলছিল, স্কুলে ভালো লাগছে না। কেউ বন্ধু নয়। তনিমা মেয়েকে অনেক বুঝিয়েছেন। আজ মেয়ে হাসতে হাসতেই স্কুলে গিয়েছে। তাই আজ খানিক নিশ্চিন্ত সে। আরও কয়েকজন পরিচিত অভিভাবকের সঙ্গে গল্প করে বাড়ির পথও ধরল। বেলা কেটে গেল। দুপুরের দিকে স্কুল থেকে ফোন। তনিমাই ধরল। ওপার থেকে শুধু একটাই কথা, তাড়াতাড়ি স্কুলে আসুন। ব্যাস। ফোনটা কেটে গেল। কী হল? চিন্তায় ঘেমে-নেয়ে তড়িঘড়ি স্কুল ছুটতে হল। ফোন করে বিষয়টি জানিয়েও দিল হাজব্যান্ডকে। তিনিও দ্রুত স্কুলের পথে বেরলেন। স্কুলে এসে শুনলেন তিন্নি নাকি সুইসাইড করেছে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বললেন, সব শেষ। চরিত্রগুলি কাল্পনিক। ঘটনাটি নয়।
গত বছরের ১ নভেম্বর। জয়পুরের একটি স্কুল। বেশ নামডাক। ভরতি করতে ভালোই রেস্ত লাগে। ক্লাস ফোরের মেয়ে সামাইরা (নাম পরিবর্তিত) স্কুলের পাঁচ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করল। সেই ঘটনাই নতুন করে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ সামাইরার বাবা-মায়ের কাছে একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এসেছে। সেটিই তাঁরা
প্রকাশ করেছেন। সেই ফুটেজের সত্যতা যাচাই করিনি। কিন্তু যদি সেটি সত্যিই হয়, তা খুবই হৃদয় বিদারক। সেখানে দেখা গিয়েছে, সামাইরা প্রথমে বেশ খুশিতেই ছিল। এক বন্ধুকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছে। নাচের ক্লাস করছে। দিব্যি হাসাহাসি করছে। বাড়ি থেকে নিয়ে আসা টিফিন খাচ্ছে। এই ফুটেজ দেখে বোঝার উপায় নেই, দিনটির পরিণতি কী ভয়ঙ্কর হতে চলেছে। এই দিনটি যে তার বাবা-মায়ের জীবনে দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তার এতটুকু আঁচ ছিল না। ফুটেজের যেটা সবচেয়ে মারাত্মক দিক, সেটা হল মৃত্যুর দিন টিচারের কাছে সাহায্যের জন্য গিয়েছিল সামাইরা কতবার জানেন। একবার-দু’বার নয়। পাঁচবার। জীবনের শেষ ৪৫ মিনিটে পাঁচবার। বারবার বোঝাতে গিয়েছিল, সবকিছু ঠিক চলছে না। কিন্তু টিচার কেয়ারই করেননি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ওই ছোট্ট মেয়েটা কখন রুম থেকে
বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটাও খেয়াল করেনি কেউ। না টিচার, না সহপাঠীরা। তারপর সব শেষ। সামাইরাকে দীর্ঘদিন ধরে সহপাঠীরা হেনস্তা করছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষকে পরিবার একাধিকবার বিষয়টি জানিয়েওছিল। কিন্তু অভিযোগের যথাযথ সমাধান হয়নি। সেদিন ক্লাসে যা ঘটেছিল, তা আসলে দীর্ঘদিনের অবহেলার শেষ পরিণতি।
একটি শিশু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিল যে, তার শিক্ষক তাকে রক্ষা করবেন। সামাইরার কাছে শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ানোর একজন মানুষ নন। মা-বাবা নেই। স্কুলে আর কাকেই বা সে সবচেয়ে বেশি ভরসা করতে পারে? টিচারই তো ছিল তার নিরাপত্তা ও ভরসার আর এক নাম। সেই ভরসাই যখন ভেঙে যায়? অনেক শিশুই সেই চাপ সহ্য করতে পারে না। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তাই নিজেকেই শেষ করার কথা ভেবেছিল ওই ছোট্ট মেয়েটি। সামাইরার বাবার অভিযোগ, বারবার বলা সত্ত্বেও ওই
শিক্ষক জানাননি, শেষ সময়ে মেয়ে তাঁকে ঠিক কী বলেছিল। মা জানিয়েছেন, মেয়ে দু’ফুটের বেঞ্চ
থেকে নামতেও ভয় পেত। ওর হাইট ফোবিয়া ছিল। সেই মেয়েই পাঁচতলা থেকে ঝাঁপ দিল। কতটা স্ট্রেসের মধ্যে থাকলে সে ওই কাজ করতে পারে। বলেছেন, সামাইরা বারবার সাহায্যের জন্য গিয়েছিল।
কিন্তু টিচার ওর কথা না শুনে ওকেই বকাবকি করেছিল। দিনের পর দিন ক্লাসে বুলি হতে হতে ভেঙে পড়েছিল ছোট্ট মেয়েটি।
সামাইরার কথা কেন বিশ্বাসই করেননি তিনি? কারণ আরও চার-পাঁচজন একযোগে তার দিকেই আঙুল তুলেছিল। এটা কিন্তু কোনো একজনের
ঘটনা নয়। আপনার-আমার ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটে। একজন বাচ্চাকে যখন বুলি করা করা হয়,তখন তাতে যোগ দেয় আরও চার-পাঁচ জন সহপাঠী। যেমন জয়পুরের স্কুলে হয়েছিল।
শিশুটি যখন বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছিল, বাকিরা একযোগে হেসেছিল। টিচার তাদেরই বিশ্বাস করেছিল। একবারও ভেবে দেখেননি, তার মনের অবস্থা। একটি ন’বছরের বাচ্চার ইঙ্গিত বুঝতে না পারার মূল্য কতটা? একটা জীবন।
আসলে আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে শিশুর কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক সময় এসব ‘ছেলেমানুষি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। স্কুলে কেউ কাউকে ঠাট্টা করছে। অপমান করছে। একঘরে করে দিচ্ছে। এসবকে অনেকেই ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করেন। অথচ গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিনের বুলিং একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দিতে পারে। তাকে বিষন্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি সামাইরার মতো চরম পরিস্থিতি হলে, আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তও নিতে বাধ্য হতে পারে। সম্প্রতি কলকাতায় একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। শৌর্য সরকার নামে একটি ছেলে বুলির শিকার হয়ে আত্মঘাতী হয়েছে। অথচ কী ব্রাইট ছিল ছেলেটি। তার দোষ ছিল, সে ছিল স্পেশাল চাইল্ড। এই অপরাধে ক্লাসে বুলির শিকার হতে হয় ছেলেটিকে। শেষমেষ জীবন শেষ।
বুলিং নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১৫ দফা গাইডলাইন আছে। সেখানে বলা আছে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি সুনির্দিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য বিধি নেবে। ১০০ জন বা তার বেশি পড়ুয়া আছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন করে প্রতিষ্ঠিত মনোবিদ বা কাউন্সেলর থাকবেন। প্রতিটি স্কুলের টিচিং ও নন-টিচিং স্টাফদের বছরে দু’বার এ সংক্রান্ত বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হবে।পড়ুয়াদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ যথাযথ গুরুতত্ব ও গোপনীয়তার সঙ্গে দেখতে হবে স্কুলকে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন হাইকোর্ট বুলিং নিয়ে নির্দেশও দিয়েছে। বুলিংয়ের ফলে কোনো পড়ুয়া আত্মঘাতী হলে স্কুল যে তার দায় এড়াতে পারে না, সেটা স্পষ্ট করা হয়েছে।
আজ ভারতের অধিকাংশ স্কুলে বুলিং-বিরোধী নীতি রয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাস্তবে সেটা আদৌ কার্যকর হয় কি? স্কুল তো বলছে, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু শিশুরা কি সত্যিই অভিযোগ জানাতে পারে? তারা তো ভয় পায়। কারণ তারা মনে করে, কেউ তাদের বিশ্বাস করবে না। আর এরপর অভিযোগ করার জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এই সংস্কৃতি আমাদের বদলাতে হবে। প্রতিটি স্কুলে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার, যেখানে শিশু বুঝতে পারবে, সে অভিযোগ করলে টিচাররা বিশ্বাস করছে। তার কথা মন দিয়ে শোনা হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বুলিংকে ‘দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। কারণ কারও ‘দুষ্টুমি’ অন্যের প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অভিভাবকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সন্তান যদি বারবার বলে যে, সে স্কুলে যেতে চাইছে না। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মিশতে পারছে না। কেউ তাকে বিরক্ত করছে। তাহলে সেটিকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। বাচ্চাকে ইগনোর করলে ফল হীতে বিপরীত হতেই পারে। অনেক সময় শিশুরা সরাসরি বলতে পারে না তারা কী যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে। তাদের আচরণে, নীরবতায় কিংবা কান্নায় সেই কষ্ট প্রকাশ পায়। আমরা যাঁরা বাচ্চার বাবা-মা কিংবা শিক্ষক তাঁরা যদি সেই ভাষা বুঝতে না পারি, তাহলে আরও সামাইরাকে অকালে ঝরে যেতে হবে। আমাদের শিখতে হবে সেই ভাষা। বুঝতে হবে শিশুর ভাষা।
সামাইরার ঘটনা আদালতের বিচারাধীন। পুলিশ স্কুলমালিক, প্রিন্সিপাল ও ক্লাস টিচারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। সিবিএসই তাদের তদন্তে দেখিয়েছে, স্কুলে নিরাপত্তার ব্যাপক ঘাটতি ছিল। কিন্তু যে প্রশ্নগুলি উঠবে, সেটা হল, একটা বাচ্চার কতটা চোখের জল ঝরলে আমরা মানে বাচ্চার বাবা-মা বা শিক্ষকরা তাকে বুঝতে পারব? কতটা মানসিক কষ্টের লক্ষণ দেখালে আমরা বুঝতে পারব, সে সত্যিই স্ট্রেসে আছে? শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। বদলাতে হবে আমাদের মনোভাব। একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী যেন শুধু একটি রোল নম্বর না হয়। মনে রাখা দরকার, একজন বাচ্চা কিন্তু দিনের বড়ো সময় স্কুলেই কাটায়। স্যার বা ম্যাম, একটু দেখুন শব্দগুলি কিন্তু কোনো সাধারণ কথা নয়। অনেক সময়ই তা বাচ্চাটির বাঁচার শেষ সুযোগ। একজন অভিভাবকের কাছে সন্তানের অভিযোগ যেন ‘অতিরঞ্জিত’ মনে না হয়। আর একটি স্কুল যেন শুধু ভালো ফলের পিছনে না দৌড়ায়। বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও তাদের দায়িত্ব। আমরাই তো বাচ্চাদের শেখাই, বিপদে পড়লে বড়োদের বলবে। কিন্তু বড়োরা যদি সেই সাহায্যের আবেদনই না শোনে? শিশুরা কার কাছে যাবে? আমরা প্রায়ই বলি, এগুলি বাচ্চাদের ব্যাপার, নিজেদের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কখনও বলি এত সেন্টিমেন্টাল হলে চলবে না। কিন্তু বাস্তব হল, এই সমস্যাটি আমার-আপনার কাছে হয়ত সামান্য। কিন্তু শিশুর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট। বন্ধুরা অপমান করছে। একঘরে করে রাখছে। এটা যে তাদের কতটা আত্মসম্মানে আঘাত সেটা আমরা বুঝি না। তাদের মনে এসব ঘটনা গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অভিযোগকে তাই কখনো খাটো করে দেখা উচিত নয়। সময়ে পাশে না দাঁড়ালে শিশুর পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কনফিডেন্স কমে যায়।
সামাইরা আর ফিরবে না। তার খাতা, স্কুলব্যাগ, পছন্দের খেলনা—সবই আজ নীরব সাক্ষী। কিন্তু তার শেষ পাঁচটি সাহায্যের আবেদন আমাদের কানে বাজছে। একটু সুযোগ দিলে হয়তো বা বেঁচে যেত মেয়েটি।। আর কোনো সামাইরাকে যেন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করি।
আমরাই তো বাচ্চাদের শেখাই, বিপদে পড়লে বড়োদের বলবে। কিন্তু বড়োরা যদি সেই সাহায্যের আবেদনই না শোনে? শিশুরা কার কাছে যাবে? আমরা প্রায়ই বলি, এগুলি বাচ্চাদের ব্যাপার, নিজেদের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কখনও বলি এত সেন্টিমেন্টাল হলে চলবে না। কিন্তু বাস্তব হল, এই সমস্যাটি আমার-আপনার কাছে হয়ত সামান্য। কিন্তু শিশুর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট।